উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়নে ব্যয় সংকোচন নীতি নিয়েছে সরকার। নতুন প্রকল্প গ্রহণ নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। বরাদ্দ এবং নতুন প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ থেকে যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে তা সব ক্ষেত্রে আমলে নেওয়া হয়নি। বরং করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশের অর্থনীতি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, জ্বালানি তেল এবং খাদ্যপণ্যের বিশ্ববাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এসব কারণে আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) মন্ত্রণালয় এবং সরকারের বিভিন্ন বিভাগের দেওয়া চাহিদার চেয়ে ৩৯ হাজার কোটি টাকা কম বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানিয়েছে, আগামী অর্থবছরের এডিপির জন্য বিভিন্ন প্রকল্পের বিপরীতে মন্ত্রণালয় এবং বিভাগগুলোর চাহিদা ছিল দুই লাখ ৮৪ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা। তবে সার্বিক বিবেচনায় পরিকল্পনা কমিশন দুই লাখ ৪৬ হাজার ৬৬ কোটি টাকার এডিপির খসড়া চূড়ান্ত করেছে। এতে স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা এবং করপোরেশনের নিজস্ব অর্থায়ন অন্তর্ভুক্ত নয়। আগামী ১৭ মে অনুষ্ঠেয় জাতীয় অর্থনেতিক পরিষদে (এনইসি) চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। এনইসি চেয়ারপারসন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৈঠকে উপস্থিত থাকবেন।

এডিপি প্রণয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত একাধিক কর্মকর্তা সমকালের সঙ্গে বলেছেন, করোনা এবং বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে নতুন প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। সে হিসেবেই বিভিন্ন খাতের বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পের গুণমান বিচারে অতি সতর্কতা নেওয়া হয়েছে এবার।

পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগের প্রস্তাবিত এডিপির আকার চলতি অর্থবছরের মূল এডিপির তুলনায় ২০ হাজার ৭৪১ কোটি টাকা বেশি। চলতি অর্থবছর এডিপির আকার ছিল দুই লাখ ২৫ হাজার ৩২৫ কোটি টাকা। আবার চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এডিপির চেয়ে আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত এডিপি ৩৮ হাজার ৫১৬ কোটি টাকা বেশি। সংশোধনের পর চলতি অর্থবছরের এডিপির আকার দাঁড়িয়েছে দুই লাখ সাত হাজার ৭৫০ কোটি টাকা।

প্রস্তাবিত এডিপিতে বিদেশি সহায়তার পরিমাণ ৯৩ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে এ ক্ষেত্রে রাখা বরাদ্দের তুলনায় মাত্র ২২৫ কোটি টাকা বেশি। মূল এডিপিতে বিদেশি সহায়তার পরিমাণ ধরা হয় ৯২ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা। অবশ্য সংশোধিত এডিপিতে এ আকার ৭০ হাজার ২৫০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়।

জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগের সদস্য সরকারের সচিব প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী সমকালকে বলেন, সরকারের অগ্রাধিকার দলিলের ভিত্তিতেই প্রস্তাবিত এডিপির বরাদ্দগুলো নির্ধারণ করা হয়েছে। চলতি এবং অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্পকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য বরাবরের মতো গুরুত্বের তালিকায় রয়েছে। অন্যান্য প্রকল্পের ক্ষেত্রে উচ্চ, মধ্যম ও নিম্ন অগ্রাধিকার ভিত্তিক একটা শ্রেণীকরণ নীতিমালা আছে সরকারের। তার ভিত্তিতে বাকি প্রকল্পের বরাদ্দ বিবেচনা করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত এডিপির খাতভিত্তিক বিশ্নেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ৬৯ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ পাচ্ছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাত। এ খাতে মন্ত্রণালয় এবং বিভাগের চাহিদা ছিল ৭৯ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কম। দ্বিতীয় বড় বরাদ্দ ৩৯ হাজার ৪১২ কোটি টাকা পাচ্ছে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ বিভাগ। তাদের চাহিদার পরিমাণ ছিল প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা। ২৯ হাজার ৮১ কোটি টাকা তৃতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাচ্ছে শিক্ষা খাত। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এ খাতে বরাদ্দের চাহিদা ছিল ৩০ হাজার ২১৭ কোটি টাকা।

গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে করোনার প্রভাবে স্বাস্থ্য খাতের গুরুত্ব ও বরাদ্দ বেড়েছে। এ খাতে বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে ১৯ হাজার ২৭৮ কোটি টাকা। পরিস্থিতি বিবেচনায় চাহিদা থেকে খুব বেশি কাটছাঁট করা হয়নি। মন্ত্রণালয়ের চাহিদা ছিল ১৯ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র ১০০ কোটি টাকার মতো কমানো হয়েছে। সবচেয়ে বেশি কাটছাঁট করা হয়েছে স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন বিভাগের বরাদ্দ চাহিদায়। ২৮ হাজার ২২৮ কোটি টাকার চাহিদার বিপরীতে ১৬ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে চাহিদার চেয়েও বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে। চাহিদা এক হাজার ১৭৯ কোটি টাকা। বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে এক হাজার ২৭১ কোটি টাকা।