ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহার গত এক বছরে কয়েক গুণ বেড়েছে। সরকারের চাহিদা বৃদ্ধির ফলে ব্যাংক ব্যবস্থায় বাড়ছে ঋণের পরিমাণও। চলতি অর্থবছরের ১৪ জুন পর্যন্ত ব্যাংক থেকে সরকার নিট ৪১ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে। গত মে পর্যন্ত যা ৩২ হাজার ৬৫২ কোটি টাকা ছিল। এর মানে শেষ সময়ে এসে ঋণ দ্রুত হারে বাড়ছে। বিল ও বন্ডে সুদহার বৃদ্ধি, মূল্যস্ম্ফীতি বেড়ে যাওয়াসহ বিভিন্ন বিবেচনায় সার্বিক সুদহারের বিদ্যমান সীমা এখনও ৯ শতাংশে অপরিবর্তিত আছে। তবে নতুন মুদ্রানীতিতে ব্যাংক ঋণের সুদহারের সীমায় পরিবর্তন আসবে বলে জানা গেছে। আগামী ৩০ জুন এ মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত রোববার ১৮২ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলে সুদহার ছিল ৬ দশমিক ৫৯ শতাংশ। একই দিন ৯১ দিন মেয়াদি বিলে সরকার সুদ দিয়েছে ৬ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। এর আগে গত ১৫ জুন পাঁচ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদহার দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৮০ শতাংশ। অথচ গতবছরের জুনে ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদহার ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ৫২ শতাংশ। আর ১৮২ দিন মেয়াদি বিলে ছিল শূন্য দশমিক ৬৮ শতাংশ। এ ছাড়া পাঁচ বছর মেয়াদি বিলের সুদহার ছিল ৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ। অন্যসব মেয়াদের ট্রেজারি বন্ডের সুদহারও এভাবে বেড়েছে। অথচ ব্যাংক ঋণের সুদহারের সর্বোচ্চ সীমা ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ৯ শতাংশে অপরিবর্তিত আছে।
ব্যাংকাররা জানান, ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামাতে ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ক্রেডিট কার্ড ছাড়া সব ধরনের ঋণের সুদহার ৯ শতাংশ নির্ধারণ করে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পরবর্তী সময়ে গত বছরের ৮ আগস্ট এক নির্দেশনার মাধ্যমে মেয়াদি আমানতে মূল্যস্ম্ফীতির চেয়ে কম সুদ না দিতে বলা হয়। তিন মাস বা তার বেশি মেয়াদের জন্য ঘোষিত আমানতের ক্ষেত্রে এ নির্দেশনা কার্যকর। এর মধ্যে গত মে মাসে মূল্যস্ম্ফীতি ৭ দশমিক ৪২ শতাংশে উঠেছে। ফলে ব্যক্তি আমানতে এর চেয়ে বেশি সুদ দিতে হবে। এর সঙ্গে ব্যাংকের পরিচালন ব্যয়সহ বিভিন্ন খরচ রয়েছে। ফলে ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দিতে হলে বড় ধরনের লোকসানে পড়বে ব্যাংক। সুদহারের সীমায় পরিবর্তন না আনলে ঋণ বিতরণ কমবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানান, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক উভয় সংকটে পড়েছে। সুদহারের সীমা একবারে তুলে দিলে ঋণের সুদ অনেক বেড়ে পণ্যমূল্য আরও বাড়বে। আবার বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায়ও পিছিয়ে পড়বে। তবে সুদহারের সীমা এক অঙ্কে অপরিবর্তিত রাখলে ঋণ বিতরণে অনীহা দেখা দেবে। এই দুই বিবেচনা মাথায় রেখে আগামী মুদ্রানীতি ঘোষণার দিন এ বিষয়ে একটা সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
ব্যাংক খাতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের ঋণ চাহিদাও বেড়েছে। গত এপ্রিল পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ৪৮ শতাংশ। এর মধ্যে আবার বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা মেটাতে চলতি অর্থবছরের এ পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে প্রায় ৭২২ কোটি ডলার বিক্রি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর বিপরীতে বাজার থেকে তুলে নেওয়া হয় ৬৫ হাজার কোটি টাকার মতো। এতে করে ব্যাংকগুলোতে কিছুটা টাকার টানাটানি তৈরি হয়েছে। গত এপ্রিল শেষে ব্যাংকগুলোর হাতে উদ্বৃত্ত টাকা কমে এক লাখ ৮৬ হাজার ৫৯৬ কোটি টাকায় নেমেছে। গত বছরের জুনে যা ২ লাখ ৩১ হাজার ৭১১ কোটি টাকা ছিল।
আগামী অর্থবছর ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে এক লাখ ৬ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। গত অর্থবছরের মূল বাজেটে ৭৬ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ৮৭ হাজার ২৮৭ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সরকার ঋণ নেওয়া অনেক বাড়িয়েছে। সব মিলিয়ে গত ১৪ জুন ব্যাংক ব্যবস্থায় সরকারের মোট ঋণ ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকায় ঠেকেছে।