নানা জল্পনা-কল্পনার পর অবশেষে সরকারবিরোধী 'বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য' গড়তে আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নিয়েছে রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। দীর্ঘদিন ধরে পর্দার আড়ালে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা করলেও গতকাল মঙ্গলবার প্রথম নাগরিক ঐক্যের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সংলাপে বসে দলটি। নির্দলীয় সরকারের অধীনে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের দাবির পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আগামী জুন মাসের মধ্যেই সংলাপের মাধ্যমে 'ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে'র রূপরেখা চূড়ান্ত করবে তারা। সোমবার বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন দলের সঙ্গে আলোচনা করতে স্থায়ী কমিটির সদস্যদের নেতৃত্বে তিনটি টিম গঠন করছে দলটি।
অবশ্য আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় ঐক্যফন্ট ও ২০ দলীয় জোট বিলুপ্ত ঘোষণা না করেই নতুন সরকারবিরোধী জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি। দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে 'গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের' দাবিতে 'জাতীয় ঐক্য' সৃষ্টির লক্ষ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরুর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল মঙ্গলবার গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে তিনি আরও বলেন, ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের রূপরেখা প্রণয়নে বিরোধী সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করবেন। তাদের সঙ্গে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি করবেন তাঁরা।

অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে বিএনপির মূল দাবিগুলো হচ্ছে- বর্তমান সরকারকে পদত্যাগ করে নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর ও তাদের অধীনে নির্বাচন, সংসদ বাতিল করে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের মাধ্যমে সব দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু নির্বাচন এবং খালেদা জিয়াসহ সব রাজবন্দির মুক্তির দাবি।

মির্জা ফখরুল বলেন, বিএনপির এসব দাবি নিয়ে অন্যান্য দলের সঙ্গে আলোচনা করবেন।

আলোচনার মধ্য দিয়ে তাঁদের অন্যান্য দাবি নিয়ে একক দাবিনামা তৈরি করা হবে। একক দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন শুরু করবেন।

সংলাপের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন, এই আলোচনার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার। এই ফ্যাসিবাদী সরকার মানুষের সব অধিকার কেড়ে নিয়েছে। মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছে এবং দেশের অর্থনীতি, সব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে ফেলেছে। সেসব প্রতিষ্ঠানকে গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে আনা, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা, ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠাই এই ঐক্যের মূল লক্ষ্য। এ জন্য আন্দোলনের বিকল্প নেই। এ আন্দোলন তৈরি করতে ঐক্য সৃষ্টির লক্ষ্যে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছেন তাঁরা।

এই ঐক্যজোটের নামকরণ কী হবে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা একে জোট বলছি না, অন্য কোনো কিছু বলছি না। আলোচনার মধ্য দিয়েই একটি কাঠামো দাঁড় করানো হবে।

আলোচনা কি ২০ দলীয় জোটের সঙ্গে হবে, না অন্যান্য দলের সঙ্গেও হবে- এ রকম প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সবার সঙ্গেই হবে। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, কথা তো বলতে হবে। তাদের সঙ্গে কথা না বললে কেমন করে হবে।

২০ দলীয় জোট থাকবে কিনা জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ২০ দলীয় জোট তো আমরা এখন পর্যন্ত বিলুপ্ত করিনি। এই জোটের কী হবে, সেটা এই আলোচনার মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত করা হবে।

রূপরেখার খসড়া প্রণয়ন :বিএনপির নীতিনির্ধারক সূত্র জানিয়েছে, নির্দলীয় সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচনের দাবি আদায়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করতে দলীয় নেতা, সমমনা দল ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক আলোচনা করেছে বিএনপি। আলোচনার মাধ্যমে একটি খসড়া রূপরেখা তৈরি করেছেন তাঁরা। তিন পৃষ্ঠার এই খসড়া রূপরেখা নিয়ে প্রথমে ইস্যুভিত্তিক নিজ নিজ অবস্থান থেকে আন্দোলনের প্রস্তাব করেছে বিএনপি। দলীয় ব্যাপারে আন্দোলনের কর্মসূচির একপর্যায়ে ঐক্যবদ্ধভাবে এক মঞ্চ থেকেও আন্দোলনের প্রস্তাব রয়েছে দলটির।

