আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকির চাপ বাড়ছে। ফলে বাড়তে পারে বাজেট ঘাটতি ও সরকারের ঋণ গ্রহণ। খাদ্য, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে ৫৭ হাজার কোটি টাকার বেশি ভর্তুকি লাগবে। তবে সরকার যদি বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সারের দাম বাড়ায় এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, এলএনজি ও সারের দাম কমে আসে, তাহলে ভর্তুকির পরিমাণ কমে আসবে। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সরকার জনজীবনে খরচের চাপ বেড়ে যায়- এমন পদক্ষেপ নাও নিতে পারে।

রোববার আর্থিক, মুদ্রা ও মুদ্রা বিনিময় হার-সংক্রান্ত কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের সভায় আগামী অর্থবছরের সম্ভাব্য বাজেটের ওপর এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী অর্থবছরে খাদ্য ভর্তুকি বাবদ মোট ছয় হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা লাগতে পারে। খাদ্যশস্য সংগ্রহ ও বিতরণে এ ভর্তুকির প্রাক্কলন করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে খাদ্য খাতে ভর্তুকিতে ছয় হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া আছে। অন্যদিকে অর্থ বিভাগ বলছে, মূল্য সমন্বয় করা না হলে আগামী অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি বাবদ ১৮ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রয়োজন পড়বে, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় দ্বিগুণ। ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি বাবদ ৯ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ আছে। একইভাবে গ্যাসের মূল্য সমন্বয় করা না হলে এলএনজি আমদানি মূল্য পরিশোধ ও প্রণোদনা প্যাকেজের সুদ ভর্তুকি দেওয়ার জন্য ১৭ হাজার ৩০০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে এলএনজির মূল্য পরিশোধে আট হাজার ৫০০ কোটি টাকার ভর্তুকি বরাদ্দ আছে। সারের মূল্য সমন্বয় করা না হলে কৃষি প্রণোদনা খাতে ১৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিতে হবে। চলতি অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ আছে ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

সামগ্রিকভাবে আগামী অর্থবছরে ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ ঋণ বাবদ জিডিপির ১ দশমিক ৯০ শতাংশ বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। জিডিপির আকার ধরা হয়েছে ৪৪ লাখ ১২ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা। এ হিসাবে আগামী অর্থবছরে মোট ভর্তুকি দাঁড়াবে ৮৩ হাজার ৮৪৪ কোটি টাকা। খাদ্য, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও কৃষি খাতের বাইরে সরকার রপ্তানি, রেমিট্যান্স, পাট, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে নেওয়া ঋণের সুদ, করোনায় প্রভাব মোকাবিলায় চালু করা বিভিন্ন প্যাকেজে প্রণোদনা, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য সরবরাহসহ বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি দিয়ে থাকে। এসব খাতে সরকারকে ২৬ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে সামগ্রিকভাবে ভর্তুকি বাবদ ৪৭ হাজার ৯১০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। সংশোধিত বাজেটে এর পরিমাণ বাড়ছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে এ খাতে প্রকৃত ব্যয় হয়েছে জিডিপির ১ দশমিক ১৭ শতাংশ।

করোনা-পরবর্তী সময়ের বাড়তি চাহিদার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও এলএনজির দাম বেড়েছে। বেড়েছে খাদ্যপণ্য ও সারের দামও। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে এসব পণ্যের দাম কমার কোনো ইঙ্গিত মিলছে না। গতকাল রোববার সন্ধ্যায় প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ১০৭ ডলারে বেচাকেনা হয়েছে। প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি স্পট মার্কেটে বেচাকেনা হচ্ছে প্রায় ৩০ মার্কিন ডলারে। বেড়েছে গম ও চালের দাম। পাশাপাশি সারের দামও বেড়েছে। জ্বালানি তেলের পুরোটাই আমদানি করতে হয় সরকারকে। এ ছাড়া এলএনজিও আমদানি করে সরকার। সারের চাহিদার বড় অংশ আমদানি করে মেটানো হয়। আর সরকারের খোলা বাজারে বিক্রিসহ বিভিন্ন খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির জন্য চাল ও গম কিনতে হয়। যার কিছু অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে এবং কিছু আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সংগ্রহ করা হয়। করোনা এবং বৈশ্বিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধির কারণে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি বাড়াতে হচ্ছে সরকারকে।

এদিকে, আগামী অর্থবছরে অর্থ বিভাগ ছয় লাখ ৭৭ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রাক্কলন করেছে। এর মধ্যে পরিচালন ব্যয় বাবদ চার লাখ ৩১ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা ব্যয় হবে। যার মধ্যে বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয় হবে ৭৪ হাজার ৪১২ কোটি টাকা। ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হবে ৮০ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাবদ অর্থ বিভাগ দুই লাখ ৪৬ হাজার ২০৭ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রাক্কলন করেছে।

অর্থ বিভাগ মনে করছে, আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। মূল্যস্ম্ফীতির গড় হার দাঁড়াবে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। আগামী অর্থবছরে জিডিপির ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ বিনিয়োগ প্রাক্কলন করা হচ্ছে। এর মধ্যে বেসরকারি খাত থেকে ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ এবং সরকারি খাত থেকে ৬ দশমিক ৬ শতাংশ বিনিয়োগ আসবে। মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হচ্ছে চার লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে সংগ্রহ হবে তিন লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। এনবিআর বহির্ভূত কর থেকে ১৮ হাজার কোটি এবং কর-বহির্ভূত রাজস্ব থেকে ৪৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের প্রাক্কলন করা হয়েছে। সামগ্রিকভাবে বাজেটের ঘাটতি ধরা হচ্ছে দুই লাখ ৪৪ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা।