বর্তমান পরিস্থিতিতে সামগ্রিকভাবে জনগণের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে উন্নয়ন ও কল্যাণমুখী প্রস্তাবিত বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই। তবে ব্যবসায়ীদের দেওয়া সুপারিশগুলো পুনর্বিবেচিত হলে বাজেট আরও বেশি ব্যবসা, বিনিয়োগ ও রাজস্ববান্ধব হত বলেও মত তাদের। তাই আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার ও মূসক কমানোসহ কিছু বিষয়ে পুনর্বিচনা করা জরুরি মনে করে সংগঠনটি।

শনিবার রাজধানীর মতিঝিলে ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ড্রাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন।

বাজেটে বিভিন্ন বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়ায় সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, বাজেট ব্যবসা, বিনিয়োগ, রাজস্ববান্ধব ও সমোয়পযোগী। তবে এর বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, সুশাসন, সঠিক তদারকি, বিনিয়োগ, উৎপাদন বৃদ্ধি ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় রাজস্ব আদায় করা। করোনা ও যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিশ্বে জ্বালানি, খাদ্যপণ্য, বিভিন্ন কাঁচামাল, পরিবহন ও জাহাজ ভাড়া বাড়ার কারণে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হবে। তাই অনুৎপাদশীল খাতে খরচ, অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ ও বিলাসী পণ্য আমদানি কমানো দরকার।

লিখিত বক্তব্যে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে তিন লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল রাজস্ব আদায়ে করব্যবস্থা সহজ ও ব্যবসাবান্ধব করতে হবে। রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে ইন্টিগ্রেটেড ও অটোমেশন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি। রাজস্ব আহরণ এবং রাজস্ব পলিসি কার্যক্রম পৃথক করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন বিভাগ গঠন করা দরকার। এছাড়া মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির মধ্যে সুসমন্বয় করতে হবে।

যারা নিয়মিত কর দিচ্ছেন, তাদের ওপর ছুরি চালানো হচ্ছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এনবিআরের কর্মকর্তারা কর আদায়ে অফিসে ঢুকে হয়রানি করবেন, সেটা হবে না। নিয়মিত করদাতাদের ওপর বাড়তি করের বোঝা না চাপিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রামের বাইরে করজালের আওতা বাড়াতে হবে। আয়কর আইনের একটা খসড়া দিয়েছিলেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু সে আইনের কিছুই বাজেটে প্রতিফলিত হয়নি। কাস্টমস অ্যাক্ট-১৯৬৯, মূসক আইন-২০১২ এবং আয়কর অধ্যাদেশ স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে অংশীদারিত্ব এবং পরামর্শক্রমে সংস্কার করা দরকার।

বাজেটে সরকারের ব্যাংক ঋণ নির্ভরতা বাড়ছে। এ বিষয়ে এফবিসিসিআইয়ের পরামর্শ হল বাজেটের বিশাল ঘাটতি মেটাতে স্থানীয় ব্যাংক ব্যবস্থার পরিবর্তে কম সুদে বৈদেশিক উৎস হতে অর্থায়নের চেষ্টা করা উচিত হবে।

রপ্তানিতে উৎসে কর আগের মত শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ বহাল রাখার অনুরোধ জানিয়ে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, অগ্রিম আয়কর এবং আমানি পর্যায়ে অগ্রিম কর ব্যবসার খরচ বাড়াচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়ীরা এসব কর বিলুপ্ত করার প্রস্তাব করে আসছেন। কিন্তু বাজেটে এর কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি।

একইসঙ্গে মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় আয়করের সীমা বাড়ানো জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

বাজেটে কোম্পানির ব্যাংক ডিপোজিটের সুদের আয়ের ওপর উৎসে কর ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করা হয়েছে। এ বিষয়ে এফবিসিসিআই বলেছে, এতে ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এতে টাকার পাচার বেড়ে যাবে। মানুষ তখন টাকা বালিশের নিচে, কাঁথার নিচে রাখবে। আমানত রাখার ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত হবে। তাই আগের মতই উৎসে কর হার ১০ শতাংশ রাখা উচিত।

আয়কর দিয়ে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রস্তাবের বিষয়ে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, সরকার হয়ত ডলার সংকট কাটাতে পাচার হওয়া অর্থ দেশে আনার সুযোগ দিচ্ছে। তবে এটা সমর্থনযোগ্য নয়। কারণ এতে সৎ ব্যবসায়ীরা নিরুৎসাহিত হবেন। পাচারকারীরাও এই সুযোগের অপেক্ষায় থাকবে।

করোনা এখনও চলে যায়নি উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, বিধিনিষেধও সরকার পুরোপুরি তুলে নেয়নি। তাই করোনার টেস্ট কিট, পিপিই, প্লাস্টিক ফেসশিল্ড, মাস্কজাতীয় পণ্য উৎপাদন ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহতি বহাল রাখা জরুরি।

স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের টার্নওভার করহার কমানোর উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে জসিম উদ্দিন বলেন, এসব উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে সব ধরনের প্রত্যক্ষ কর তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সম্পূর্ণ মওকুফ এবং পরোক্ষ কর ৫০ শতাংশ রেয়াতি হওয়া জরুরি।

এছাড়া পাইকারি ব্যবসার পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবসার সব ক্ষেত্রে ভ্যাট শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ করা, ল্যাপটপ আমদানিতে ১৫ শতাংশ মূসক প্রত্যাহার, সোলার প্যানেল আমদানিতে শুল্ক না বসানো ও ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পে উৎসে কর প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে এফবিসিসিআই।

সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা চেম্বার ও বিকেএমইএ-সহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।