বাজেট নিয়ে আলোচনায় 'সরকারের বৈধতা' প্রশ্নে তর্কে জড়িয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান এবং বিগত বিএনপি আমলের বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, বাজেটে ৬ চ্যালেঞ্জের কথা বলা হয়। তবে সবচয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অনির্বাচিত, কর্তৃত্ববাদী সরকার এবং তাদের দেওয়া বাজেটের বৈধতা।
জবাবে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, কর্তৃত্ববাদী নয়; জনগণের নির্বাচিত সরকার। সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন, তাঁর গোটা বক্তব্যই হতাশায় ভরা। হতাশা, ব্যর্থতা থেকে তাঁরা এসব বলছেন। বর্তমান সরকারই প্রকৃত নির্বাচিত সরকার। জনগণের ভোটে তাঁরা ক্ষমতায় এসেছেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে আয়োজিত এক সংলাপে তাঁরা এসব কথা বলেন। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালাগ-সিপিডি রাজধানীর হোটেল লেকশোরে এ সংলাপের আয়োজন করে। সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন সংলাপটি সঞ্চালনা করেন।

তর্কাতর্কির সূত্রপাত হয় আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, অনির্বাচিত, অপ্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের দেওয়া বাজেটে জনগণের চিন্তার প্রতিফলন থাকবে না- এটাই স্বাভাবিক। মূল্যস্ম্ফীতি, জিডিপি প্রবৃদ্ধির তথ্যসহ সরকারের দেওয়া বিভিন্ন তথ্যকে 'পরিসংখ্যান কারসাজি' হিসেবে মন্তব্য করে আমীর খসরু মাহমুদ বলেন, কারসাজির মাধ্যমে উন্নয়ন দেখানোর একটা প্রবণতা কর্তৃত্ববাদী সরকারের মধ্যে থাকে। বিবিএসের দেওয়া মূল্যস্ম্ফীতির তথ্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন আর বিবিএসের মধ্যে এখন আর কোনো পার্থক্য নেই। নাসির উদ্দিন হোজ্জার কাক গোনার গল্পের মতো এখন তথ্য সরবরাহ চলছে।
এ বক্তব্যের জবাবে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ভয়ংকর মন্তব্য করেছেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি অনেক দিন মন্ত্রী ছিলেন। একটি দলের দায়িত্বশীল পদেও আছেন। তিনি তো অন্ধ নন; তিনি দেখছেন। দেখার পরও পরিসংখ্যান কারসাজির কথা বলেছেন। তিনি কি পদ্মা সেতুু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল দেখেন না? কারসাজি করে পদ্মা সেতু করা যায় না। ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ দেওয়া যায় না। গড় আয়ু বাড়ানো যায় না। আমীর খসরু মাহমুদের এসব বক্তব্য হতাশার প্রতিফলন। তিনি বলেছেন- আমরা অনির্বাচিত সরকার। এগুলো চর্বিত চর্বণ। বর্তমান সংসদ কার্যকর; সরকার কার্যকর। মন্ত্রী বলেন, আপনারা যতদিন এগুলো বলতে থাকবেন, ততদিন এ দেশে সুস্থ রাজনীতি আসবে না। এসব কথা বলে মূল কাজ থেকে আমরা সরে আসছি। আমাদের আরও দায়িত্বশীল এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের প্রয়োজন রয়েছে।

আমীর খসরু মাহমুদের উদ্দেশে মন্ত্রী আরও বলেন, রোড টু ডেমোক্রেসি, রোড টু পাওয়ার ইজ ওপেন। কুমিল্লার নির্বাচনে দেখেছেন। অন্যান্য নির্বাচনেও দেখেছেন। প্লিজ, আমার আবেদন- পথে আসুন। নির্বাচনে আসুন; ক্ষমতা নিন। সুন্দর করে দেশ পরিচালনা করুন।

পদ্মা সেতু প্রসঙ্গে আমীর খসরু মাহমুদের বক্তব্যের জবাবে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ১৮ কোটি মানুষ পদ্মা সেতু নিয়ে উচ্ছ্বসিত। দেশজুড়ে পার্টি চলছে। তাঁরা তাঁদের হতাশা, ব্যর্থতার ক্ষোভে পুড়ছেন। এ ধরনের দল সরকারকে ব্যর্থ করে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে শেখ হাসিনার সরকার উন্নয়নের লক্ষ্য থেকে ফিরবে না।
এর আগে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ১০ হাজার কোটি টাকার পদ্মা সেতু ৩০ হাজার কোটি টাকায় হলো- এটা নিয়ে কথা বললেই তো ষড়যন্ত্র হবে। জনগণের জানার অধিকার আছে। তারা পদ্মা সেতুর ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন করছে; আপনারা জবাব দিন। ষড়যন্ত্র কেন বলছেন? আপনারা জবাব দিলেই তো সমাধান হয়ে গেল।

প্রস্তাবিত বাজেটে পাচার করা অর্থ ফেরত আনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যেসব দেশে টাকা পাচার করা হয়েছে সেসব দেশ থেকে অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সেখানে ঠেকে যাওয়ার কারণে এখন বৈধ করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। যারা পাচার এবং পাচারে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে তারাই এখন বৈধ করার জন্য আইন করছে। দেশে এখন সাড়ে ৭ শতাংশ হারে কর দেওয়া হলে ওইসব দেশে আর প্রশ্ন উঠবে না। ক্ষমতায় থাকার জন্য যাদের খুশি করা দরকার তাদের জন্য বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। সাধারণ জনগণ এ বাজেট থেকে উপকৃত হবে না।

অনুষ্ঠানে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সাংসদ আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, এবারে বাজেটের বড় দুর্বলতা হচ্ছে মূল্যস্ম্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কোনো পদক্ষেপ না থাকা। বিবিএসের তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে তিনিও প্রশ্ন তোলেন। সংসদ সদস্য কাজী নাবিল আহমেদ প্রস্তাবিত বাজেটের প্রশংসা করে বলেন, বাজেটের বেশ কিছু পদক্ষেপের ফলে মূল্যস্ম্ফীতি ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আসবে। শ্রমিকদের আবাসন বিষয়ে সংসদে আলোচনা করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
উন্মুক্ত আলোচনায় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ১৮ কোটি মানুষের দেশ ঢাকা থেকে শাসন করা সম্ভব নয়। ১৫ থেকে ১৭টি প্রদেশে ভাগ করা যায়। তা না করে আমলারা জেঁকে বসেছেন। করবহির্ভূত আয়সীমা তিন লাখ টাকা করা; সোজা-সরল কথা- এটা বেকুবের কাজ। এর অর্থ রিকশাওয়ালাকে করের আওতায় আনতে চায়। এটা কমপক্ষে ৫ লাখ টাকা হওয়া উচিত।

অনুষ্ঠানে সিপিডির পক্ষে বাজেটের ওপর একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থার গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। সংলাপে প্যানেল আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন ঢাকা চেম্বারের সভাপতি রিজওয়ান রাহমান, এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সহসভাপতি সুস্মিতা আনিস, সোশ্যালিস্ট লেবার ফ্রন্টের সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতন প্রমুখ।