ফের খাদের কিনারে শেয়ারবাজার। লাগাতার দরপতনে চোখে অন্ধকার দেখছেন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা। একসময় যেসব প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী আশার কথা শোনাতেন, তারাও এখন নির্বাক। এর মধ্যে গতকাল সোমবার ব্যাপক দরপতন হয়েছে। ভয়াবহ দরপতনে ক্রেতাশূন্য হয়ে পড়ে অধিকাংশ শেয়ার। বিশ্নেষকরা মনে করেন, শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির হস্তক্ষেপই চলতি পতনের মূল কারণ।
বর্তমানে ঢাকার শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ৩৪৯টি। সোমবার ৩১৮টিই দর হারিয়েছে, বেড়েছে মাত্র ১৪টির। লেনদেনের একপর্যায়ে ৩০২ শেয়ার সার্কিট ব্রেকারের সর্বনিম্ন দরে কেনাবেচা হয়েছে। আড়াইশর বেশি শেয়ারের ক্রেতাই ছিল না। একই পরিস্থিতি ছিল মিউচুয়াল ফান্ড ও করপোরেট বন্ড খাতেও। ব্যাপক দরপতনে প্রধান মূল্য সূচক ডিএসইএক্স ৭২ পয়েন্ট হারিয়ে ৬৪৮২ পয়েন্টে নেমেছে। এ নিয়ে চলতি এপ্রিলেই সূচক হারিয়েছে ২৭৫ পয়েন্ট।

দরপতনের এ চিত্র শুধু গতকালের নয়, গত ছয় মাসের বেশি সময় থেমে থেমে দরপতন চলছে। এ দফায় দরপতনের সূচনা হয় গত বছরের অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে। ২০২০ সালের জুলাই থেকে টানা সোয়া এক বছরের উত্থানে মূল্য সূচক ৩৪০০ পয়েন্ট বেড়ে ৭৪০০ পয়েন্ট পার করে। এ পর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিক ও কৌশলী বড় বিনিয়োগকারীরা মুনাফা তুলে নিতে শেয়ার বিক্রি শুরু করলে পতনের সূচনা হয়। একই সময়ে কারসাজির চক্রও তাদের শেয়ার বিক্রি করতে শুরু করে, যা দরপতনকে ত্বরান্বিত করে।

অভিজ্ঞদের মতে, এটাই শেয়ারবাজারের স্বাভাবিক প্রবণতা। বড় বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগে শেয়ারদর, সূচক ও লেনদেন বাড়ে। এসব দেখে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে আকৃষ্ট হন। কিন্তু বড় বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে যখন চলে যান, তা ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা বুঝতে পারেন না। বিনিয়োগ নিয়ে তারা আটকে থাকেন, পুঁজি হারান। এখন তেমনটি হচ্ছে।
সর্বশেষ গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরু হলে দরপতন ব্যাপক মাত্রা পায়। ওই দরপতন রুখতে নির্দিষ্ট দিনে যাতে কোনো শেয়ারের দাম ২ শতাংশের বেশি কমতে না পারে, তার জন্য সার্কিট ব্রেকারের নিয়মে পরিবর্তন আনে বিএসইসি। আগে কোনো শেয়ার নির্দিষ্ট দিনে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ বেশিতে বা কমে দরে কেনাবেচা হতে পারত। এখনও ১০ শতাংশ বাড়তে পারে; কিন্তু ২ শতাংশের বেশি কমতে পারে না।

চলতি দরপতনের জন্য এ ব্যবস্থাকেই দায়ী করছেন শেয়ারবাজার-সংশ্নিষ্ট ও বিশ্নেষকরা। এর ব্যাখ্যায় সংশ্নিষ্টরা জানান, নির্দিষ্ট দিনে কোনো শেয়ারের দর ২ শতাংশ কমা খুবই স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু সার্কিট ব্রেকার ২ শতাংশ হওয়ায় ওই শেয়ারের দর আরও কমতে পারে কিনা, তা বোঝা যায় না। ফলে কেউ শেয়ার কিনতে চান না। এ কারণে ক্রেতাশূন্য অবস্থা তৈরি হচ্ছে। লেনদেনও কমছে। গতকাল ঢাকার শেয়ারবাজারে ৩৯০ কোটি টাকার শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে, যা গত বছরের ৫ এপ্রিল বা এক বছরের বেশি সময়ের সর্বনিম্ন। অথচ গত বছরের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে এক দিনে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকারও শেয়ার কেনাবেচা হয়েছিল। নিয়ন্ত্রক সংস্থাও স্বপ্ন দেখিয়েছিল, লেনদেন দিনে পাঁচ হাজার কোটি টাকা এবং শেয়ারবাজার সূচক ১০-১২ হাজার পয়েন্ট ছাড়াবে।

শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অনারারি অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, দরপতন রুখতে সার্কিট ব্রেকার নামক শিকলটি আগে যত বড় ছিল, তা আরও ছোট করা হয়েছে। কোনো শেয়ারের দাম এক দিনে ১০ শতাংশ বাড়তে পারবে, কিন্তু ২ শতাংশের বেশি কমতে পারবে না। অন্য কোনো দেশের শেয়ারবাজারের সাধারণ বিনিয়োগকারীও যদি এ কথা শোনেন, তারা হাসবেন। এটা কী করে হয়?

