বিদেশের সঙ্গে লেনদেনে বাংলাদেশের চাপ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। রপ্তানির তুলনায় আমদানি ব্যয়ের পার্থক্য বেড়ে যাওয়ায় অনেক বড় অঙ্কের বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ সব সময় বাণিজ্য ঘাটতিতে থাকা দেশ। রেমিট্যান্স আয়ের মাধ্যমে এই ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা থাকে। পরিমিত বাণিজ্য ঘাটতি আর বাড়তি রেমিট্যান্স আয়ের কারণে অনেক সময় চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকে। কিন্তু এ বছর প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স আয়ও কমেছে। ফলে চলতি হিসাবের ঘাটতি পৌঁছেছে রেকর্ড পর্যায়ে। সামগ্রিক পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

বাংলাদেশ ব্যাংক রোববার চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ের লেনদেনের ভারসাম্য (ব্যালান্স অব পেমেন্ট) প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে দেখা গেছে, গত মার্চ শেষে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪৯১ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৬৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ বেশি। এ সময়ে রপ্তানি বেড়েছে ৩৩ শতাংশ। আর আমদানি বেড়েছে ৪৪ শতাংশ। অন্যদিকে, এই ৯ মাসে রেমিট্যান্স এসেছে এক হাজার ৫৩০ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ কম। সামগ্রিকভাবে চলতি অর্থবছরের ৯ মাস শেষে চলতি হিসাবে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪০৭ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল মাত্র ৫৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার।

তবে এই ৯ মাসে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আগের বছরের চেয়ে বেড়েছে। জুলাই থেকে মার্চ সময়ে ১৬৮ নিট এফডিআই পেয়েছে বাংলাদেশ, যা আগের বছরের তুলনায় ৪৭ শতাংশ বেশি। তবে পোর্টফোলিও বিনিয়োগ (শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ) ১১ কোটি ডলার ঋণাত্মক। অর্থাৎ এ সময়ে যে বিনিয়োগ এসেছে, চলে গেছে তার চেয়ে বেশি। তবে সরকারের মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ বেড়েছে। অন্যান্য দীর্ঘ ও স্বল্প মেয়াদি ঋণও বেড়েছে।

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন সমকালকে বলেন, বৈদেশিক লেনদেনে একটি উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। চলতি হিসাবের ঘাটতির কারণে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। চাপ সামলাতে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রায় ৫০০ কোটি ডলার বিক্রি করেছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত কমে আসছে। অন্যদিকে, ডলার বিক্রির বিপরীতে পরিশোধ করতে গিয়ে বাজারে নগদ টাকার প্রবাহ কমছে, যা সুদহার বাড়িয়ে দিচ্ছে। পরিস্থিতি সামলাতে তিনি বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ধরে রাখার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, হাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত রেখে বিনিময় হারে যতটা সম্ভব হস্তক্ষেপ করতে হবে। তাতে মূল্যস্ম্ফীতি কিছুটা বাড়লেও মেনে নিতে হবে। কিন্তু প্রয়োজনীয় আমদানির ব্যয় করার সামর্থ্য হারানো যাবে না। পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় আমদানি কমাতে হবে। সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়িত যেসব প্রকল্পে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হবে, সেগুলোর বাস্তবায়ন ধীর করা যেতে পারে। আর মূল্যস্ম্ফীতির চাপ সামলাতে দরিদ্র মানুষকে নগদ প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে।

চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৬ হাজার ১৫২ কোটি ডলার। রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ৩ হাজার ৬৬২ কোটি ডলার। এর ফলে বাণিজ্য ঘাটতি হয়েছে ২ হাজার ৪৯১ কোটি ডলার। সার্বিকভাবে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুতও কমে গেছে। মার্চ শেষে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ছিল ৪ হাজার ৪৪০ কোটি ডলার, যা দিয়ে ৪ দশমিক ৮ মাসের পণ্য ও সেবা আমদানির ব্যয় মেটানো সম্ভব। গত বছরের মার্চ শেষে ৫ দশমিক ৫ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা ছিল। আর শুধু পণ্য আমদানি করলে ৫ দশমিক ২ মাসের আমদানি দায় মেটানো যাবে রিজার্ভের অর্থ দিয়ে। তবে মার্চের পর বৈদেশিক মুদ্রার মজুত আরও কমেছে।