মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত সুদহার নির্ধারণ চায় ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন বিএলএফসিএ। সংগঠনটি মূল্যস্ফীতির চেয়ে ঋণে ৭ শতাংশ এবং আমানতে ৩ শতাংশ বেশি সুদ পুনর্নির্ধারণের দাবি জানিয়ে একটি চিঠি দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণে সর্বোচ্চ ১১ শতাংশ এবং আমানতে ৭ শতাংশ সুদহার নির্ধারণ করে সার্কুলারের পর এমন দাবি জানিয়ে গভর্নর বরাবর এ চিঠি দেওয়া হয়েছে।

ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সুদহারের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে গত ১৮ এপ্রিল সার্কুলার জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই নির্দেশনার আলোকে আগামী ১ জুলাই থেকে এসব প্রতিষ্ঠান ঋণে সর্বোচ্চ ১১ শতাংশ এবং আমানতে ৭ শতাংশ সুদ নির্ধারণ করতে পারবে। নতুন ও পুরাতন সব ঋণের ক্ষেত্রে এই সুদহার কার্যকর করতে হবে। নতুন আমানতের ক্ষেত্রে নির্ধারিত তারিখে এ সুদহার এবং পুরাতন আমানতে মেয়াদপূর্তির পর থেকে কার্যকর করতে হবে। এর আগে ২০২০ সালের ১ এপ্রিল থেকে ব্যাংকগুলোর ঋণে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদহার নির্ধারিত আছে। গত ৮ আগস্ট থেকে ব্যক্তি পর্যায়ের মেয়াদি আমানতে তিন মাসের গড় মূল্যস্ফীতির কম সুদ না দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। সর্বশেষ তথ্য অনুযাযী, গত মার্চে পয়েন্ট টু পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ২২ শতাংশ।

জানা গেছে, বাংলাদেশ লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিএলএফসিএ) পক্ষ থেকে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত সুদহার নির্ধারণের আবেদন করা হয় ঈদের আগে। বিষয়টি নিয়ে শিগগির গভর্নরসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের উচ্চ পর্যায়ে একটি বৈঠক করার চেষ্টা করছে তারা। বিএলএফসিএর আবেদনে বলা হয়, সুদহারের বিষয়টি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফলে এভাবে ৭ এবং ১১ শতাংশ নির্ধারণ না করে দিয়ে প্রতি ত্রৈমাসিকের মূল্যস্ফীতির ভিত্তিতে নির্ধারণ করা দরকার।

জানতে চাইলে বিএলএফসিএর চেয়ারম্যান আইপডিসি ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মমিনুল ইসলাম সমকালকে বলেন, সুদহার বৃদ্ধি-কমার বিষয়টি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। যে কারণে আমানতে ৭ এবং ঋণে ১১ শতাংশ সুদ নির্ধারণ না করে মূল্যস্ম্ফীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করার দাবি জানানো হয়েছে। আমানতে মূল্যস্ম্ফীতির চেয়ে ৩ শতাংশ এবং ঋণে ৭ শতাংশ বেশি সুদ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মাধ্যমে আমানত ও ঋণের মধ্যেকার সুদহারের ব্যবধান (স্প্রেড) ৪ শতাংশই অপরিবর্তিত থাকবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি সার্কুলার দিয়েছে যা আগের চেয়ে কঠোর। এসব নির্দেশনা মানতে গিয়ে সাময়িক কিছু অসুবিধা হলেও দীর্ঘমেয়াদে পুরো খাতের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে। তবে পরিচালক, এমডিসহ ভেতর থেকে দুর্নীতির কারণে যে ৬টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান চরম খারাপ অবস্থায় পড়েছে, সেগুলো পুনর্গঠন করতে পারলে দ্রুত আস্থা ফেরানো সম্ভব।

সংশ্নিষ্টরা জানান, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান একই বাজারে কাজ করে। দু'বছর আগে ব্যাংক ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হলেও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তা না করায় বাজার অসম হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে আগের আমানত ফেরত দিতে না পারা কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান নতুন করে উচ্চ সুদের প্রলোভন দেখিয়ে আমানত নিচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান আমানতে ১০ থেকে ১২ শতাংশ সুদ অফার করছে। ব্যাংকে যেখানে ঋণেই সর্বোচ্চ সুদ ৯ শতাংশ, সেখানে এত উচ্চ সুদে আমানত নিয়ে তারা কোথায় খাটাবে। মূলত আমানতকারীদের এভাবে চক্রে ফেলে আরও টাকা সংগ্রহ করা হচ্ছে। যে কারণে সুদহার নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ ও আমানতের সুদহার নির্ধারণ করে গত ১৮ এপ্রিল সার্কুলার জারি করলেও সুদহারে সীমা আরোপের সিদ্ধান্তটি কয়েক মাস আগের। এ নিয়ে আলোচনার পর থেকে সুদহার একটু করে কমেছে। সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ শেষে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণের গড় সুদহার নেমেছে ১০ দশমিক ২২ শতাংশে। আগের মাস ফেব্রুয়ারিতে যা ১০ দশমিক ৩৭ শতাংশ ছিল। আর বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে ছিল ১০ দশমিক ৫৯ শতাংশ। গত আগস্ট থেকে ঋণ ও আমানতের গড় সুদহারের তথ্য প্রকাশ করে আসছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই মাসে এসব প্রতিষ্ঠানের ঋণের গড় সুদহার ছিল ১০ দশমিক ৯৮ শতাংশ।