গত ১১ বছরেও শুরু হয়নি আশুগঞ্জ নৌবন্দরে অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মিনাল (আইসিটি) প্রকল্পের অবকাঠামো তৈরির কাজ। ভারতকে নৌপথে ট্রানজিট সুবিধা দিতে দেশটির ঋণ সহায়তার (এলওসি) আওতায় ২০১১ সালে প্রকল্পটি নেওয়া হয়। কিন্তু জমি অধিগ্রহণের পেছনেই গেছে প্রায় পুরোটা সময়। আর কোনো কাজই হয়নি। অন্যদিকে প্রকল্পের মেয়াদ এরই মধ্যে একদফা বেড়েছে। চলছে আরেক দফা বাড়ানোর প্রক্রিয়া। ফলে ২৪৫ কোটি টাকার মূল প্রকল্প ১৮শ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকতে পারে বলে জানা গেছে।

কবে নাগাদ নতুন ডিজাইন-ড্রয়িং হবে, কবে অবকাঠামো নির্মাণ শুরু হবে তা জানতে বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য জানা সম্ভব হয়নি।

২০১০ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত অভ্যন্তরীণ নৌ-প্রটোকল চুক্তির আওতায় আশুগঞ্জ নৌবন্দরকে 'পোর্ট অব কল অ্যান্ড ট্রান্সশিপমেন্ট পয়েন্ট' ঘোষণা করা হয়। আন্তঃদেশীয় নৌবাণিজ্য বাড়াতে আশুগঞ্জ নদীবন্দরে আইসিটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১১ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ২৪৫ কোটি টাকা ব্যয় ধরে এ সংক্রান্ত প্রকল্পটি অনুমোদন করে। এ অর্থের মধ্যে ভারতীয় ঋণ সহায়তার পরিমাণ ধরা হয় ২১৯ কোটি টাকা।

আশুগঞ্জ নৌবন্দর ব্যবহার করে অনানুষ্ঠানিকভাবে বেশ কয়েক দফা ভারতীয় বিভিন্ন পণ্য পরিবহন করা হয়। পরে ২০১৬ সালে আশুগঞ্জ নদীবন্দরে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দেওয়ার ঘোষণা আসে। হাতে নেওয়া প্রকল্পটি ২০১৬ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের কথা থাকলেও ভূমি সংক্রান্ত নানা জটিলতাসহ আরও নানা সমস্যায় তা নির্দিষ্ট মেয়াদে আলোর মুখ দেখেনি।

২০১৮ সালের মে মাসে একনেকে এ-সংক্রান্ত সংশোধিত প্রকল্প অনুমোদন হয়। ২০২১ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয় এক হাজার ২৯৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ভারতীয় ঋণ সহায়তার পরিমাণ ছিল ৪৩১ কোটি টাকা। আর বাংলাদেশ সরকারি অর্থ ৮৬২ কোটি টাকা।

বাস্তবায়নকারী সংস্থা বিআইডব্লিউটিএর প্রস্তাবনা অনুসারে জেলা প্রশাসন এ প্রকল্পের অবকাঠামো নির্মাণের জন্য আশুগঞ্জ নদীবন্দরের ভাটিতে প্রায় আধা কিলোমিটার দক্ষিণে চরচারতলা মৌজায় ব্যক্তি মালিকানাধীন ২৬ একরের বেশি জমি অধিগ্রহণ করে। অধিগ্রহণ মূল্য ও বিভিন্ন অবকাঠামোর ক্ষতিপূরণ বাবদ ৬শ কোটি টাকার বেশি পরিশোধ করে জেলা প্রশাসন ২০২০ সালের মার্চে বিআইডব্লিউটিএর কাছে তা হস্তান্তর করে।

জেলা প্রশাসন থেকে বিআইডব্লিউটিএ ভূমি বুঝে নিয়ে দরপত্রের মাধ্যমে বিভিন্ন অবকাঠামো সরিয়ে নেয়। কিন্তু প্রকল্পের নকশা-ডিজাইন কিছু পরিবর্তন ও করোনা অতিমারির কারণে ভারতীয় পরামর্শকরা আসতে না পারায় অবকাঠামো নির্মাণ শুরু করা সম্ভব হয়নি। নানা জটিলতায় অবকাঠামো নির্মাণ শুরুই করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।

সূত্র জানায়, প্রকল্পের নির্ধারিত সময়সীমা প্রায় শেষ ও প্রকল্পের ডিজাইন-ড্রয়িংয়ে কিছু পরিবর্তন হওয়ায় নতুন সংশোধিত প্রস্তাবনা ভারতে পাঠানো হয়েছে। এটি ভারত থেকে অনুমোদন হয়ে এলে আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্পের অবকাঠামো নির্মাণ শুরু হবে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। সংশোধিত প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৭৭৬ কোটি।

প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর মধ্যে রয়েছে- আন্তর্জাতিক মানের কনটেইনার টার্মিনাল, জেটি, কাস্টমস অফিস, ক্রেন ও ট্রাক ইয়ার্ড, ইলেকট্রিক সাবস্টেশন, ওয়্যারহাউস ও রেস্টহাউসসহ প্রয়োজনীয় স্থাপনা নির্মাণ। সংশ্নিষ্টদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে যেমন আন্তঃদেশীয় বাণিজ্যের প্রসার হবে, তেমনি স্থানীয়ভাবে আশুগঞ্জ বন্দরের গুরুত্ব বৃদ্ধিসহ বাড়বে বন্দরের লোডিং-আনলোডিং সক্ষমতা।

প্রকল্পের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে জানতে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান কমডোর গোলাম সাদেক এবং প্রকল্প পরিচালক মো. সাজেদুর রহমানের মোবাইল নম্বরে কল করে ও খুদেবার্তা পাঠিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের পাওয়া যায়নি।