পোলট্রি, মাছ ও গবাদি পশুর খাদ্য তৈরিতে ব্যবহৃত কাঁচামালের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। গত দুই বছরে সয়াবিন মিলের দাম ৮৮ শতাংশ এবং অন্যান্য কাঁচামালের দর বেড়েছে ১২৩ শতাংশ পর্যন্ত। এর প্রভাবে ইতোমধ্যে কিছু ফিড কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে অন্যান্য কারখানার টিকে থাকার চ্যালেঞ্জ আরও কঠিন করে তুলবে বলে আশঙ্কা ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের (এফআইএবি)। শনিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে এক ভার্চুয়াল মতবিনিময় সভায় এ উদ্বেগ প্রকাশ করেন এফআইবি নেতারা।

স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাছ ও প্রাণিজ খাদ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে না এলে ডিম, দুধ, মাছ ও মাংসের ঘাটতি দেখা দেবে। ফলে হুমকির মুখে পড়বে স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা।

এফআইএবি সভাপতি এহতেশাম বি. শাহজাহান বলেন, প্রতি কেজি ব্রয়লার ফিডে ৩ থেকে ৪ টাকা, লেয়ার ফিডে আড়াই থেকে সাড়ে ৩ টাকা টাকা, ক্যাটেল ফিডে সাড়ে তিন থেকে ৪ টাকা, ডুবন্ত ফিস ফিডে আড়াই থেকে সাড়ে তিন টাকা এবং ভাসমান ফিস ফিডে ৪ থেকে ৫ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। বড় বড় ফিড মিল উৎপাদন ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে।

এফআইএবির সাধারণ সম্পাদক মো. আহসানুজ্জামান বলেন, ফিড তৈরিতে ৮০ শতাংশ খরচ হয় কাঁচামাল কেনায়। ২০২০ সালের মার্চে ভুট্টার দাম ছিল প্রতি কেজি ২৪ টাকা, চলতি মাসে তা বেড়ে হয়েছে ৩৭ টাকা। ৩৭ টাকার সয়াবিন মিলের দাম এখন ৭০ টাকা। ৩৮ টাকার ফুল ফ্যাট সয়াবিনের দাম এখন প্রায় ৬৭ টাকা। ২১ টাকার রাইস পলিস কিনতে হচ্ছে ৩৬ টাকায়। ১৩৩ টাকার এল-লাইসিন ২০০ টাকা, ২০০ টাকার ডিএলএম ৩০০ টাকায়, ৫৪ টাকার পোলট্রি মিল ৮০ টাকায় এবং ১০০ টাকার ফিস মিল ১৪৬ টাকায় কিনতে হচ্ছে। ফিড তৈরিতে ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ ভুট্টা এবং ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ সয়াবিন মিলের দরকার হয়। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে সয়াবিন মিলের দর ৩০ শতাংশ এবং ভুট্টার দাম ১৮ শতাংশ বেড়েছে।

আহসানুজ্জামান আরও বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে সয়াবিন তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে ভোজ্যতেল কোম্পানি ও সিড ক্র্যাশারদের যখন চাপ দেওয়া হচ্ছে, তখন তারা তেলের দাম কিছুটা কমিয়ে সয়াবিন খৈল বা সয়াবিন মিলের দাম অস্বাভাবিক বাড়িয়ে দিয়েছে। গত বছরের আগস্টে সয়াবিন মিলের দাম ছিল প্রতি কেজি ৫৪ টাকা চলতি বছরে তা করা হয় ৬০ টাকা। গত ১৬ মার্চে ডিও মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৭০ টাকায় অথচ ভোজ্যতেল আমদানিতে সরকার ১০ শতাংশ ভ্যাট ছাড় দিয়েছে। দেশের বাজারে সয়াবিন মিলের দাম যে পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়েও অনেক বেশি। কয়েকটি সিড ক্র্যাশিং কোম্পানির কাছে পোলট্রি, মাছ ও ডেইরি খাত জিম্মি হয়ে পড়েছে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে সরকারের বিশেষ নজরদারির দাবি জানান তিনি।

এফআইএবির সিনিয়র সহসভাপতি আবু লুৎফে ফজলে রহিম খান শাহরিয়ার বলেন, আমদানির ক্ষেত্রে বন্দরে কাঁচামাল পৌঁছাতে প্রায় ৫০ দিন সময় লাগে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে সময় লাগে প্রায় ৭০ দিন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পটভূমিতে খাদ্যশস্যের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। বেড়েছে জাহাজ ভাড়া। টাকা দিয়েও পণ্য পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, দেশে কাঁচামালের তীব্র সংকট এবং খামারিদের বিরোধিতা সত্ত্বেও ফের সয়াবিন মিল রপ্তানির অনুমতি দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এ সিদ্ধান্ত থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অবশ্যই সরে আসা উচিত।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করে বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) সভাপতি মসিউর রহমান বলেন, দেশীয় শিল্প রক্ষার পাশাপাশি ডিম, দুধ, মাছ ও মাংসের উৎপাদন সচল রাখতে হবে। অন্যথায় ভয়াবহ খাদ্য ও পুষ্টি সংকটে পড়বে দেশ। প্রচুর মানুষ বেকার হয়ে পড়বে। সংকট উত্তরণে ২০২৫ সাল পর্যন্ত কর অবকাশ সুবিধার দাবি জানিয়েছেন এফআইএবি কোষাধ্যক্ষ এবং বিপিআইসিসি'র সহসভাপতি শামসুল আরেফিন খালেদ।

এফআইএবির সাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, কাঁচামালের দাম বাড়াতে কারসাজি করছেন কিছু ব্যবসায়ী ও আমদানিকারক। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে মৎস্য ও প্রাণিজ খাতের সঙ্গে জড়িত দুই কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা হুমকিতে পড়বে।

উদ্যোক্তারা জানান, দেশে বর্তমানে ফিডের উৎপাদন বছরে ৭৫ থেকে ৮০ লাখ টন। দেশীয় ফিড ইন্ডাস্ট্রি শতভাগ দেশীয় চাহিদা পূরণ করছে। দেশে নিবন্ধিত ফিড মিলের সংখ্যা ২৮১টি এবং অনিবন্ধিত মিলে মোট সংখ্যা ৪০০টি। এসব ইন্ডাস্ট্রিতে বিনিয়োগের পরিমাণ ২৫ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা।