বৈশ্বিক কারণে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, আগামী বাজেটে তা মোকাবিলায় অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার। পাশাপাশি অতিমারি করোনার প্রভাব পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা ও উন্নয়ন অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখারও উদ্যোগ থাকবে। এ জন্য সরকারি ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে। বাড়ছে ভর্তুকিও। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, আগামী অর্থবছরের বাজেটে সরকার অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বেশ গুরুত্ব দিচ্ছে। এ জন্য কৃষি ও শিল্প উৎপাদন যাতে বাড়ে, সে বিষয়ে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হবে। যাতে খাদ্য নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান সমানভাবে নিশ্চিত করা যায়। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর কর্মসূচিও বিস্তৃত হবে। এ ছাড়া উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগে জোর দেওয়া হচ্ছে। গুরুত্ব পাচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর কার্যক্রম। এসব কাজে বরাদ্দ বাড়াবে সরকার। এর পাশাপাশি চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চাহিদা পূরণে শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নসহ মানবসম্পদ উন্নয়ন বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে।

জানা গেছে, করোনার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বড়, কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, সেবা খাত ও গ্রামীণ অনানুষ্ঠানিক খাতকে পুরোপুরি পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখার ঘোষণা থাকবে বাজেটে। এ ছাড়া অতিদরিদ্রদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ও গৃহহীনদের জন্য বাসস্থানের আওতা বাড়ানো হবে। স্বল্প আয়ের মানুষের স্বল্পমূল্যে খাদ্য বিতরণ বাড়ানোর জন্যও বাড়তি বরাদ্দ থাকছে বাজেটে।

বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করার জন্য আগামী অর্থবছরে জিডিপির তুলনায় সরকারি ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে অর্থ বিভাগ। জিডিপির শতকরা হিসাবে বাংলাদেশে সরকারি ব্যয় বর্তমানে উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির তুলনায় কম। ২০২০-২১ অর্থবছরে জিডিপির তুলনায় বাংলাদেশে সরকারি ব্যয় ছিল ১৩ শতাংশ। ভারতে এ ব্যয় ২৮ দশমিক ৮ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ২২ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ভিয়েতনামে ২০ দশমিক ৪ শতাংশ। উন্নত অর্থনীতির দেশে সরকারি ব্যয় আরও বেশি। এ অবস্থায় আগামী অর্থবছরে বাংলাদেশের সরকারি ব্যয় জিডিপির ১৫ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা করেছে অর্থ বিভাগ। তবে সীমিত সম্পদ থেকে সরকারি ব্যয় বাড়ানো এবং একই সঙ্গে মূল্যস্ম্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করছে অর্থ বিভাগ। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এই ব্যয়ের পরিমাণ ধরা হয়েছে জিডিপির ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ।

বাজেটে সরকারের দুই ধরনের ব্যয় থাকে। একটি চলতি ব্যয়, অপরটি মূলধনি ব্যয়। চলতি ব্যয়ের মধ্যে রয়েছে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, পণ্য ও সেবা কেনা, ভর্তুকি ও স্থানান্তর ব্যয়, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধ ইত্যাদি। জানা গেছে, আগামী অর্থবছরে বাজেটের অংশ হিসেবে চলতি ব্যয় কমানো হবে। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে চলতি ব্যয় ধরা হয়েছে মোট বাজেটের ৫৭ দশমিক ৮ শতাংশ। আগামী অর্থবছরে এ খাতে মোট বাজেটের ৫৬ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। তবে ভর্তুকি বাবদ সরকারের বরাদ্দ বা ব্যয় বাড়ানো হবে আগামী অর্থবছরে।

অন্যদিকে মূলধনি ব্যয় হচ্ছে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন ও এডিপি-বহির্ভূত মূলধন ব্যয়। এ খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে। জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতে মোট বাজেটের ৪২ দশমিক ২ শতাংশ বরাদ্দ রয়েছে। আগামী অর্থবছরে এ বরাদ্দ বাড়িয়ে বাজেটের ৪৪ শতাংশ করা হচ্ছে। সম্প্রতি কয়েক বছরে এডিপি বাবদ বরাদ্দ বাড়িয়েছে সরকার। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে জিডিপির ৫ দশমিক ২৬ শতাংশ বরাদ্দ রয়েছে এডিপিতে। আগামী অর্থবছরে এ বরাদ্দ বাড়িয়ে ৫ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হচ্ছে।

চলতি অর্থবছরে বেতন-ভাতা বাবদ সরকার ৭১ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা ব্যয় করছে, যা মোট বাজেটের ১২ দশমিক ১ শতাংশ। আগামী অর্থবছরে মোট বাজেটের ১১ দশমিক ৩ শতাংশ এ খাতে ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। পণ্য ও পরিষেবা খাতে আগামী অর্থবছরে বাজেটের ৫ দশমিক ৭ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হচ্ছে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে কৃষি, রপ্তানিমুখী শিল্প ও ক্ষুদ্র শিল্পে প্রণোদনা দেওয়া হয়ে থাকে। আবার করোনার প্রভাব মোকাবিলা ও করোনার কারণে যাঁরা চাকরি হারিয়েছেন তাঁদেরও সরকার প্রণোদনা দিয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে এসব খাতে ১৮ হাজার ২৬০ কোটি টাকা প্রণোদনা দেওয়া হয়। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এসব খাতে প্রণোদনা বাবদ ২৬ হাজার ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা মোট বাজেটের ৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ। এর মধ্যে শুধু কৃষি খাতে প্রণোদনা ২০২০-২১ অর্থবছরের ৭ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০২১-২২ অর্থবছরের ১২ হাজার কোটি টাকা হয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে রপ্তানি খাতে নগদ প্রণোদনা ছিল ৫ হাজার ৮৪৬ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে প্রবাসী আয় খাতে প্রণোদনা বাবদ ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে বাজেটের ৫ শতাংশ এসব খাতে বরাদ্দ রাখা হবে।