তিনি বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধের পর শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের সব শেয়ারবাজারে ব্যাপক দরপতন হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশ ছাড়া আর কোনো দেশই দরপতন রুখতে বিশেষ ব্যবস্থা নেয়নি। এ যুদ্ধের প্রায় দুই মাস পর বিশ্বের সব শেয়ারবাজার আগের অবস্থায় ফিরেছে। ব্যতিক্রম শুধু বাংলাদেশ। এটা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রক সংস্থা অদূরদর্শিতা। যখন তারা এ পদক্ষেপ নিয়েছিল, তখনই এর খারাপ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেছিলাম।

এদিকে এমন দরপতন অব্যাহত থাকার শঙ্কা থেকে রমজানের আগে সব ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেছিল বিএসইসি। বৈঠক শেষে শত শত কোটি টাকার নতুন বিনিয়োগ আসবে বলেও আশার কথা শুনিয়েছিল। কিন্তু ফল শূন্য। এখন ব্যাপক দরপতনের মুখে তারা কথা বলতেও নারাজ। মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর সংগঠন বিএমবিএর সভাপতি ছায়েদুর রহমানকে ফোন করা হলে তার সাফ জবাব 'নো কমেন্ট'।

শীর্ষ এক মার্চেন্ট ব্যাংক কর্মকর্তা জানান, চলতি দরপতনের সঙ্গে ব্যাংকের সুদহার বেড়ে যাওয়ারও একটি সম্পর্ক থাকতে পারে। তিনি বলেন, যখন ব্যাংকের সুদহার কমে, তখন শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ বাড়ে। বিপরীতে ব্যাংকের সুদহার বাড়লে বিনিয়োগ কমে, দর হারায় অনেক শেয়ার।

মেয়াদি আমানতের সুদহার মূল্যস্ম্ফীতির কম হতে পারবে না মর্মে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক নির্দেশনার কারণে ব্যাংকগুলোর সুদহার ২ থেকে ৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে বাধ্য হয়েছে। তাছাড়া আমানতের তুলনায় ঋণ বিতরণের হার বেড়ে যাওয়ায় ঋণ-আমানত অনুপাত ঠিক রাখতে কিছু ব্যাংক উচ্চ সুদে আগ্রাসীভাবে আমানত সংগ্রহে নেমেছে। এর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব আছে শেয়ারবাজারে। বড় বিনিয়োগকারীরা আগাম সতর্কতা হিসেবে অনেকে তুলে নিয়েছেন। এটিও দরপতনের কারণ।

এদিকে আবুল খায়ের হিরোসহ গত দুই বছরের কারসাজি চক্রের প্রধানদের বিষয়ে গণমাধ্যমে একের পর এক খবর প্রকাশ হচ্ছে। এতে তারা সতর্ক হয়ে শেয়ার কেনাবেচা কমিয়েছেন। একটি ব্রোকারেজ হাউসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, এখানে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা কারসাজির হোতা বা বড় বিনিয়োগকারীদের দেখাদেখি শেয়ার কেনাবেচা করেন। এরা নিষ্ফ্ক্রিয় থাকায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কিছু বুঝে উঠতে পারছে না।

চলতি সংকট অবস্থার বিষয়ে সম্প্রতি শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, যখনই দরপতন হয়, তখন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ওই দরপতন রুখতে বাজারে হস্তক্ষেপ করছে। শেয়ারবাজার সূচকের গ্রাফ দেখলেই তা বোঝা যায়। এভাবে হস্তক্ষেপ করলে খারাপ অবস্থা দীর্ঘায়িত হবে বলে সতর্ক করেন তিনি।

কিন্তু গতকালই নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি বাজারমূল্যে শেয়ার বিক্রির অজুহাতে ৯টি ব্রোকারেজ হাউসের ১৫ কর্মকর্তাকে 'সাসপেন্ড' করার আদেশ দিয়েছে। এ বিষয়ে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র রেজাউল করিম সমকালকে বলেন, 'জিরো প্রাইস'-এ শেয়ার বিক্রির আদেশ দিয়ে দরপতনকে উস্কে দেওয়ায় এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান আইসিবির পাঁচ কর্মকর্তাও আছেন।
তবে শেয়ারবাজার-সংশ্নিষ্টরা জানান, জিরো প্রাইসে শেয়ার বিক্রি করা যায় না। বিনিয়োগকারী যখন বাজারমূল্যে শেয়ার বিক্রি করতে চান, তখন এভাবে শেয়ার বিক্রি করতে পারেন। এটা বৈধ। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি বরং ভয় দেখিয়ে শেয়ার বিক্রি বন্ধ করতে বাধ্য করছে। শেয়ার কেনা যেমন বিনিয়োগকারীর অধিকার, তেমনি আইন মেনে শেয়ার বিক্রি করাও তার অধিকার। বিএসইসি এ অধিকার ক্ষুণ্ণ করছে।
এ প্রসঙ্গে আবু আহমেদ বলেন, বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে কেউ কখনও সফল হয়নি। এটা জেনেও কেন তারা সে পথে হাঁটছেন, তা বোধগম্য নয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত এখনই শেয়ারদরের স্বাভাবিক সার্কিট ব্রেকার নীতি ফিরিয়ে আনা। এটা করা হলে হয়তো প্রথম দুই-তিন দিন শেয়ারদর ও সূচকের পতন হবে। কিন্তু এরপর বাজারে ক্রেতা আসবে, বাজার নিজের শক্তিতে ঘুরে দাঁড়াবে। বিনিয়োগকারীদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।