শেয়ারবাজারে আবারও বড় দরপতন হয়ে গেল সোমবার। প্রধান শেয়ারবাজার ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ৯১ শতাংশের বেশি শেয়ার দর হারিয়েছে। বিপরীতে দর বেড়েছে মাত্র ৭ শতাংশেরও কম শেয়ারের। সিংহভাগ শেয়ার দর হারানোয় প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ১৩৪ পয়েন্ট হারিয়ে ৬৪৩১ পয়েন্টের নিচে নেমেছে। সূচক পতনের হার ২ শতাংশের বেশি। এ পতন গত ৭ মার্চের পর সর্বোচ্চ।

গতকালের এ পতনের সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই। মূলত গত বছরের অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে ডিএসইএক্স সূচক ৭৪০০ পয়েন্ট ছাড়ানোর পর থেকে দরপতন শুরু হয়। এর পর থেমে থেমে টানা সাত মাস ধরে দরপতন চলছে। এ দরপতনে তালিকাভুক্ত ৩৪৯ কোম্পানি ও ৩৬ মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের সিংহভাগ দর হারিয়েছে। ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত দর হারিয়েছে প্রায় দেড়শ শেয়ার। এর মধ্যে মৌলভিত্তিসম্পন্ন অনেক দামি শেয়ারও রয়েছে।
বাজার সংশ্নিষ্টরা জানান, ২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২১ সালের অক্টোবর পর্যন্ত যাদের বিনিয়োগে শেয়ারবাজারে বড় উত্থান হয়েছিল, তাদের অনেকে মুনাফা তুলে নিতে গত সাত মাসে শেয়ার বিক্রি করেছেন। অর্থাৎ প্রভাবশালী যারা এক সময়ে শেয়ারের ক্রেতার ভূমিকায় ছিলেন, তারা বিক্রেতার ভূমিকায় যাওয়ার পরই বাজারে দরপতন শুরু হয়। শেয়ারদরের সঙ্গে সূচক ও লেনদেনও কমতে থাকে।

এর নেতিবাচক মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব পড়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীর মধ্যে। ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের দিক থেকেও নতুন বিনিয়োগে ভাটা পড়ে। অন্যদিকে, যারা আশাবাদী থেকে শেয়ার ধরে রাখছিলেন, তারা এখন বড় অঙ্কের লোকসানে। ধৈর্যহারা হয়ে তাদের কেউ কেউ লোকসানে শেয়ার বিক্রি করছেন বলে কয়েকটি ব্রোকারেজ হাউস কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গতকালসহ সর্বশেষ চার কার্যদিবসে ২৬৭ পয়েন্ট হারিয়েছে ডিএসইএক্স সূচক। গত সপ্তাহের শেষ তিন কার্যদিবসে সূচক হারায় ১৩২ পয়েন্ট। তবে দরপতন থামাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি গত সপ্তাহে যতটা তৎপর ছিল, গতকাল ততটা ছিল না। যদিও গতকালও কয়েকটি ব্রোকারেজ হাউসকে জানায়, দুপুর ১টার পর থেকে শেয়ার বিক্রির চাপ কমিয়ে এবং বিক্রি চাপ বাড়িয়ে সূচক ওঠানোর চেষ্টা করা হবে। তবে তেমন চেষ্টা শেষ পর্যন্ত দেখা যায়নি।

এ অবস্থায় দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত লেনদেনে আসা ৩৮১ কোম্পানির শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ৩৪৮টিই দর হারিয়েছে। বেড়েছে মাত্র ২৬টির। অপরিবর্তিত থেকেছে ৭টির দর। এর মধ্যে ১৪৪ কোম্পানির শেয়ার লেনদেনের মাঝে সার্কিট ব্রেকারের সর্বনিম্ন দরে নেমেছিল। শেষ পর্যন্ত ওই দরে স্থির থাকে ৬৭ শেয়ার। শেয়ারদর ও সূচকের পতন কমিয়ে রাখতে সার্কিট ব্রেকারের নিম্নসীমা এখন ৫ শতাংশে সীমাবদ্ধ করে রেখেছে বিএসইসি। যদিও দরবৃদ্ধির ঊর্ধ্বসীমা ১০ শতাংশ বহাল আছে।

মাত্র ছয় শেয়ার দিনের লেনদেনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দর বেড়ে কেনাবেচা হয়। এগুলো হলো এফএএস ফাইন্যান্স, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, সাফকো স্পিনিং, বিচ হ্যাচারি, ফু-ওয়াং সিরামিক এবং শাইনপুকুর সিরামিক। বিপরীতে ৭৮ কোম্পানির শেয়ার লেনদেনের পুরো সময়ে দর হারিয়ে কেনাবেচা হয়। সেবা ও নির্মাণ, কাগজ ও ছাপাখানা এবং ভ্রমণ ও অবকাশ খাতের ১৩ কোম্পানির শেয়ারদর গড়ে প্রায় ৫ শতাংশ দরপতন হয়েছে। এ ছাড়া বড় খাতগুলোর মধ্যে আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বীমা, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ, প্রকৌশল, বস্ত্র, সিমেন্ট এবং তথ্য ও প্রযুক্তি খাতের দরপতন হয়েছে ৩ থেকে প্রায় ৪ শতাংশ পর্যন্ত। মূলধন বিবেচনায় সবচেয়ে বড় খাত ব্যাংক এবং টেলিযোগাযোগ খাতের দরপতনের হার প্রায় ১ শতাংশ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অনারারি অধ্যাপক আবু আহমেদ সমকালকে বলেন, বাজারে 'প্যানিক সেল' হচ্ছে। নানা ইস্যুতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভয় ঢুকে গেছে। ফলে একটু অস্থিরতা শুরু হলে অনেকে শেয়ার বিক্রি করতে শুরু করেন। দরপতন ত্বরান্বিত হলে অনেক প্রতিষ্ঠান মার্জিন ঋণ আদায়ে 'ফোর্স সেল' করছে। এর বাইরে জুয়াড়ি চক্রের শেয়ার বিক্রি এবং বিদেশিদের শেয়ার বিক্রির চাপও শেয়ারবাজারকে নাজুক করে তুলছে।