নাম প্রকাশ না করে বিএনপির একজন নেতা জানিয়েছেন, যেসব রাজনৈতিক দল গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনে বিএনপির সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে রাজপথে থাকবে, তাদের সবাইকে নিয়ে বিরোধী জোট আসন বণ্টনের মাধ্যমে নির্বাচন করবে। নির্বাচনে বিরোধী জোট বিজয়ী হলে, জোটের কোনো দলের শীর্ষ নেতা পরাজিত হলেও তাঁকে সরকারের অংশীদার হিসেবে রাখার আশ্বাস রয়েছে।

বিএনপির ওই নেতা আরও জানান, বিএনপির খসড়া রূপরেখার সঙ্গে অন্যান্য দলের গ্রহণযোগ্য মতামত যুক্ত করা হবে। সবার লক্ষ্য যখন এক হবে, তখন রূপরেখার শর্তাবলি পরিবর্তন ও পরিবর্ধন কোনো সমস্যা হবে না। বিএনপি দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দল ও নেতৃবৃন্দকে যথাযোগ্য সম্মান ও মূল্যায়ন অতীতেও দিয়েছে এবং ভবিষ্যতে দেবে।

যেসব দলের সঙ্গে সংলাপ :প্রথম দফায় আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন জেএসডি, মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বাধীন নাগরিক ঐক্য, রেজা কিবরিয়া ও নুরুল হক নুরের নেতৃত্বাধীন গণঅধিকার পরিষদ, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ভাসানী অনুসারী পরিষদ, জোনায়েদ সাকির নেতৃত্বাধীন গণসংহতি আন্দোলন, হাসনাত কাইয়ুমের নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন সঙ্গে সংলাপ হবে।

জামায়াতে ইসলামীসহ ২০ দলীয় জোটের বড় কয়েকটি শরিক দল, কমিউনিস্ট পার্টিসহ বাম দল, বিভিন্ন ইসলামী দলও রয়েছে। প্রাথমিকভাবে ১৪টি দলের সঙ্গে আলোচনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আগামী দু-এক দিনের মধ্যে জোনায়েদ সাকির নেতৃত্বাধীন গণসংহতি আন্দোলনের সঙ্গে সংলাপে বসবে বিএনপি।

এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সমকালকে বলেন, বর্তমান স্বৈরশাসক আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে বিদায় করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে যেসব রাজনৈতিক দল আন্দোলন করছে, তাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন তাঁরা। তাঁরা আশা করছেন, আগামী দু-তিন সপ্তাহের মধ্যে প্রাথমিকভাবে আলোচনা শেষ হবে। আলোচনার মাধ্যমে আন্দোলনের একটি চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি করতে পারবেন তাঁরা।

কী হবে ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের? :নির্দলীয় সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচনের দাবি আদায়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের লক্ষ্যে সরকারবিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক জোটের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করলেও বিদ্যমান জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোট বিলুপ্ত ঘোষণা করেনি বিএনপি। অবশ্য দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, বিভিন্ন দলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন তাঁরা।
অবশ্য সংলাপের প্রথম দিনই গতকাল বিগত নির্বাচনের আগে গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শরিক নাগরিক ঐক্যের সঙ্গেই বৈঠক করলেন বিএনপি নেতারা। অথচ ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরাম দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ায় বিএনপি কাকে সঙ্গে রাখবে- তা এখনও স্পষ্ট নয়। অবশ্য বিগত নির্বাচনী জোটে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্ব নিয়ে বিএনপির ভেতর এখনও কিছুটা অসন্তোষ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে নতুন রাজনৈতিক মিত্রের সন্ধানে সংলাপ শুরু করল দলটি।

