সরকারি খাসজমিকে উদ্যোক্তার বিনিয়োগ দেখিয়ে বিনা সুদের ইক্যুইটি এন্ট্রারপ্রেনারশিপ ফান্ড (ইইএফ) থেকে দেওয়া হয় ঋণ। কেউ কেউ ঋণ খেলাপির তথ্য লুকিয়ে পেয়েছেন টাকা ছাড়। আবার অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান বা ভুয়া জমির দলিলে তহবিল থেকে আবেদনকারীর হাতে তুলে দেওয়া হয় ঋণের টাকা। ইইএফ থেকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে এরকম রকমারি চাতুরীর তথ্য মিলেছে বাংলাদেশ কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের বিশেষ নিরীক্ষায়। নমুনাভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ৪৪৮কোটি টাকার জালিয়াতির তথ্য এরই মধ্যে সংসদীয় কমিটিতে আংশিক উপস্থাপন করা হয়েছে। আগামী ৯ মার্চ সরকারি হিসাব সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভায় এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

এরকম নানা জালিয়াতির কারণে উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সরকারের 'ইইএফ উদ্যোগ' ভেস্তে যেতে বসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক, আইসিবি এবং বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পর্যায়ের জালিয়াতি নিয়ে নানা সমালোচনার মুখে ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত আবেদন নেওয়া বন্ধ ছিল। পরে ২০১৮ সালের আগস্টে বিনা সুদের এই তহবিলকে ২ শতাংশ সুদের দীর্ঘমেয়াদি ঋণে রূপান্তর করা হয়। পরে নাম পাল্টিয়ে করা হয় এন্ট্রারপ্রেনারশিপ সাপোর্ট ফান্ড (ইএসএফ)। এই তহবিল থেকে ঋণের জন্য ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে আবেদন নেওয়া হলেও টাকা ছাড় শুরু হয় ২০২১ সালে। অর্থছাড়ের আগেই ইএসএফের তহবিল ব্যবস্থাপনায় জড়িত কর্মকর্তাদের নানা অপকর্মের তথ্যও পাওয়া গেছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম সমকালকে বলেন, খাস বা ভুয়া জমির বিপরীতে ঋণ দেওয়ার বিষয়টি ঠিক নয়। অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ ছাড়ের কোনো সুযোগ নেই। কেননা, বিভিন্ন পর্যায়ে যাচাই শেষে প্রকল্পের নামে জমির নামজারির পর টাকা ছাড় হয়। ফলে মাছের খামার বা কৃষিভিত্তিক প্রকল্পে এমন হওয়ার অবকাশ নেই। যদিও কিছু ক্ষেত্রে প্রকল্প সফল না হওয়ায় যথাসময়ে টাকা ফেরত আসেনি। তবে আইটিভিত্তিক কিছু প্রকল্পের যে ঠিকানায় ঋণ দেওয়া হয়েছিল, পরে সেখান থেকে চলে যাওয়ায় তাদের না পাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

জানা যায়, সংসদীয় কমিটির বৈঠকটি ৯ মার্চ সকাল ১১টায় জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে অনুষ্ঠিত হবে। এর আগে আজ বৃহস্পতিবারের মধ্যে এ বিষয়ে একটি জবাব প্রস্তুত করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এবং বাণিজ্যিক অডিট অধিদপ্তরে পাঠাতে হবে। ইইএফের ঋণ জালিয়াতির বিষয়ে জবাব দেওয়ার জন্য সংসদীয় কমিটির বৈঠকে গভর্নর ফজলে কবিরকে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে। সংসদীয় কমিটিতে এ দফায় ২০০৯-১০ থেকে ২০১৪-১৫ অর্থবছরের জালিয়াতির কারণে সরকারের ২৭৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকা ক্ষতির বিষয়ে আলোচনা হবে। এর আগে গত মাসে ২৫ প্রতিষ্ঠানের ১৭২ কোটি ১৯ লাখ টাকার জালিয়াতির বিষয়ে এই কমিটিতে আলোচনা হয়।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লিজ করা অকৃষি খাসজমি গাজীপুরের ফেরদৌস বায়োটেকের নামে মাসিক ভাড়ায় সাব লিজ দলিল করা হয়। ইইএফ নীতিমালা ভেঙে খাসজমির বাজারদরকে উদ্যোক্তার ইক্যুইটি দেখিয়ে ছাড় করা হয় দুই কোটি ৩৬ লাখ টাকা। ময়মনসিংহের সিনহা গ্রিনারি এগ্রো ছিল ঋণখেলাপি। খেলাপি ঋণের তথ্য গোপন করে অসত্য প্রতিবেদনের মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয় তিন কোটি ৬০ লাখ টাকা। সরকারি তহবিলের টাকায় প্রকল্পের জমি কেনেন তিনি। পরে আর সেই টাকা ফেরত দেননি। বরিশালের তানজিন এগ্রো কমপ্লেক্স নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে জমির ভুয়া দলিলের বিপরীতে এক কোটি ৬ লাখ টাকা আত্মসাতের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কক্সবাজারের ফরচুন পোলট্রি হ্যাচারি প্রকল্প করার নামে ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে আড়াই কোটি টাকা। কুমিল্লার সপ্তডিংগা পোলট্রি হ্যাচারি প্রকল্পের জন্য সরকারি টাকায় আমদানি করা যন্ত্রপাতি সরিয়ে দুই কোটি ১৪ লাখ টাকার ক্ষতি করা হয়েছে। সিরাজগঞ্জের স্টার মিল্ক্ক প্রোডাক্টের সক্ষমতা যাচাই না করেই দেওয়া হয় এক কোটি ৫৫ লাখ টাকা। বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে ব্যর্থ বন্ধ প্রকল্পের বিপরীতে ক্ষতি হয়েছে এক কোটি ৫৫ লাখ টাকা।

