সরবরাহে ঘাটতি নেই। তার পরও চাল, আটা-ময়দাসহ বাজারে কিছু কিছু নিত্যপণ্যের দাম অযৌক্তিকভাবে বাড়ানো হয়েছে। এতে গুটিকয়েক ব্যবসায়ীর কারণে ভালো ব্যবসায়ীদের সুনাম নষ্ট হচ্ছে। এমন পরিস্থিতি কাম্য নয়। তাই বাজারে সরকারের চলমান অভিযান অব্যাহত রাখা উচিত। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর মতিঝিলে এক মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন।
নিত্যপণ্যের আমদানি, মজুত, সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত ওই সভায় চাল, ভোজ্যতেল, মসলা, আটা-ময়দাসহ বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ী নেতারা উপস্থিত ছিলেন। নিজ নিজ ব্যবসার বিষয়ে মতামত তুলে ধরেন তাঁরা।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই চাল ব্যবসায়ী ও মিল মালিকরা এফবিসিসিআই সভাপতির কাছে অভিযোগ করে বলেন, এ বছর ধান উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বেশি দামে ধান কিনলে চাল তো বাড়তি দামে বিক্রি করতে হবে। তার পরও চাল ব্যবসায়ীদের অযথা হয়রানি ও ধরপাকড় করা হচ্ছে।
এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁদের ওপর ক্ষোভ ঝেড়ে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, এখন ধানের ভরা মৌসুম। তবুও চালের দাম অস্বাভাবিক কেন? বলা হচ্ছে, হাওরে ধান উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। দেশের উৎপাদিত মোট চালের মাত্র ৬ শতাংশ হাওরে হয়। হাওরে বড়জোর ৩০ শতাংশ ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে দাম বাড়ার কথা নয়। মূলত কেউ কেউ মজুত করে দাম বাড়াচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের ধরপাকড় ঠিক আছে। এই অভিযান অব্যাহত রাখা দরকার।
এফবিসিসিআই খারাপ ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিত্ব করবে না হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, চালের মিল মালিকরা উন্নত প্রযুক্তি নিয়ে এসেছে, এখন খরচ কমার কথা। চাল উৎপাদনও হচ্ছে নিয়মিত। তার পরও কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা দাম বাড়বে কেন? কেউ কেউ মিনিটে ছয় হাজার টাকা খরচ করে টিভিতে বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন পোলাওয়ের চালের। দাম বাড়ার পেছনে তাঁদেরও দায় আছে। অনেকেই চালের ব্যবসা করে গুলশানে বাড়ি করছে। একেকজনের ৮ থেকে ১০টি করে বাড়ি আছে। অথচ বলছে, লোকসান হচ্ছে। এ ধরনের খারাপ ব্যবসায়ীদের দায় আমরা নেব না।
বড় কোম্পানিগুলো চালকে প্যাকেটজাত করে বেশি দামে বিক্রি করছে- এমন অভিযোগ অনেক খুচরা ব্যবসায়ীর। এ ব্যাপারে জসিম উদ্দিন বলেন, এখন ডিজিটাল যুগ। দেশে রপ্তানি আয় বাড়ছে। মাথাপিছু আয় বাড়ছে। প্যাকেটজাত চাল বিক্রিতে অসুবিধা থাকার কথা নয়। এসব চালের ক্ষেত্রে দর নির্ধারণ করে দেওয়া দরকার। মিলার থেকে চাল নিয়ে প্যাকেটজাত করে নিজেদের মতো দাম নির্ধারণ করে বিক্রি করা ঠিক নয়।
বর্তমান উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের মানবিক হওয়ার আহ্বান জানিয়ে জসিম উদ্দিন আরও বলেন, মানবিক হতে পারলে ব্যবসা ভালো হবে। ব্যবসা করতে হবে মগজ খাটিয়ে, অনৈতিক পথে নয়। সামনে কোরবানির ঈদ। এ সময় বাজার স্থিতিশীল রাখতে হবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পণ্য না কেনার আহ্বান জানান তিনি।
সভায় সিটি গ্রুপের উপদেষ্টা অমিতাভ চক্রবর্তী বলেন, চালের সরবরাহ যথেষ্ট রয়েছে, সমস্যা হবে না। কোরবানির ঈদ পর্যন্ত সংকট হবে না ভোজ্যতেলের।
পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি গোলাম মাওলা অভিযোগ করে বলেন, তেলের দাম বাড়ায় বড় কোম্পানিগুলো। তাদের অন্যায়ের কারণে শাস্তি পেতে হয় তৃণমূলের ব্যবসায়ীদের। বিনা কারণে অনেক ব্যবসায়ীকে জেলে নেওয়া হয়েছে। তাঁদের মুক্তি দিতে হবে।
মসলার কোনো সংকট হবে না উল্লেখ করে এ খাতের ব্যবসায়ীরা বলেন, রমজানে আমদানি করা মসলা এখনও বিক্রি হয়নি। কোরবানির ঈদে মসলা নিয়ে কোনো সংকট হবে না। তবে মসলা আমদানিতে অনেক বেশি শুল্ক্ক দিতে হয়। শুল্ক্ক কমানোর আহ্বান জানান তাঁরা।
রাইস ব্র্যান তেল দেশে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। এ কারণে এই তেল উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল কুঁড়ো রপ্তানি করে দেওয়া হয় বলে জানান এই খাতের উদ্যোক্তারা। এ প্রসঙ্গে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, কুঁড়ো রপ্তানি বন্ধ করতে
হবে। রাইস ব্র্যান তেল অনেক স্বাস্থ্যসম্মত। দেশে এই তেলকে ব্র্যান্ডিং করা দরকার। প্রয়োজনে টিসিবির মাধ্যমে রাইস ব্র্যান তেল বিক্রির পরামর্শ দেন তিনি।
পেঁয়াজ আমদানি ভারত থেকে কমার পরদিনই আগের আমদানি করা পেঁয়াজে ১০ থেকে ১৫ টাকা কেজিতে দাম বেড়ে গেল। এমন পরিস্থিতি কেন হয়? এ প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে পেঁয়াজ ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি হাজি মো. মাজেদ বলেন, আগামী দুই মাস পেঁয়াজের কোনো সংকট বা দাম বাড়বে না।
ভুট্টা ও গম ব্যবসায়ীরা জানান, দেশে ৭০ লাখ টন গমের চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন হয় ৫৫ লাখ টন। তিনি বলেন, হিলি স্থলবন্দরে দেশে প্রবেশের অপেক্ষায় দুই লাখ টন গম। যুদ্ধের কারণে গম আমদানি কম হচ্ছে।
লবণ ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, দেশে ২৩ লাখ ৫৬ হাজার টনের চাহিদা রয়েছে। উৎপাদন হয়েছে ১৮ লাখ টন। ফলে লবণ আমদানি করতে হবে।