আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার বা ৪৫০ কোটি ডলারের ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। সংকটে পড়া বৈদেশিক লেনদেন পরিস্থিতির উন্নতি, বৈদেশিক মুদ্রার মজুত চাঙ্গা করা এবং মুদ্রা বাজারের স্থিতিশীলতা আনতে সরকার এ উদ্যোগ নিয়েছে। এ জন্য আজ বুধবার সংস্থাটির বাংলাদেশে আবাসিক প্রতিনিধি জয়েন্দু দের সঙ্গে অনলাইনে বৈঠক করবেন অর্থ সচিব আব্দুর রউফ তালুকদার, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব ফাতিমা ইয়াসমিন ও পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য শরিফা খান।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার আইএমএফ থেকে কমপক্ষে তিন বছর মেয়াদে একটি বড় ঋণ অনুমোদন করিয়ে রাখতে চাচ্ছে। যাতে সরকারের যখন প্রয়োজন হবে তখন অর্থপ্রাপ্তি নিশ্চিত হয় এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুতে চাপ কমে আসে। আইএমএফের একাধিক ঋণ কর্মসূচি থেকে এই ঋণ নেওয়া হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত পরিস্থিতি কমে এসেছে। টাকার মান নেমেছে তলানিতে। আমদানি ব্যয় বাড়ছে। কমছে রেমিট্যান্স। রপ্তানি আয় বাড়লেও লেনদেনের ভারসাম্য নেতিবাচক। আবার দু-এক বছরের মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পদ্মা রেল লিঙ্ক সেতু, মেট্রোরেল, মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন প্রকল্পের ঋণের অর্থ ফেরত দেওয়ার সময় আসছে। এ রকম অবস্থায় সরকার বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নিয়ে নিরাপদ রিজার্ভ নিশ্চিত করতে চাচ্ছে।

ওই কর্মকর্তা জানান, আইএমএফ থেকে ঋণ নেওয়ার বিষয়টি একেবারেই প্রাথমিক অবস্থায় রয়েছে। আজই প্রথম আনুষ্ঠানিক আলোচনা হবে। আইএমএফ এ বিষয়ে কতটা আগ্রহী বা কী শর্তে এ ঋণ দিতে চায়, তা জানতে চাওয়া হবে বৈঠকে। এরপর আইএমএফের মতামত অর্থমন্ত্রীকে জানানো হবে। অর্থমন্ত্রী বিষয়টি সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলে জানানোর দরকার মনে করলে জানাবেন। তারপর দু'পক্ষের কমিটি করে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব ও আলোচনা করা হবে। উভয়পক্ষ সবকিছুতে একমত হতে পারলে আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে এ বিষয়ে চুক্তি হবে। এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের  (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর সমকালকে বলেন, সরকার যদি আর্থিক খাতের মৌলিক সংস্কার করার মানসিকতায় থাকে তাহলে আইএমএফের সঙ্গে এ ধরনের কর্মসূচিতে যাওয়ার জন্য খুবই উপযুক্ত সময় এখন। কারণ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত কমে আসছে। আবার আগামীতে নতুন খাতে বৈদেশিক মুদ্রা পরিশোধের সময় আসছে। ফলে রিজার্ভ বৃদ্ধি পায় এমন উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু সরকারের যদি সংস্কারের আন্তরিক ইচ্ছা না থাকে তাহলে এসব আলোচনা করে লাভ হবে না। তিনি বলেন, আইএমএফের ঋণের সংস্কারের শর্ত থাকবে। রাজস্ব, ব্যাংক খাতসহ সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকা কে আরও স্বচ্ছ করার মতো শর্তও থাকে এতে।

বাংলাদেশ আইএমএফের সদস্য রাষ্ট্র। জানা গেছে, সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ যে চাঁদা পরিশোধ করে তাতে আইএমএফে বাংলাদেশের ঋণের কোটা এক বিলিয়ন ডলার। এর শতভাগ বা সর্বোচ্চ ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত বছরে ঋণ নিতে পারে বাংলাদেশ। এর আগেও বাংলাদেশ বিভিন্ন সংকটের সময়ে আইএমএফ থেকে ঋণ নিয়েছে। ১৯৯০ সালে আইএমএফ থেকে প্রথম ঋণ নেয় বাংলাদেশ। তখন সামান্য পরিমাণে ঋণ নেওয়া হয়েছিল। এরপর ২০০৩ সালে দারিদ্র্য বিমোচন ও প্রবৃদ্ধি সুবিধার (পভার্টি রিডাকশন অ্যান্ড গ্রোথ ফ্যাসিলিটি) আওতায় বাংলাদেশ ৩০ কোটি ডলার ঋণ নেয়। এরপর ২০১১ সালে টাকার মান দ্রুত অবনতি হলে সরকার এক্সটেন্ডেড ক্রেডিট ফ্যাসিলিটির আওতায় ১০০ কোটি ডলার ঋণ নিয়ে লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষায় ব্যবহার করে। সর্বশেষ করোনার সময়ে র‌্যাপিড ক্রেডিট ফাইন্যান্সিংয়ের আওতায় ৭৩ কোটি ডলার ঋণ নেয় সরকার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে ২০২১ সালের জুন শেষে বাংলাদেশের কাছে আইএমএফের ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৮৮ কোটি ৯৮ লাখ এসডিআর। এসডিআর (স্পেশাল ড্রইং রাইটস) আইএমএফের নিজস্ব মুদ্রা পদ্ধতি। প্রধান প্রধান ছয়টি মুদ্রার সমন্বয়ে এর মান নির্ধারণ হয়ে থাকে। গতকাল এক এসডিআরের মান ছিল ১ দশমিক ৩৩ ডলারের সমান।


বাংলাদেশ ব্যাংকের লেনদেনের ভারসাম্য বিষয়ক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি বাণিজ্য ঘাটতিতে রয়েছে দেশ। চলতি অর্থবছরের এপ্রিল শেষে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭৫৭ কোটি মার্কিন ডলার। চলতি হিসাবের ভারসাম্যেও ব্যাপক ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। এপ্রিল শেষে চলতি হিসাবের ভারসাম্যে ১ হাজার ৫৩২ কোটি ডলারের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার রেকর্ড দরপতন হয়েছে।

গত সোমবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ছিল ৪১ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার। গত বছর আগস্টে এ রিজার্ভ ৪৮ দশমিক শূন্য ৬ বিলিয়ন ডলারে উঠেছিল। বাড়তি আমদানি ব্যয়, প্রবাসীদের রেমিট্যান্স কমে আসার কারণে রপ্তানি বাড়লেও মোট মজুত কমছে। আগামী সপ্তাহে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) পরিশোধ দিতে হবে। ধারণা করা হচ্ছে, সেখানে দুই বিলিয়ন ডলারের বেশি দিতে হবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ৪০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে আসবে।