২০ দলীয় জোটের শরিক এলডিপির একাংশের মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম গতকাল সমকালকে বলেন, এ আনুষ্ঠানিক সংলাপ বিএনপির দীর্ঘদিনের প্রস্তুতির ফল। বিভিন্ন মঞ্চ থেকে গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন হতে পারে। এতে ২০ দলের গুরুত্বপূর্ণ দলগুলোও থাকবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জামায়াত ইস্যুটি এখন অনেক দল মুখ্য হিসেবে দেখছে না।

নাগরিক ঐক্যের সঙ্গে সংলাপ :নাগরিক ঐক্যের সঙ্গে বৈঠক শেষে মির্জা ফখরুল বলেন, তাঁরা একটা বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করেছেন। এটিকে একটা যৌক্তিক পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁরা কাজ করছেন। আলোচনা অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে হয়েছে। আশা করছি, এর রেশ ধরে বাকি দলগুলোর সঙ্গেও আলোচনা ফলপ্রসূ হবে। এর মাধ্যমে একটা যৌথভাবে আন্দোলনের সূচনা করতে পারব এবং খুব শিগগির এই কাজ করতে পারব।
বৈঠক সূত্র জানায়, আলোচনার সব ইস্যুতে উভয় দলের নেতারাই একমত পোষণ করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, সব বিষয়ে যেহেতু সবাই একমত, তাহলে ঐক্য প্রক্রিয়ায় বাধা থাকে না। তাই যত দ্রুত সম্ভব ঐক্যকে বাস্তবিক রূপ দিতে হবে। নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে দু'দলের দুই মত থাকলেও আলোচনার ইস্যুতে এই এজেন্ডাকে উভয় পক্ষ এড়িয়ে গেছে। এ বিষয়কে প্রাধান্য না দিতে দুই দলের নেতারাই একমত হন।
সূত্র জানায়, আরও অন্তত এক দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এর আগে প্রধান দল বিএনপি অন্য দলগুলোর সঙ্গে প্রাথমিক বৈঠক সম্পন্ন করে তাদের মতামত নেবে। পরে ঐক্য ও আন্দোলনের চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরির আগে বৈঠক করার বিষয়ে একমত হন নেতারা।

বৈঠকে মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, সব ইস্যুর প্রধান ইস্যু হচ্ছে এই সরকারের পতন। সেটাকেই প্রধান গুরুত্ব দেওয়া দরকার। এরপর যেসব এজেন্ডা রয়েছে, সেগুলোর সমাধান চলে আসবে। তাই যত দ্রুত সম্ভব ঐক্য গড়ে তোলার বিষয়ে বিএনপি নেতাদের তাগাদা দেন তিনি।

কী আলোচনা হয়েছে- তা ব্যাখ্যা করে মির্জা ফখরুল বলেন, আলোচনার প্রধান বিষয় হচ্ছে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার। নির্বাচন-পরবর্তী জাতীয় সরকার গঠনও আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল।

খালেদা জিয়াসহ বিরোধী দলগুলোর নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা, গায়েবি মামলা ও যাঁদের আটক করে রাখা হয়েছে, তাঁদের মুক্তির বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

বৈঠকে বিএনপির প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাঁর সঙ্গে ছিলেন চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুস সালাম ও সাবেক সংসদ সদস্য জহির উদ্দিন স্বপন।

নাগরিক ঐক্যের নেতৃত্ব দেন দলটির সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না। উপস্থিত ছিলেন দলটির উপদেষ্টা এস এম আকরাম, সাধারণ সম্পাদক শহীদুল্লাহ কায়সার, প্রেসিডিয়াম সদস্য মোফাখখারুল ইসলাম নবাব, জিল্লুর চৌধুরী দিপু, ডা. জাহেদ উর রহমান, কেন্দ্রীয় নেতা আবু জাহেদ মোহাম্মদ সারওয়ার, আনিসুর রহমান খসরু, মাহবুব মুকুল প্রমুখ।