সমকাল: ইলেকট্রনিক্স খাতে বর্তমানে ইলেকট্রো মার্ট অন্যতম বৃহৎ কোম্পানি। আপনাদের ব্যবসা শুরুর গল্পটা কেমন ছিল?

নুরুল আফসার: মাত্র কয়েক লাখ টাকা নিয়ে ১৯৮০ সালে টিভির ব্যবসা শুরু করেন ফেনী জেলার উদ্যোক্তা মোহাম্মদ নুরুন নেওয়াজ সেলিম। শুরুতে হংকং থেকে টিভি আমদানি করে দেশে বিক্রি করতেন। এরপর চট্টগ্রামে একটি ছোট অফিস নিয়ে আমদানি করা টিভি পাইকারি বিক্রি শুরু করেন। পরবর্তীকালে সিঙ্গাপুর, জাপান, কোরিয়া এবং চীন থেকে আমদানি শুরু করেন। ব্যবসা সফল হতে শুরু করলে তার সহোদর আমরা তিন ভাই মো. নুরুল আমিন, মোহাম্মদ নুরুচ্ছাফা মজুমদার এবং আমি মো. নুরুল আফসার যুক্ত হই। আমাদের যৌথ প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে আজকের ইলেকট্রো মার্ট গ্রুপ। আমাদের এ গ্রুপে এখন কর্মসংস্থান প্রায় সাত হাজার লোকের।

সমকাল: ইলেকট্রো মার্টের আরও প্রসারে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে চাই।

নুরুল আফসার: উন্নতমানের পণ্য সরবরাহ করতে আরও উদ্যোগ নিচ্ছে ইলেকট্রো মার্ট। বিশ্বখ্যাত দুটি ব্র্যান্ডের পণ্য দেশে উৎপাদনের জন্য নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি বিদেশি প্রযুক্তি ব্যবহার করে হাইকো নামে একটি লোকাল ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠার কাজ চলছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বড় বিনিয়োগের লক্ষ্য রয়েছে আমাদের। বেশি মনোযোগ থাকবে গবেষণা ও নতুন প্রযুক্তিতে। এছাড়া বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের সঙ্গে যৌথভাবে আমরা পণ্যের মান উন্নত করছি। গবেষণা ও পণ্যের মান উন্নয়নের কাজে চীনের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ রয়েছে। চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন মডেলের পণ্য তৈরি করা হবে। টিভি, ফ্রিজ, এসি ছাড়াও মাইক্রোওয়েভ ওভেন, কুকার, ওয়াশিং মেশিন, ফ্যানসহ সব ধরনের হোম অ্যাপ্লায়েন্স রপ্তানির পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের। আমরা বিশাল বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন সক্ষমতা দ্বিগুণ করতে চাই। ২০২৫ সালের মধ্যে রপ্তানি বাজারে যাবে ইলেকট্রো মার্ট।

সমকাল: আপনারা বলছেন, দেশে এসির বাজারে 'গ্রী' শীর্ষে এবং টিভি-ফ্রিজের বাজারে 'কনকা' বেশ ভালো অবস্থানে। এটি কীভাবে সম্ভব হয়েছে?

নুরুল আফসার: এক সময় রঙিন টিভি বলতে আমদানি করা কয়েকটি বিদেশি ব্র্যান্ডই ছিল। দামও ছিল বেশি। ১৯৯৮ সালে চীন থেকে কনকা টিভি নিয়ে আসে ইলেকট্রো মার্ট। তিন ভাগের একভাগ দামে টিভি বিক্রি শুরু করি আমরা। ফলে গ্রামেও রঙিন টিভি দেখার সুযোগ সৃষ্টি হয়। এরপর ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন এবং মাইক্রোওয়েভ ওভেন বাজারে নিয়ে এলাম। ১৯৯৯ সালে গ্রীর এসি নিয়ে এলাম। তুলনামূলক কম দামের কারণে এই এসি বেশ সাড়া ফেলেছিল। একইভাবে গ্রী ব্র্যান্ডের মাধ্যমে সহজলভ্য এসির বাজারও সৃষ্টি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। আমদানির মাধ্যমে দেশে ব্যবসা শুরু করলেও কনকা এবং গ্রীর মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের গায়ে এখন 'মেইড ইন বাংলাদেশ' ট্রেডমার্ক লাগিয়েছে ইলেকট্রো মার্ট। ২০১৯ সাল থেকে আমরা দেশে ইলেকট্রনিক্স ও হোম অ্যাপ্লায়েন্স পণ্য উৎপাদন করছি। এছাড়া দেশে আমরাই প্রথম ফ্রিজে ডোর এলার্ম সিস্টেম প্রবর্তন করেছি।

সমকাল: আপনাদের ব্যবসার বয়স প্রায় ৪০ বছর। আমদানির দীর্ঘ পথ চুকিয়ে উৎপাদনে আসার কারণ কী?

