ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এবং সংকটের দ্রুত সমাধানের জন্য হঠাৎ মিয়ানমারের তৎপরতা বেড়েছে। সম্প্রতি রাখাইন রাজ্যে অনুষ্ঠিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে প্রথম ৭০০ জনের একটি তালিকা চূড়ান্ত করে তাদের ফেরত নেওয়ার বিষয়েও সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে ঢাকা অবহিত হয়েছে। 

এ বিষয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেছেন, প্রথম ধাপে ৭০০ রোহিঙ্গা ফেরত নেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করে মিয়ানমার চিঠি দিয়েছে। তবে বাংলাদেশ চায় পরিবার ভিত্তিতে ১ হাজার ১০০ জনকে পাঠাতে।

প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, মিয়াননমারে নির্বাচন, সামরিক অভ্যুত্থান এবং করোনার কারণে বহুদিন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া পুরো থমকে ছিল। চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি দু'দেশের টেকনিক্যাল কমিটির ভার্চুয়াল বৈঠকের মধ্য দিয়ে এ বিষয়ে আবারও আলোচনা শুরু হয়। 

এখন পর্যন্ত ২৮ হাজার রোহিঙ্গার যাচাইবাছাই শেষ করেছে মিয়ানমার। পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশে অবস্থান নেওয়া রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো সম্ভব হবে বলেও তিনি আশা করেন। 

তিনি আশা করেন. জাতিসংঘ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় যুক্ত হবে এবং রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায় ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন সম্ভব হবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এর আগেও মিয়ানমার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে উদ্যেগী মনোভাব দেখিয়ে পরে আর প্রত্যাবাসন শুরু করেনি। এ কারনে ঢাকা এবার তাদের আগ্রহের বিষয়টি খুব ভালভাবে খতিয়ে দেখছে। তবে ঢাকা যদি নিশ্চিত হয় রাখাইনে রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায় এবং নিরাপদ প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং পরিবার ভিত্তিতে প্রত্যাবাসনে মিয়ানমার সম্মত হয় তাহলে বাংলাদেশেরও প্রত্যাবাসন শুরুতে আপত্তি থাকবে না।

একটি কূটনৈতিক সূত্র জানায়, মিয়ানমারের জান্তা সরকারের প্রতি রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সম্প্রতি রাশিয়া এবং চীনের চাপ বেড়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় দু'টি দেশই এ সংকট আর দীর্ঘায়িত করতে চায় না। একই সঙ্গে জান্তা সরকারের এক বছরে মিয়ানমারের অর্থনীতির অবস্থাও ক্রমাগত নাজুক হয়েছে এবং হচ্ছে। এ অবস্থায় পশ্চিমাদের সুদৃষ্টি পাওয়ার জন্যও মিয়ানমার রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আগ্রহী হতে পারে।

এর আগে ২০১৯ সালের জুলাই মাসে মিয়ানমার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সম্মত হয় এবং বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথভাবে তালিকা সম্পন্ন করার কথা জানায়। এরপর মিয়ানমারের পাঠানো ৩ হাজার ৫৪০ জনের চূড়ান্ত তালিকার মধ্যে ৩৩৯ পরিবারের সাক্ষাৎকার সম্পন্ন হয়। তাদের এ দিন ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। 

কিন্তু চীনের দুই জন প্রতিনিধি, মিয়ানমারের একজন, বাংলাদেশর ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্মসচিব, কক্সবাজারের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক, শালবাগান রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইনচার্জসহ এবং ইউএনএইচসিআর ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে রোহিঙ্গারা ফিরে যেতে অস্বীকৃতি জানায়। 

তারা রাখাইনে নিরাপত্তা, নাগারিকত্ব, ভিটেমাটি ফিরিয়ে দেওয়া ও গণহত্যার বিচারের নিশ্চতয়তা না পেলে তারা সে দেশে ফিরে যাবে না বলে জানিয়ে দেয়। ফলে প্রত্যাবাসন শুরু সম্ভব হয়নি। 

পরে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ অবস্থানের পরিবেশ সৃষ্টি না করেই মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ শুধুমাত্র বৈশ্বিক চাপ মোকাবেলার কৌশল হিসেবে প্রত্যাবাসন শুরুর তোড়জোড় করেছিল। বাস্তবে প্রত্যাবাসনে তাদের কোনো প্রস্তুতিই ছিল না। 

এর আগে ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে রাখাইনে মিয়ানমার বাহিনীর জাতিগত নিধনযজ্ঞ শুরু হলে দলে দলে রোহিঙ্গারা আসে। 

এরপর রোহিঙ্গাদের দ্রুত ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার বাংলাদেশের সঙ্গে একটি চুক্তিও করে। কিন্তু পরে সেই চুক্তির শর্ত অনুযায়ীও কোন পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয় মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ।