স্থল ও সমুদ্রে গ্যাসের ব্যাপক সম্ভাবনা থাকার পরও অনুসন্ধান ও উত্তোলনে উদ্যোগ নেই। এর ফলে বিদেশ থেকে বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে। বিদ্যুতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বরাদ্দ বছর বছর দেওয়া হলেও জ্বালানি খাতে বাজেট বরাদ্দ অপ্রতুল। বিশেষ আইনের সুবিধা নিয়ে টেন্ডার প্রক্রিয়া ছাড়া হাজার হাজার কোটি টাকার কাজ দেওয়া হচ্ছে এই খাতে। দায়মুক্তির সুবিধা থাকায় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতি-চুরি জেঁকে বসেছে। তাই দক্ষতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে আগামীতে জ্বালানি খাত ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়বে। আর সাশ্রয়ী মূল্যে প্রাথমিক জ্বালানি তথা গ্যাস পাওয়া না গেলে বিদ্যুতের মূল্য কমবে না।

রোববার রাজধানীর একটি হোটেলে জাতীয় বাজেটে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের প্রতিফলন নিয়ে আলোচনা সভায় এই অভিমত ব্যক্ত করেন বিশেষজ্ঞরা। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনের সঞ্চালনায় সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থাটির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
অনুষ্ঠানে বুয়েটের অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, গত ১০ বছরে বিদ্যুতের অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে। এদিকে ২০০৭ সাল থেকেই গ্যাসের সংকট বা প্রাথমিক জ্বালানির ঘাটতি দেখা দিয়েছে। জ্বালানির উৎপাদন অনুসন্ধানে কোনো নজর দেওয়া হয়নি। প্রতি বছর বিদ্যুৎ খাতে ২৫-২৬ হাজার কোটি টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, সেখানে জ্বালানিতে ২ থেকে ২ দশমিক ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ পাচ্ছে না। পেট্রোবাংলা বলছে, দেশে গ্যাস নেই এটা অসত্য। কারণ দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমলেও গত ১০ বছর ধরে বিবিয়ানায় শেভরন কিন্তু তার উৎপাদন ধরে রেখেছে। এ খাতে মূলত সঠিক নেতৃত্বের অভাব রয়েছে। বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করতে গেলে মূলত প্রাথমিক জ্বালানি গ্যাসের সমস্যার সমাধান করতে হবে।

কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেশি বলে দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়ানোর যুক্তি দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এই সেক্টরে বিশেষ আইনের নামে দায়মুক্তির যে সংস্কৃতি চালু করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে অযৌক্তিক ব্যয় যে বেড়ে গেছে তা নিয়ে কেউ কথা বলছে না। জ্বালানি-বিদ্যুৎ খাতের চুরি আর দুর্নীতি ঠেকাতে পারলে ভর্তুকিরও প্রয়োজন হবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বদরুল ইমাম বলেন, দেশে নতুন করে জ্বালানির উৎস খুঁজতে আমাদের সাফল্য নেই। আমাদের দেশীয় গ্যাস ধীরে ধীরে কমে আসছে। ২০১৬ সালের পর গ্যাসের উৎপাদন আর বাড়েনি। ২০১৭ সালের পর থেকে এটা কমছে। এটা কমতেই থাকবে। আমরা যদি নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিস্কার করতে না পারি, ২০৪০ সালে গ্যাস ব্যবহার একেবারে নগণ্য হয়ে যাবে। এর প্রভাব পড়বে বিদ্যুতে। কিন্তু এটা হওয়ার কথা না। তিনি বলেন, দেশে যে গ্যাস সম্পদ আছে, সেটা যথেষ্ট অনুসন্ধান না করে, গ্যাস না তুলে, অন্যদিকে সমাধান খোঁজা (গ্যাস আমদানি) হচ্ছে। এতে সমস্যা আরও বাড়ছে। দেশে গ্যাসক্ষেত্রের অনুসন্ধান করতে পারলে বাংলাদেশে জ্বালানি সংকট থাকবে না।
পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, কৃষি-সেচ ও অন্যান্য কিছু খাতে বিদ্যুতে আমরা ভর্তুকি দিচ্ছি। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড লোকসান করে। সেখানেই ভর্তুকি দেওয়া লাগে। বাকিদের দেওয়া লাগে না।
মূল প্রবন্ধে গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ফসিল ফুয়েল থেকে ক্লিন এনার্জির দিকে ধীরে ধীরে যাওয়া উচিত। এটি একবারে করা যাবে না, ধাপে ধাপে করার জিনিস। বেসরকারি খাত এখানে এগিয়ে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।