আইটি খাতের ইনফরমেশন টেকনোলজি মেট্রিক্স, ক্রিস্টাল ইনফরমেটিকস, আলফা সফট সিস্টেমস এবং মেসার্স ইলেকট্রনিক ডিজিটাল সিস্টেমস ছিল নামসর্বস্ব কাগুজে প্রতিষ্ঠান। কোনো ধরনের জামানত ছাড়াই অস্তিত্বহীন এসব প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছে এক কোটি ৭৬ লাখ টাকা। ঢাকার ডিএনএস ম্যাটকম নামের এক প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয় তিন কোটি ১৮ লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠানটি অনুমোদন ছাড়াই প্রকল্পের অবস্থান পাল্টিয়ে সুদহীন তহবিলের টাকা আর ফেরত দেয়নি। অস্তিত্বহীন মারফি ম্যাককান কনসাল্টিংয়ের উদ্যোক্তা অংশের বিনিয়োগ ঘাটতি রেখেই ছাড় করা হয় ৮০ লাখ টাকা। টাকা ছাড়ের পর উদ্যোক্তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ড্রিমস সফট নামের প্রতিষ্ঠান তহবিল থেকে টাকা নেওয়ার পর আর উদ্যোক্তাকে খুঁজে না পাওয়ায় সরকারের ক্ষতি চিহ্নিত করা হয়েছে ৫০ লাখ টাকা।

এতে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্পের ঘাটতি বিনিয়োগের পরও বগুড়ার ইফাডাপ অ্যাকুয়া নামের একটি প্রতিষ্ঠানের জমির রেজিস্ট্রেশন দলিল না নিয়েই ছাড় করা হয় তিন কোটি ৪০ লাখ টাকা। এই টাকাও আর ফেরত আসেনি। গাজীপুরের নাজমুল ফুড ইন্ডাস্ট্রির আবেদন বাতিলের সুপারিশ করেছিল ইইএফ কর্মসূচির টেকিনিক্যাল অ্যাডভাইজিং কমিটি। সেই সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে দুই কোটি ১৬ লাখ টাকা আর পাওয়া যায়নি। উদ্যোক্তার অংশ বিনিয়োগ নিশ্চিত না হয়ে হবিগঞ্জ এগ্রো প্রসেসিংয়ের নামে প্রকল্প বাস্তবায়নের আগেই পুরোনো যন্ত্রপাতির বিপরীতে ছাড় করা হয় চার কোটি ৩০ লাখ টাকা। পরে আর প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়ায় এই পরিমাণ টাকা সরকারের ক্ষতি হয়েছে। ঠাকুরগাঁওয়ের প্রিমিয়াম সিড এবং হবিগঞ্জের মামুননগর মাল্টিপারপাস এগ্রোর প্রকল্পের কোনো অস্তিত্ব নেই। এ দুই প্রতিষ্ঠানের জমি যাচাই না করে এবং উদ্যোক্তার অংশ বিনিয়োগ নিশ্চিত না হয়ে দেওয়া হয়েছে এক কোটি ২ লাখ টাকা। কিশোরগঞ্জের অমি মডার্ন হ্যাচারির জালিয়াতি জেনেও ব্যবস্থা না নেওয়ায় সুদহীন এক কোটি ১০ লাখ টাকা আদায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের বাণিজ্যিক উৎপাদন না থাকায় এবং মেয়াদোত্তীর্ণের দীর্ঘদিন পরও কোনো শেয়ার বাইব্যাক তথা টাকা ফেরত না আসায় কয়েকটি প্রকল্পে সরকারের ক্ষতি হয়েছে ৬৮ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। আরও কয়েকটি প্রকল্পের আংশিক বাইব্যাকের পর আর টাকা ফেরত না দেওয়ায় সরকারের ক্ষতি হয়েছে ৮৩ কোটি ১৯ লাখ টাকা। চুক্তির আলোকে প্রথম কিস্তির টাকা বিতরণ হয়েছে। তবে দুই বছর পার হওয়ার পরও উদ্যোক্তা বাকি টাকা তুলতে ব্যর্থ হয়েছেন। এতে করে আর প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়ায় সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৯১ কোটি ৭২ লাখ টাকা।

