ঋণ পরিশোধে আবারও বিশেষ সুবিধা দিল বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে এবার আর আগের মতো ঢালাও সুবিধা দেওয়া হয়নি। কেবল ১ এপ্রিল নিয়মিত থাকা ঋণে বিশেষ সুবিধা মিলবে। এক্ষেত্রে জুন, সেপ্টেম্বর ও ডিসেম্বর প্রান্তিকে বড় ঋণের ক্ষেত্রে যে পরিমাণ পরিশোধ করার কথা যথাক্রমে তার ৫০, ৬০ ও ৭৫ শতাংশ পরিশোধ করলে আর খেলাপি হবে না। কৃষি ও সিএমএসএমই ঋণে যে পরিমাণ পরিশোধ করার কথা তার ২৫, ৩০ ও ৪০ শতাংশ পরিশোধ করে খেলাপিমুক্ত থাকা যাবে। আর বন্যাকবলিত জেলায় কৃষি ঋণ পরিশোধে এর চেয়েও বেশি শিথিলতা দেওয়া হয়েছে। 

বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা সব ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়।

করোনাভাইরাসের প্রভাব শুরুর পর ২০২০ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঢালাও সুবিধার কারণে কেউ এক টাকাও পরিশোধ না করলেও খেলাপি হয়নি। ২০২১ সালে যে পরিমাণ পরিশোধ করার কথা ১৫ শতাংশ দিলে আর খেলাপি করা হয়নি। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই ঋণ পরিশোধ না করেও খেলাপিমুক্ত থাকার দাবি জানিয়ে আসছে। তবে ঋণ শৃংখলা রক্ষায় ব্যাংকগুলো বরাবরই ঢালাও সুবিধা না দেওয়ার অনুরোধ করে আসছে। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে কোনো ছাড় ছিল না। এতে যেন লাফ দিয়ে বেড়েছে খেলাপি ঋণ। গত মার্চ পর্যন্ত প্রথম তিন মাসে খেলাপি ঋণ ১০ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা বেড়ে এক লাখ ১৩ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা হয়েছে। ওই পর্যন্ত বিতরণ করা ১৩ লাখ ২৯ হাজার ৭৩৬ কোটি টাকা ঋণের যা ৮ দশমিক ৫৩ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারে বিশেষ সুবিধার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলা হয়েছে, করোনার দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব, পুনরায় সংক্রমণ বৃদ্ধি, দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সৃষ্ট বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এবং যুদ্ধাবস্থার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালসহ বিভিন্ন উপকরণের মূল্য ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। এতে ঋণগ্রহীতারা কিস্তির সম্পূর্ণ অংশ পরিশোধে অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছেন। এরকম প্রেক্ষাপটে চলমান অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা বজায় রাখা এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের গতিধারা স্বাভাবিক রাখতে ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, জাতীয় শিল্প নীতির সংজ্ঞা অনুযায়ী, ‘বৃহৎ শিল্প’ প্রতিষ্ঠানের যেসব মেয়াদি ঋণ গত ১ এপ্রিল অশ্রেণিকৃত রয়েছে তার বিপরীতে জুন প্রান্তিকে প্রদেয় কিস্তির ন্যূনতম ৫০ শতাংশ, সেপ্টেম্বরে ৬০ শতাংশ এবং ডিসেম্বর প্রান্তিকে ৭৫ শতাংশ পরিশোধ করলে আর বিরূপমানে শ্রেণিকরণ করা যাবে না। সিএমএসএমই ও কৃষি খাতের যে সব মেয়াদি ঋণ ১ এপ্রিল অশ্রেণিকৃত রযেছে তার বিপরীতে জুন প্রান্তিকে প্রদেয় কিস্তির ন্যূনতম ২৫ শতাংশ, সেপ্টেম্বরে ৩০ শতাংশ এবং ডিসেম্বরে ৪০ শতাংশ পরিশোধ করতে হবে। প্রতি প্রান্তিকের শেষ দিনের মধ্যে এ হারে অর্থ জমা দিতে হবে। গত ১ এপ্রিল অশ্রেণিকৃত তলবী প্রকৃতির ঋণ জুন থেকে ডিসেম্বর সময়ে তিনটি সমান কিস্তিতে পরিশোধ করলে আর খেলাপি হবে না।

বন্যাকবলিত জেলা সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, শেরপুর, জামালপুর, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক চিহ্নিত বন্যা কবলিত জেলায় কৃষি ঋণের ক্ষেত্রে এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত কিস্তি পরিশোধ না করলেও খেলাপি করা যাবে না। এসব এলাকার সিএমএসএমই খাতের যেসব মেয়াদি ঋণ ১ এপ্রিল অশ্রেণিকৃত আছে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে প্রদেয় কিস্তির ২৫ শতাংশ পরিশোধ করলেও খেলাপি করা যাবে না। আর সিএমএসএমই খাতের যেসব চলমান ঋণের মেয়াদ ইতোমধ্যে অতিবাহিত হয়েছে ও প্রচলিত নীতিমালার আওতায় নবায়ন করা হয়নি এবং ১ এপ্রিল অশ্রেণিকৃত অবস্থায় রয়েছে তার সীমাতিরিক্ত অংশ ডিসেম্বরের মধ্যে পরিশোধ করার শর্তে নবায়ন করতে হবে। এই ঋণের বাকি অংশ বিদ্যমান মেয়াদ শেষ হওয়ার পরবর্তী এক বছরের মধ্যে কিস্তিতে আদায় করা যাবে। এই নির্দেশনা মোতাবেক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে যথানিয়মে শ্রেণীকরণের আওতাভুক্ত হবে।

এতে আরও বলা হয়েছে, এই সার্কুলারের মাধ্যমে সুবিধা পাওয়া ঋণে এপ্রিল থেকে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত কিস্তি পরিশোধে কোনো দণ্ড সুদ বা অতিরিক্ত ফি আরোপ করা যাবে না। আর ২০১৯ সালে ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্টে ১০ বছরের জন্য পুনঃতফসিল করা ঋণও এ সার্কুলারের আওতায় সুবিধা নিতে পারবে। তবে এ সার্কুলারের আওতায় সুবিধা পাওয়া ঋণে আরোপিত সুদ আয়খাতে স্থানান্তর এবং প্রভিশন সংরক্ষণ বিষয়ে পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে।