বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় দায়দেনা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) চেয়ে বাড়ছে। গত অর্থবছরে ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৭ শতাংশ। আগামীতে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ আরও বাড়বে। ঋণ পরিশোধ নিয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছর থেকে বাংলাদেশকে অস্বস্তিতে পড়তে হতে পারে। এ অবস্থায় দেশের দায়দেনা পরিস্থিতি নিয়মিত তদারকির পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

সরকারের দায়দেনা নিয়ে সোমবার সাংবাদিকদের সঙ্গে এক ভার্চুয়াল আলাপচারিতায় তিনি এমন মত দেন। তার মতে, সাম্প্রতিক সময়ে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি, বিনিময় হার বেড়ে যাওয়ার চাপ এবং পার্শ্ববর্তী দেশ শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও নেপালের আর্থিক সংকট বিবেচনায় দায়দেনা নিয়ে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় ঋণের চাপ সামলাতে তিনি সরকারকে তিনটি বার্তা দেন। প্রথমত, কর আহরণ বাড়ানোর মাধ্যমে আর্থিক সংহতিকরণ। দ্বিতীয়ত, বহিঃস্থ খাতের বর্তমান চাপ মোকাবিলায় সুরক্ষা দেওয়া এবং দায়দেনা পরিস্থিতির সামগ্রিক, স্বচ্ছ এবং নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা।

এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছর থেকে দায়দেনার ক্ষেত্রে গুণগত পরিবর্তন হতে পারে। ঋণ পরিশোধের বর্তমান স্বস্তিদায়ক অবস্থা অস্বস্তিদায়ক অবস্থায় যেতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে 'সবুজ' আখ্যা দিয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছর থেকে তা 'হলুদ' হতে পারে- এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, চীনের অর্থায়নে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ, রাশিয়ার অর্থায়নে রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্র নির্মাণসহ কিছু প্রকল্পে উচ্চ মূল্যের ঋণ পরিশোধের সময়সূচি এগিয়ে আসছে। উচ্চ সুদে নেওয়া এবং সরবরাহকারীর ঋণের প্রায় সাড়ে ১০ বিলিয়ন ডলারের ঋণের পরিশোধ প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে। আবার বিশ্বব্যাংক, জাপানসহ প্রথাগতভাবে যারা কম সুদে ঋণ দিত, তারাও এখন তুলনামূলক বেশি সুদ নিচ্ছে। সুতরাং স্বস্তির জায়গাটা কমে আসছে।

তিনি বলেন, সাম্প্রতিক কালে দায়দেনা নিয়ে শ্রীলঙ্কা বড় সংকটে পড়েছে। এর পরিণতিতে সেখানে রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। পাকিস্তান ও নেপালেও প্রায় একই অবস্থা চলছে। বাংলাদেশকে বিষয়টি সতর্ক পর্যালোচনার মধ্যে রাখতে হবে। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, তিনি বাংলাদেশকে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে তুলনা করতে চান না। বরং শ্রীলঙ্কা থেকে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। বাংলাদেশকে তার দায়দেনা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মধ্যে রাখতে হবে।

ড. দেবপ্রিয় ঋণ পরিস্থিতির ক্ষেত্রে পাঁচটি ঝুঁকির কথা বলেন। এর একটি হলো বিনিময় হারের ঝুঁকি। বাংলাদেশে এ ঝুঁকি বাড়ছে। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদের হারের ঝুঁকি বাড়ছে। বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রে সুদের হারের ঝুঁকিও কিছুটা বাড়ছে। অন্যদিকে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে। আর প্রকল্প থেকে অর্থনৈতিক লাভ কতটুকু হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে কোনো মূল্যায়ন করা হয়নি।

জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে দায়দেনা বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০১৪ এবং ২০১৮ সালে অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি উৎস থেকে ঋণ দেওয়া দ্রুততর হয়েছে। নির্বাচনের বছর এবং এর আগের ও পরের বছর সাধারণত ঋণ গ্রহণ বাড়ে এবং অনেক সময় গণতন্ত্রের ঘাটতি থাকলে দৃশ্যমান প্রকল্পে ঋণ নেওয়া হয়, যেখানে অর্থনৈতিক যৌক্তিকতার ঘাটতি থাকে। প্রকল্প ও ঋণ নির্বাচন কিছু ক্ষেত্রে যথাযথ হয় না।

ড. দেবপ্রিয় মনে করেন, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের ঋণ টেকসই পরিস্থিতির পর্যালোচনায় জিডিপির অংশ হিসেবে বাংলাদেশের দায়দেনার কম ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে। তবে শতাংশ কম হলেই তা সামগ্রিক বিচারে নিশ্চিতভাবে টেকসই বলা পরিপূর্ণ ব্যাখ্যা নয়। কোন ধরনের ঋণ, সুদের হার কেমন, পরিশোধের চাপ আগামীতে কেমন- এমন অনেক কিছুর ওপর পরিস্থিতি নির্ভর করবে। কোনো কারণে বিগড়ে গেলে সংকট হবে। সরকারের ঋণের সঙ্গে বেসরকারি খাতের ঋণ এবং সরকারের গ্যারান্টির ঋণ বা সংযুক্ত দায় যোগ করলে গত অর্থবছরে তা জিডিপির ৪৪ শতাংশের বেশি।

তিনি বলেন, এরই মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত অনেক কমে গেছে। যে স্বস্তির কথা বলা হতো, তা এখন নেই। বর্তমানে পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো রিজার্ভ রয়েছে। টাকার মূল্যমান ধরে রাখা যাচ্ছে না। এসব বিষয়ে সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণ অনেক বেড়েছে। যারা লাইবর রেটের সঙ্গে যুক্ত সুদহার নির্ধারিত না রেখে বাজারভিত্তিক রেখেছে, তাদের ক্ষেত্রে সুদের হারের চাপ বাড়তে পারে।