অধিকাংশ শেয়ারের দরবৃদ্ধিতে প্রধান মূল্য সূচক ডিএসইএক্স বেড়েছিল প্রায় ৫৫ পয়েন্ট।  কিন্তু গত দুদিনে এ সূচকই ১০৬ পয়েন্ট হারিয়েছে, যা আগের দুদিনের বৃদ্ধির প্রায় দ্বিগুণ। বুধবার ৮৫ শতাংশ শেয়ারের দরপতনে সূচকটি ৭৩ পয়েন্ট হারিয়ে ৬৫৯২ পয়েন্টের নিচে নেমেছে।

ঈদের পর রোববার ও সোমবারের দরবৃদ্ধির সঙ্গে লেনদেন ফের হাজার কোটি টাকার বেশি হওয়ায় বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর আশা দেখছিলেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। কিন্তু বুধবারের বড় দরপতনে তাদের আশা ফিকে হয়েছে। 

বুধবার প্রধান শেয়ারবাজার ডিএসইতে কেনাবেচা হওয়া ৩৭৯ কোম্পানির শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ৩২৩টির দরপতন হয়েছে, যা মোটের ৮৫ শতাংশের বেশি। বিপরীতে মাত্র ৩৫টির দর বেড়েছে, যা মোটের ৯ শতাংশ। বাকি ২১টির দর অপরিবর্তিত।

সিংহভাগ শেয়ারের দরপতনে এ বাজারের প্রধান মূল্য সূচক ৭৩ পয়েন্ট হারিয়ে ৬৫৯২ পয়েন্টের নিচে নেমেছে। সূচক পতনের হার ১ দশমিক ১০ শতাংশ। যদিও লেনদেন শুরুর সোয়া এক ঘণ্টা পর মঙ্গলবারের তুলনায় প্রায় ১১ পয়েন্ট বেড়ে ৬৬৭৬ পয়েন্ট উঠেছিল। এরপর দরপতন শুরু হলে ক্রমাগত সূচকটি সোয়া ২টায় আগের অবস্থান থেকে প্রায় ৯১ পয়েন্ট এবং আগের দিনের তুলনায় ৮০ পয়েন্ট কমে ৬৫৮৫ পয়েন্ট পর্যন্ত নেমেছিল।

শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, নতুন শুরু হওয়া দরপতন শুরু হয়েছিল মূলত মঙ্গলবার লেনদেনের তিন ঘণ্টা পার হওয়ার পর বেলা ১টা থেকে। আগের তিন ঘণ্টায় শেয়ারদর ও লেনদেনে অস্থিরতা থাকলেও তা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ফের বড় দরপতনের ভয় ধরায়নি। শেষ দেড় ঘণ্টার লাগাতার দরপতনে সূচকের উল্লেখযোগ্য পতনের পর বুধবারের দরপতন চিন্তায় ফেলেছে তাদের। 

এ নিয়ে গত দুইদিনে সূচকটি ১০৬ পয়েন্ট হারালো, যেখানে আগের দুইদিনে ৫৫ পয়েন্টেরও কম বেড়েছিল। দুইদিন বেড়ে পরের দুইদিন সূচক কমার এ ধারা গত ২৬ এপ্রিল থেকে চলছে। ২৬-২৭ এপ্রিল দুইদিনে সূচক বেড়েছিল পৌনে ১১ পয়েন্ট। পরের দুইদিন ২৮ এপ্রিল ও ৫ মে কমেছিল ৩৪ পয়েন্ট।

প্রধান মার্চেন্ট ব্যাংক আইডিএলসি ইনভেষ্টমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান সমকালকে বলেন, ‘এ মুহূর্তে বাজারের গতিবিধি ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। গত রোববার ও সোমবার অপেক্ষাকৃত ভালো মৌলভিত্তির কিছু শেয়ারের দরবৃদ্ধি পেয়েছিল, তৃতীয় প্রান্তিকে যেগুলোর ইপিএসও বেড়েছিল। এগুলোর দরবৃদ্ধি থেমে গেছে।’

বছরের এ সময়ে সাধারণত বাজেটকেন্দ্রিক ইস্যুগুলোর প্রভাব থাকে- এমন মন্তব্য করে মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, ‘এ বছর এখন পর্যন্ত তেমন কোনো প্রভাব দেখছি না।’

বুধবারের লেনদেন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রতিটি খাতেরই সিংহভাগ শেয়ারের দরপতন হয়েছে। বড় খাতগুলোর মধ্যে সাকুল্যে সর্বাধিক আড়াই শতাংশ দর হারিয়েছে বস্ত্র খাত। যদিও গত দুইদিনে এ খাতের শেয়ারদর কিছুটা বেড়েছিল। 

বীমা খাতের সার্বিক শেয়ারদর কমেছে ২ শতাংশের বেশি। অন্য সব বড় খাতের ১ থেকে ২ শতাংশ পর্যন্ত দরপতন হয়েছে।