অস্বাভাবিক খরচ: অন্য যে কোনো ঋণের চেয়ে এখনও ইএসএফের ঋণ আকর্ষণীয়। ফলে তদবির ছাড়া এই ঋণ পাওয়ার ঘটনা খুব কম। তহবিল পরিচালনায় আইসিবিতে গঠিত উইং থেকে টাকা ছাড়ে অনৈতিক সুবিধাসহ আপ্যায়নের নামে অস্বাভাবিক ব্যয়ের তথ্য উঠে আসে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পরিদর্শন প্রতিবেদনে। ২০২০ সালের ৫ মার্চ 'এক টাকাও ছাড় হয়নি, খরচ ২২ কোটি টাকা' শিরোনামে সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে আপ্যায়ন, ভ্রমণ, প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন খাতে অস্বাভাবিক ব্যয়ের তথ্য মিলেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অধিকাংশ সভায় আপ্যায়নের নামে অস্বাভাবিক ব্যয় দেখানো হয়েছে। দৈবচয়ন ভিত্তিতে ২০১৯ সালের ২৯ এপ্রিল আটজনের এক সভার খরচের বিবরণ দেওয়া হয়। সভায় উপস্থিত সদস্যদের লাঞ্চ, নাশতায় চিকেন কাটলেট, স্যান্ডউইচ, বিস্কুটসহ বিভিন্ন আইটেম খাওয়ানোর পর একই সভায় ফল কেনায় খরচ দেখানো হয় সাড়ে ৫ হাজার টাকা। বেশিরভাগ সভায় খাবারে এভাবে গড়ে ২৪ থেকে ২৭ হাজার টাকা এবং ফল কেনায় ৫ থেকে সাড়ে ৫ হাজার টাকা খরচ দেখানো হয়। ফল কেনার খরচের ভাউচার করতে গিয়ে ২০১৯ সালের ২৮ মার্চের এক সভায় চার কেজি পেয়ারার দাম দেখানো হয়েছে এক হাজার ৩০০ টাকা। তাতে প্রতি কেজি পেয়ারার দাম দাঁড়ায় ৩২৫ টাকা।

প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকল্প কমিটির ২০১৮ সালের ২০ অক্টোবরের এক সভায় আপ্যায়ন খরচ দেখানো হয় ২৭ হাজার ৪১০ টাকা। এসব খাবার কেনা হয় পুষ্পদাম রেস্টুরেন্ট এবং খানা বাসমতি থেকে। আইসিবির ইইএফ উইংয়ের অফিস পুরানা পল্টনের জাতীয় ক্রীড়া ভবনে। একই ভবনের চতুর্থ তলার পুষ্পদাম রেস্টুরেন্ট এবং এর বিপরীতে পাশে মাত্র ১২০ মিটার দূরত্বের খানা বাসমতি রেস্টুরেন্ট। অথচ খাবার আনার জন্য আটজন লেবারের মজুরি বাবদ তিন হাজার ২০০ টাকা তুলে নেওয়া হয়। আবার উদ্যোক্তাদের দক্ষতা বাড়ানোর প্রশিক্ষণের নামে বিপুল পরিমাণ টাকা তুলে নেওয়া হয়। এ ছাড়া আইসিসিবির কর্মকর্তারা প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনের নামে যেভাবে ভ্রমণ ব্যয় দেখিয়েছেন, তা অবিশ্বাস্য ও অসম্ভব বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

জালিয়াতি বন্ধে প্রকল্পের ধরনে বদল: খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও কৃষিভিত্তিক শিল্প এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে উৎসাহিত করতে ২০০১ সালে ১০০ কোটি টাকার তহবিল নিয়ে যাত্রা শুরু হয় বিনা সুদের ইইএফের। পরে তহবিলের আকার বাড়িয়ে আড়াই হাজার কোটি টাকা করা হয়। ২০০৯ সাল পর্যন্ত তহবিল দেখভালের দায়িত্বে ছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। পরবর্তী সময়ে তহবিল ছাড়ের দায়িত্ব সরকারি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান আইসিবি এবং নীতি প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় বাংলাদেশ ব্যাংককে। বর্তমানে ইএসএফ থেকে ২ শতাংশ সুদে আট বছর মেয়াদি ঋণ পাচ্ছেন উদ্যোক্তারা। ঋণ পাওয়ার চার বছর পর থেকে কিস্তি পরিশোধ করতে হয়। একজন উদ্যোক্তার ৮০ লাখ থেকে ১২ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। উদ্যোক্তার ৫১ শতাংশ বিনিয়োগের বিপরীতে সর্বোচ্চ ৪৯ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ দেওয়া হয়।

এসব অনিয়মের একটি বিবরণ উল্লেখ করে গতকাল সন্ধ্যায় টেলিফোনে আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবুল হোসেনের বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়। তিনি বাইরে থাকায় পরে টেলিফোন করতে বলেন। রাতে কয়েক দফা ফোন করলেও তিনি আর ধরেননি।