বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ৫৮ শতাংশ বাড়িয়ে প্রতি ইউনিট ৮ টাকা ৫৮ পয়সা করার প্রস্তাব করেছে। বৃহস্পতিবার সমকালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম নির্ধারক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) পিডিবির প্রস্তাবের ওপর গণশুনানির আয়োজন করে। তাদের টেকনিক্যাল কমিটি ভর্তুকি ছাড়া এক ইউনিট বিদ্যুতের দাম বর্তমান দামের অর্ধেকের বেশি বাড়িয়ে ৮ টাকা ১৬ পয়সা করার পক্ষে মত দিয়েছে। এর বিরোধিতা করেছেন ব্যবসায়ী ও ভোক্তা সংগঠনের প্রতিনিধিরা। তাঁরা এ ব্যাপারে ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ করে দেখিয়েছেন, বিভিন্ন খাতে অপচয় বন্ধ করলে ৪০ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি পুষিয়েও ৩ হাজার কোটি টাকা লাভে থাকবে পিডিবি। ব্যবসায়ীরা এও বলেছেন, ফের গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়লে শিল্প-কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। তাঁদের পক্ষে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা হবে কঠিন।
আমরা অতীতে এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই বলেছিলাম, বিদ্যুৎ ঘাটতি দূর করার যেমন নানা পথ আছে, তেমনি তা কম খরচে উৎপাদনেরও পথ আছে। বিদ্যুৎ চুরি ও অপচয় বন্ধ করাও দুরূহ নয়, যদি দায়িত্বশীলরা সচেষ্ট হন এবং সংশ্নিষ্ট সবার জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়। উৎপাদনের ক্ষেত্রে সস্তা জ্বালানিভিত্তিক বেইজলোড প্লান্ট স্থাপন যেমন জরুরি, তেমনি ভাড়াভিত্তিক উচ্চমূল্যের ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে সরকারকে বিদ্যুৎ কেনার ব্যাপারেও সাশ্রয়ী হতে হবে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর তিন থেকে পাঁচ বছর মেয়াদ ধরে বিদ্যুতের যে দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল, তাতে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো তাদের বিনিয়োগ কার্যত উঠিয়ে নিয়েছে। কাজেই তাদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনায় চুক্তি নবায়ন করার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে ভাবা প্রয়োজন। তাছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহূত জ্বালানির ওপর আরোপিত শুল্ক্ক কমিয়েও ঘাটতি সামাল দেওয়ার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে।
আমরা মনে করি, সামগ্রিকভাবে ভোক্তা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম সহনীয় রাখতে স্বল্পমূল্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কোনোই বিকল্প নেই। আমাদের বোধগম্য নয়, এসব উদ্যোগ না নিয়ে দফায় দফায় দাম বাড়িয়ে লোকসান ঠেকানো কিংবা ঘাটতি পূরণের এই চিন্তা জেঁকে বসে কেন? মনে রাখা প্রয়োজন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রভাব শুধু ভোক্তার ওপরই পড়ে না, পণ্য উৎপাদন খরচও বেড়ে যায়। বিদ্যুতে ভর্তুকির চাপ যাতে সরকারকে বইতে না হয়, সে জন্য যে কর্মপরিকল্পনা ও নীতি দরকার, এর কার্যকর উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয় না। চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে ফারাক এখন অনেক কমেছে। তবে অনিয়ম-দুর্নীতি কমেনি- এই অভিযোগ রয়েছে। আমরা মনে করি, যথাযথ নীতিমালার ভিত্তিতে বহুমুখী জ্বালানি ব্যবহারের দূরদর্শী কর্মপরিকল্পনার বিকল্প নেই। উৎপাদন ও বিতরণ সংস্থাগুলোর মধ্যে আরও সমন্বয় করে যূথবদ্ধভাবে কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগোলে ঘাটতি সমন্বয় ও ভর্তুকি হ্রাস দুই-ই সম্ভব।
ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া, অর্থাৎ শতভাগ বিদ্যুতায়ন সরকারের অঙ্গীকার। ভর্তুকি, লোকসান ইত্যাদি অজুহাত দাঁড় না করিয়ে নির্মোহ অবস্থান নিতে হবে স্বচ্ছতা ও জাবাবদিহি নিশ্চিতকরণে। আমরা মনে করি, গণশুনানিতে যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে, সেসব বিষয় সরকারের আমলে নেওয়া উচিত। বিশেষজ্ঞরা যে পরামর্শ দিয়েছেন, এর আলোকে পদক্ষেপ নিলে যদি ঘাটতি সমন্বয় ও উদ্বৃত্ত দুই-ই সম্ভব হয়, তাহলে দাম বাড়িয়ে ভোক্তার জন্য 'মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা' সৃষ্টি কেন? আমরা এও মনে করি, অপচয় ও চুরির পাশাপাশি সিস্টেম লসের কারণে যে ক্ষতি হয়, তা কমানোর ব্যাপারেও গভীর মনোযোগ জরুরি। অর্থনীতি ও জনজীবনে চাপ পড়ে, এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া উচিত হবে না। করোনা-উত্তর পরিস্থিতিতে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধিসহ দৈনন্দিন জীবনে এমনিতেই নানামুখী চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বিদ্যুৎ যেহেতু অর্থনীতিসহ জনজীবন সচল রাখার অন্যতম প্রধান বিষয়, তাই এ খাতে দেওয়া ভর্তুকিকে নিছক খরচ হিসেবে না দেখে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ হিসেবে দেখাটাই উত্তম। বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব থেকে সরে আসা উচিত বলে আমরা মনে করি।

বিষয় : বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব

মন্তব্য করুন