ছোট খাতগুলোর মধ্যে সেবা ও নির্মাণ, কাগজ ও ছাপাখানা এবং ভ্রমণ ও অবকাস খাতের শেয়ারদর ৩ থেকে সাড়ে ৩ শতাংশ পতন হয়েছে।

বুধবারের ৩ শতাংশের ওপর দরপতন হয়েছে ৮৩ শেয়ারের। সর্বাধিক সোয়া ৬ শতাংশের ওপর দরপতন হয়েছে এশিয়া ইন্স্যুরেন্সের।

গত বছরের জন্য ১৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণার পর শেয়ারটির দর ৭২ টাকা ২০ পয়সা থেকে কমে ৬৭ টাকা ৬০ পয়সায় নেমেছে।

লেনদেনের শেষ পর্যন্ত সার্কিট ব্রেকার নির্ধারিত সর্বনিম্ন দরে (৫ বা প্রায় ৫ শতাংশ কমে) কেনাবেচা হয়েছে বাংলাদেশ মনোস্পুল পেপার, পেপার প্রসেসিং, প্রগতি ইন্স্যুরেন্স এবং ইউনিয়ন ক্যাপিটাল।

লেনদেনের মাঝে সার্কিট ব্রেকারের সর্বনিম্ন দরে কেনাবেচা হওয়া বাকি শেয়ারগুলো হলো- আমরা টেকনোলোজিস, এডিএন টেলিকম, আলিফ ম্যানুফ্যাকচারিং, অলটেক্স, এপেক্স ট্যানারি, বিডি কম, বিডি থাই ফুড, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স, কপারটেক, ড্রাগন সোয়েটার, ইস্টার্ন হাউজিং, ফারইস্ট লাইফ, ফেডারেল ইন্স্যুরেন্স, ফার্স্ট ফাইন্যান্স, জেমিনি সী ফুডস, গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্স, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, ইমাম বাটন, আইপিডিসি, কাট্টলী টেপটাইল, ম্যাকসন্স স্পিনিং, মালেক স্পিনিং, মোজাফফর হোসেইন স্পিনিং, ন্যাশনাল হাউজিং, অলিম্পিক এপেসরিজ, দি পেনিনসুলা চিটাগং, পিপলস ইন্স্যুরেন্স, কাশেম ইন্ডাস্ট্রিজ, রিজেন্ট টেপটাইল, রিং শাইন টেপটাইল, সাভার রিফ্যাক্টরিজ, শাশা ডেনিম, তাকাফুল ইন্স্যুরেন্স, তমিজুদ্দিন টেপটাইল, ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স, ইউনিক হোটেল, জাহীন স্পিনিং এবং জিলবাংলা সুগার।

লেনদেনের শেষ পর্যন্ত এসব শেয়ারের বেশিরভাগ দরপতনের শীর্ষে ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে শেয়ারদর কিছুটা বেড়েছিল। এর মধ্যে ইমাম বাটনের শেয়ার সার্কিট ব্রেকারের সর্বনিম্ন দরে কেনাবেচা হলেও পরে প্রায় ৭ শতাংশ দর বেড়ে দিনের লেনদেন শেষ হয়।

সার্বিক দরপতনের মধ্যেও গতকাল এসিআই ফর্মুলেশন কোম্পানির শেয়ারের দরবৃদ্ধি অব্যাহত আছে। বুধবার শেয়ারটির দর সাড়ে ৬ শতাংশ বেড়েছে, সর্বশেষ কেনাবেচা হয়েছে ২১৭ টাকা ৯০ পয়সায়। মাত্র তিন দিনে শেয়ারটির দর ১৬৯ টাকা থেকে এ পর্যায়ে এসেছে।

এর বাইরে বিডি ফাইন্যান্সের দর প্রায় ৭ শতাংশ বেড়ে ছিল দরবৃদ্ধির শীর্ষে। সাড়ে ৫ শতাংশ দর বেড়ে আরডি ফুড ছিল দরবৃদ্ধির চতুর্থ স্থানে।

এদিকে দরপতন সত্ত্বেও বুধবার লেনদেন ছিল হাজার কোটি টাকার ওপরে।

ডিএসইতে কেনাবেচা হওয়া শেয়ারের মূল্য ছিল ১ হাজার ১৩৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা। অবশ্য এর মধ্যে সাড়ে ৯৮ কোটি টাকার লেনদেনই হয়েছে ব্লক মার্কেটে। একটি চিহ্নিত কারসাজি চক্রই ব্লক মার্কেটের প্রায় সব লেনদেন করেছে। পাবলিক মার্কেটের লেনদেনেও এ চক্রটির নিয়ন্ত্রণ করা শেয়ারগুলো ছিল লেনদেনের ওপরের দিকে।