বিভিন্ন অনিয়ম ও আমানতকারীদের জন্য ক্ষতিকর কাজে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ায় উত্তরা ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এসএম শামসুল আরেফিনকে অপসারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির এমডি ও কয়েকজন পরিচালক অনিয়মের মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে মোট ৩ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা নিয়ে ব্যক্তিগত কাজে লাগিয়েছেন বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে উঠে আসে। ২০১৯ সালের আর্থিক বিবরণীর তথ্যের ভিত্তিতে বহিঃনিরীক্ষক দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে গতকাল এ ব্যবস্থা নেওয়া হলো।

বাংলাদেশ ব্যাংক উত্তরা ফাইন্যান্সের ২০১৯ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীর ওপর পরিদর্শন করে ২০২০ সালে। দীর্ঘ চার মাস পরিদর্শনে পাওয়া অনিয়মের ভিত্তিতে ২০২১ সালে বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরিদর্শনে উঠে আসে, কলমানি থেকে বিভিন্ন সময়ে নেওয়া ঋণের ৩৮২ কোটি টাকা প্রতিষ্ঠানের হিসাবে না দেখিয়ে পরিচালক মুজিবুর রহমান নিজের কাজে ব্যবহার করেন। তার মালিকানাধীন ব্লু চিপস সিকিউরিটিজের নামে ২৩৬ কোটি টাকার ভুয়া টিডিআর ইস্যু করা হয়। পরিচালকদের স্বার্থ সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠান অগ্রিম ও প্রিপেমেন্ট খাতের নামে ৮৮৯ কোটি ৫১ লাখ টাকা নেয়। অ্যাডভান্স অ্যান্ড পেমেন্ট নামে চেয়ারম্যান রাশেদুল হাসানসহ কয়েকজনকে প্রাপ্যতাবহির্ভূতভাবে ৭৯৯ কোটি টাকা দেওয়া হয়। ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসব অনিয়মে সহযোগিতা করেন। শুধু পরিচালকদের অনিয়মে সুযোগ করে দেন তেমন নয়, হিসাববহির্ভূত বিভিন্ন উপায়ে শামসুল আরেফিন নিজে ২৪ কোটি ২২ লাখ টাকা তুলে নিয়ে গাড়ি, বাড়ি কেনা ও বিদেশ ভ্রমণে ব্যয় করেন।

জানতে চাইলে উত্তরা ফাইন্যান্সের অপসারিত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএম শামসুল আরেফিন সমকালকে বলেন, এ প্রতিষ্ঠানের আমানতের প্রায় ৮৫ শতাংশ মালিক পক্ষের। বাকি অর্থ বিভিন্ন ব্যাংক ও ব্যক্তির। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে যে অনিয়ম উদ্ঘাটিত হয়েছিল এরই মধ্যে তার ৬৫ শতাংশ আদায় হয়েছে। বাকি অর্থও আদায় হবে। তাঁর বিরুদ্ধে নেওয়া সিদ্ধান্ত প্রত্যহারের জন্য এখন তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আবেদন করবেন। সেখানে প্রতিকার না পেলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন।
পরিচালনা পর্ষদকে বাংলাদেশ ব্যাংকের চিঠিতে বলা হয়েছে, উত্তরা ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টে সিএ ফার্ম রহমান রহমান হকের বিশেষ নিরীক্ষায় ব্যাপক আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ও আমানতকারীদের জন্য ক্ষতিকর কার্যকলাপে যুক্ত থাকায় এমডি পদ থেকে এসএম শামসুল আরেফিনকে অপসারণ করা হলো। প্রতিষ্ঠানটির কাজ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য নতুন এমডি নিয়োগের ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়, উত্তরা ফিন্যান্সের বার্ষিক হিসাব বিবরণীতে ১ হাজার ৮০৩ কোটি টাকা ঋণের তথ্য হলেও লেজার ব্যালেন্স পর্যালোচনায় ৩ হাজার ৮০২ কোটি টাকার ঋণের তথ্য পাওয়া যায়। একইভাবে আর্থিক বিবরণীতে ১ হাজার ৮৭৭ কোটি টাকার মেয়াদি আমানত দেখানো হলেও প্রকৃতপক্ষে ছিল ২ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা। এভাবে আমানতকারীদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ প্রতিষ্ঠানের হিসাবে না দেখিয়ে এবং ঋণের তথ্য গোপন করে ব্যক্তিগত কাজে খাটানো হয়। আবার মার্জিন ঋণ ও মার্চেন্ট ব্যাংকিং ইউনিটের নামে ৫৯৭ কোটি টাকা এবং সাবসিডিয়ারি কোম্পানি উত্তরা ফিন্যান্স অ্যান্ড ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের নামে ২৪৮ কোটি টাকা ভুয়া ঋণ নেওয়া হয়। কোনো আবেদন, প্রস্তাব বা অনুমোদন ছাড়া একজন পরিচালককে দেওয়া হয় ৫২১ কোটি টাকা।


বিষয় : উত্তরা ফাইন্যান্সের এমডিকে অপসারণ উত্তরা ফাইন্যান্স

মন্তব্য করুন