এ যেন শেয়ারবাজারের সূচক নয়, তৈলাক্ত বাঁশে বানরের ওঠানামার চিত্র। এক দিন বাড়ে তো পরের দুই দিন কমে। সরাসরি হস্তক্ষেপ, বিক্রিতে বাধা, ব্রোকারেজ হাউস, মার্চেন্ট ব্যাংকসহ বাজার মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেয়ার কিনতে চাপ দেওয়াসহ নানা তৎপরতায় দরপতন ঠেকাতে পারছে না নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। কিন্তু কোনো কিছুতেই ফল পাচ্ছে না। এ অবস্থায় পতনে লাগাম টানতে পুরোনো পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংস্থাটি। ফের সব শেয়ারের দরে নিচের সার্কিট ব্রেকার ফের ২ শতাংশ বেঁধে দিয়েছে বিএসইসি, যা আজ বৃহস্পতিবার থেকে কার্যকর হবে।

এ নিয়মের ফলে এখন থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নির্দিষ্ট দিনে কোনো শেয়ার সর্বোচ্চ ২ শতাংশ কম দরে কেনাবেচা করা যাবে না, অর্থাৎ এক দিনে কোনো শেয়ারের দর ২ শতাংশের বেশি কমার সুযোগ থাকবে না। দরপতন ২ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকলে সূচকের পতনও কম হবে বলে মনে করছে এ সংস্থা।

এর আগে একই রকম দরপতনের প্রেক্ষাপটে গত ৯ মার্চ শেয়ারদরের ওপরের সার্কিট ব্রেকার সীমা ১০ শতাংশ বহাল রেখে নিচের সার্কিট ব্রেকার সীমা ২ শতাংশ করে নির্ধারণ করে বিএসইসি। ওই পদক্ষেপের পরের দুই দিন বাজার ভালো থাকলেও আবার পুরোনো দরপতন জেঁকে বসেছিল। অনেক শেয়ার সার্কিট ব্রেকারের সর্বনিম্ন দরে কেনাবেচা হতে থাকে। লেনদেনও ব্যাপকহারে কমে যায়। এ নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এ অবস্থায় দরপতনের মধ্যেই গত ২০ এপ্রিল এ নিয়মে কিছুটা সংশোধন আনা হয়। সার্কিট ব্রেকারের নিচের সীমা ২ শতাংশের পরিবর্তে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়।

গতকাল বুধবার ডিএসইতে কেনাবেচা হয়েছে ৩৭৫ কোম্পানির শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ড। এর মধ্যে ২৫০ শেয়ারের দরপতন হয়। বিপরীতে বেড়েছে ৭৬টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ৪৯টির দর। মঙ্গলবারের তুলনায় লেনদেন প্রায় ১৪৮ কোটি টাকা কমে ৫১৩ কোটি টাকায় নেমেছে। এর মধ্যে ৩২ শেয়ার দিনের সার্কিট ব্রেকারের সর্বনিম্ন দরে কেনাবেচা হয়েছে।

শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অনারারি অধ্যাপক আবু আহমেদ সমকালকে বলেন, আগেই প্রমাণিত হয়েছে, এ ব্যবস্থা দিয়ে দরপতন রোধ হবে না। উল্টো দরপতন বাড়বে ও লেনদেন কমবে। টানা সাত মাস ধরে নিয়ন্ত্রক সংস্থার লাগাতার হস্তক্ষেপে বাজার দিনে দিনে খারাপ হচ্ছে। তা সত্ত্বেও তাদের বোধোদয় হয়নি। সংস্থাটির উচিত বাজারকে স্বাভাবিক গতিতে চলতে দেওয়া। বাজার যদি পড়ার হয়, তাদের টেনে তোলার কোনো ক্ষমতা নেই। গত সাত মাসে এটি প্রমাণ হয়ে গেছে। তারা বহু পদক্ষেপ নিয়েছে, তাতে হিতে বিপরীত হয়েছে। বহু বিনিয়োগকারী বাজার ছেড়েছেন।

জানা গেছে, দরপতন রোধ করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা অবণ্টিত লভ্যাংশের টাকায় গড়া শেয়ারবাজার স্থিতিশীলকরণ তহবিল থেকে নগদ অর্থ আইসিবিকে দিয়ে শেয়ার কিনিয়েছে। ১৭ মে পর্যন্ত ১৭৫ কোটি টাকা দিয়েছে। এর বাইরে দরপতন রোধে শেয়ার বিক্রি কমাতে ব্রোকারেজ হাউসগুলোকে চাপ দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বিক্রির অর্ডার তুলে নিতে বলেছে। ব্রোকার ডিলার ও মার্চেন্ট ব্যাংকে বিক্রি করা শেয়ার কিনতে চাপ দিয়েছে। এর বাইরে গ্রাহকদের কাছ থেকে লিখিত আদেশ ছাড়া বিক্রির আদেশ না বসাতেও কড়া নির্দেশ দিয়ে রেখেছে। আইনি ধারার মধ্যে থেকে 'বাজার মূল্যে' শেয়ার বিক্রির অর্ডার দেওয়ায় ৯ ব্রোকারেজ হাউসের ১৫ কর্মকর্তাকে তাৎক্ষণিক নির্দেশে সাসপেন্ড এবং পরের দিন প্রি-ওপেনিং সেশনে সার্কিট ব্রেকারের সর্বনিম্ন দরে বিক্রির আদেশ বসানোয় ১৫ ব্রোকারেজ হাউসকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়।

দরপতন বন্ধ না হওয়ায় গত রোববার থেকে প্রি-ওপেনিং সেশনের শেয়ার কেনাবেচার আদেশ প্রদানের ব্যবস্থা বন্ধ করেছে। আবার তারল্য প্রবাহ বাড়াতে মার্জিন ঋণের হার মূলধনের বিপরীতে ৮০ শতাংশের পরিবর্তে ১০০ শতাংশে উন্নীত করেছে। তাতেও কাজ হচ্ছে না।

এ অবস্থায় চলতি দরপতন রোধে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে একগুচ্ছ প্রণোদনা প্যাকেজ আসছে- কয়েকটি গণমাধ্যমে এমন খবর প্রকাশের পর সোমবার প্রধান শেয়ারবাজার ডিএসইর প্রধান মূল্য সূচক প্রায় ১১৯ পয়েন্ট বেড়েছিল। এর পর গতকাল বুধবারসহ সর্বশেষ দুই দিনে সূচক হারিয়েছে ৭৩ পয়েন্ট। এর আগে গত ১০ থেকে ২২ মে পর্যন্ত টানা আট কার্যদিবসে শেয়ারবাজার সূচক হারিয়েছিল ৫৫৫ পয়েন্টের বেশি। শেষ পর্যন্ত ২০১১ সালে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে গঠন করা ঋণ তহবিলের মেয়াদ আরও পাঁচ বছর বাড়ানোর পাশাপাশি অর্জিত সুদ যোগ করে এ তহবিলের আকার বৃদ্ধি ছাড়া আর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এ অবস্থায় আবারও শুরু হয়েছে দরপতন।