গেল অর্থবছরের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির চূড়ান্ত এবং সাময়িক হিসাবের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। এই ব্যবধানের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জিডিপির বড় প্রবৃদ্ধির কারণ হিসেবে রপ্তানি খাতের অবদানের কথা বলা হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আমদানি এবং রপ্তানির পার্থক্য সাময়িক হিসাবের চেয়ে চূড়ান্ত হিসাবে অনেক বেশি। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ঘাটতি বেড়ে যাওয়া রপ্তানি দিয়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি এত বেড়ে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। ভোগ এবং বিনিয়োগ ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। কিন্তু কভিডের মধ্যে হঠাৎ এত বড় পরিবর্তন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

চূড়ান্ত হিসাবে গত অর্থবছরে (২০২০-২১) জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ। গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এ পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে। এর আগে গত নভেম্বরে প্রকাশিত সাময়িক হিসাবে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ। সাধারণত কোনো অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসের তথ্য এবং পরবর্তী ৩ মাসের অনুমানের ভিত্তিতে সাময়িক হিসাব করা হয়। চূড়ান্ত হিসাবে সাময়িক হিসাবের সঙ্গে কিছুটা ব্যবধান থাকে। কিন্তু এত ব্যবধান সাধারণত থাকে না। অন্যদিকে অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে করোনা সংক্রমণ বেড়েছিল। এ ছাড়া কিছু ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপ ছিল।

বিবিএসের পরিসংখ্যান বলছে, স্থিরমূল্যে চূড়ান্ত হিসাবে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে ঘাটতি ১ লাখ ৮১ হাজার কোটি টাকা। সাময়িক হিসাবে যা ছিল এক লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে গত অর্থবছর ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগের পরিমাণ ৬ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকার মতো। সাময়িক হিসাবে এর পরিমাণ ছিল ছয় লাখ ৮১ হাজার কোটি টাকা।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, ভোগ, বিনিয়োগ, প্রবাসী আয়, কৃষি, সেবা- কোনো খাতের হিসাবেই জিডিপির চূড়ান্ত এবং সাময়িক হিসাবের ব্যবধান মেলানো যাচ্ছে না। বিবিএসের পরিসংখ্যানের মধ্যে ধারাবাহিকতা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সিপিডির পক্ষ থেকে সব সময়ই তারা মানসম্পন্ন ডাটা বিশ্নেষণ এবং গ্রহণযোগ্য ডাটার প্রয়োজনীয়তার কথা বলে আসছেন। তবে শেষ পর্যন্ত বিবিএসের এই ডাটার ওপরই নির্ভর করতে হয়। মাথাপিছু আয়ের যে হিসাব দেখানো হয়েছে, সেখানেও প্রশ্ন রয়েছে।

বিবিএসের পরিসংখান বিশ্নেষণে দেখা যায়, চূড়ান্ত হিসাবে খানা পর্যায়ে ভোগব্যয় বেড়েছে ৮ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। সাময়িক হিসাবে যা ছিল ৩ দশমিক ৮২ শতাংশ। চূড়ান্ত হিসাবে এই হার ৮ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। সামগ্রিক পুঁজি গঠনের পরিসংখানেও প্রবৃদ্ধির বড় ব্যবধান লক্ষ্য করা গেছে। সাময়িক হিসাবে এখানে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ। চূড়ান্ত হিসাবে তা দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৯ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন সমকালকে বলেন, অর্থবছরের শেষ তিন মাসে এমনকি ঘটল যাতে এত বেশি হারে ভোক্তা ব্যয় এবং বিনিয়োগ বাড়াল। অর্থবছরের শেষ দিকে করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধি এবং বিধিনিষেধের মধ্যে এত বেশি পরিমাণ ভোগব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। এ ছাড়া শেষ তিন মাসে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি হয়েছে আগের ৯ মাসের চেয়ে কম। রেমিট্যান্স বৃদ্ধির সঙ্গে ভোগব্যয়ের সম্পর্ক থাকে।

গত অর্থবছরের শেষ তিন মাসের মধ্যে বাংলা নববর্ষ এবং ঈদুল ফিতর ছিল। করোনার কারণে এই দুই বড় উৎসবে কেনাকাটা জমেনি। ফলে এ সময়ে ভোগের এত বড় বৃদ্ধি হওয়ার কথা নয়। বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএর সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, গত দুই ঈদ এবং পহেলা বৈশাখের কারণে অভ্যন্তরীণ বস্ত্র ও পোশাকের বাজার ধরতে পারেননি তারা।