নুরুল আফসার: এ খাতে সরকারের ইতিবাচক নীতির ফলে দেশে উৎপাদন শুরু করেছি। দেশে কারখানা করলে পণ্যের উৎপাদন খরচ কম হবে, ভোক্তা সাশ্রয়ী দামে কিনতে পারবেন এবং কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে- এসব পরিকল্পনা থেকে আমাদের উৎপাদনমুখী হওয়া। মূল কথা দেশে যত বেশি পণ্য উৎপাদন করা যাবে ততই অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হওয়া যাবে।

সমকাল: ইলেকট্রনিক্স পণ্যের বাজারে আপনাদের অবস্থান কেমন?

নুরুল আফসার: বর্তমানে এ খাতের বাজার প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার। প্রতি বছর ১০ শতাংশের বেশি বাড়ছে। গ্রী, কনকা ও হাইকো ব্র্যান্ডের ইলেকট্রনিক্স ও হোম অ্যাপ্লায়েন্স পণ্য এখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘরে ঘরে। দেশি এসির বাজারের ৬০ শতাংশ গ্রীর দখলে। আর টিভি ও ফ্রিজের বাজারের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কনকার। হাইকো ব্র্যান্ডের ইলেকট্রনিক্স পণ্যের দখলে রয়েছে প্রায় ৫ শতাংশ বাজার। এসব পণ্যের গুণগতমান, গ্রহণযোগ্যতা, বিক্রয়ের পর সেবা দেওয়া এবং সাশ্রয়ী দামে সারাদেশে গ্রাহকদের পছন্দের শীর্ষে।

সমকাল: ঈদ উপলক্ষে আপনাদের পণ্যে কী ধরনের ছাড় দিচ্ছেন?

নুরুল আফসার: কোরবানি ঈদের সময় ফ্রিজের চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। বার্ষিক চাহিদার প্রায় ২৫ শতাংশ ফ্রিজ এ সময়ে বিক্রি হয়। আমাদের ৭০টিরও বেশি মডেলের ফ্রিজ রয়েছে। সর্বনিম্ন সাড়ে ১২ হাজার থেকে ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা দামের ফ্রিজ রয়েছে। ৩৫টি ব্যাংকের ক্রেডিট, ডেবিট কার্ডসহ নগদ এবং তিন থেকে ১৮ মাসের কিস্তিতে পণ্য ফ্রিজ কেনা যাবে। ঈদ উপলক্ষে স্ট্ক্র্যাচ কার্ডের মাধ্যমে একটি কিনলে একটি ফ্রি অথবা নগদ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ছাড় এবং বিশেষ উপহারও রয়েছে। কনকা, হাইকো ও গ্রী ব্র্যান্ডের ফ্রিজে দেওয়া হচ্ছে বিশেষ বিক্রয়োত্তর সুবিধা। এসব ফ্রিজের কম্প্রেসরের ১০ বছরের রিপ্লেসমেন্ট ওয়ারেন্টি রয়েছে এবং অন্যান্য যন্ত্রাংশের রয়েছে পাঁচ বছরের ওয়ারেন্টি। তাছাড়া পাঁচ বছরের ফ্রি সেবাও দেওয়া হচ্ছে।

সমকাল: আপনাদের নিজস্ব ব্র্যান্ড হাইকো নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

নুরুল আফসার: হাইকো অনেক আগে শুরু করলেও এর বিস্তার বেশি দিনের নয়। নতুন কারখানা করার পর সেখানে হাইকোর ফ্রিজ, টিভি, ফ্যান, এসি ও মাইক্রো ওভেন উৎপাদন হচ্ছে। নিজেদের শো-রুম ও চ্যানেল পার্টনাররা গ্রী-কনকার পাশাপাশি হাইকোর পণ্যও বিক্রি করছে। ২০২৫ সালে যখন গ্রী ও কনকা রপ্তানি শুরু করব তখন হাইকো সম্মুখভাগে নিয়ে আসব। কনকা এবং গ্রীর সঙ্গে টেকনোলজি ট্রান্সফারের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড গড়ে তোলা হবে।

সমকাল: ইলেকট্রনিক্স খাত বিকাশে সরকারের কী ধরনের নীতিসহায়তা দরকার?

নুরুল আফসার: সরকারের বিদ্যমান নীতি ইলেকট্রনিক্স পণ্য উৎপাদনের জন্য যথেষ্ট উপযোগী। ২০২৩ সাল পর্যন্ত ভ্যাট ছাড় আছে। তবে স্থানীয় শিল্পের বিকাশে এ ছাড় আরও ১০ বছর বহাল রাখা জরুরি। এতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আকৃষ্ট হবেন। বর্তমানে শ্রমিক সংকটের কারণে চীনসহ ইউরোপের দেশগুলো এসব শিল্পে সুবিধা করতে পারছে না। ফলে এ সুবিধা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে আমাদের।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জসিম উদ্দিন বাদল।