বিশ্বজুড়েই মুদ্রাবাজারে চলছে অস্থিরতা। দক্ষিণ এশিয়াও এর বাইরে নয়। ইউএস ডলারের দরবৃদ্ধির উত্তাপ বেশ ভালোভাবেই টের পাচ্ছে এ অঞ্চলের দেশগুলো। ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রার দরপতন সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে তারা। এ-যাবৎকালের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থায় পৌঁছেছে বিভিন্ন দেশের মুদ্রার মান।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) অধ্যাপক ড. শাহ মো. আহসান হাবীবের মতে, মুদ্রাবাজারে এ অস্থিরতার মূল কারণ বিশ্ব পরিস্থিতি। বিশ্বজুড়ে করোনার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেল, খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম অনেক বেড়ে গেছে। বাড়তি আমদানি ব্যয় মেটাতে টান পড়ছে ডলারে। কারণ বর্তমানে আন্তর্জাতিক লেনদেনের প্রায় ৮০ শতাংশই ডলারে করতে হয়। এ অবস্থায় আগে থেকে যাদের বিদেশি ঋণের বোঝা বেশি ছিল, অর্থনৈতিক নানা সংকট ছিল, তারাই চাপটা বেশি অনুভব করছে।

অর্থনৈতিক সংকটে থাকা দেশ শ্রীলঙ্কাকে ডলার নিয়েও ভুগতে হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। চলতি আগস্ট মাসের প্রথম দিন এক ডলার পেতে খরচ করতে হয়েছে ৩৬১ শ্রীলঙ্কান রুপি। গত ফেব্রুয়ারির শুরুতে যা ছিল ২০১ দশমিক ৪২ রুপি। অর্থাৎ ছয় মাসে ডলারের বিপরীতে শ্রীলঙ্কান রুপির দর কমেছে ৭৯ দশমিক ২৩ শতাংশ।

ডলারের বিপরীতে দফায় দফায় কমেছে পাকিস্তানি রুপির মান। চলতি মাসের প্রথম দিন প্রতি ডলারের দাম পৌঁছে ২৩৯ রুপিতে। গত ফেব্রুয়ারির প্রথম দিন যা ছিল ১৭৬ দশমিক ৭৩ রুপি। ছয় মাসে পাকিস্তানি রুপির মান কমেছে ৩৬ দশমিক ২৩ শতাংশ।

নেপালে প্রতি ডলারের দর ১২৬ রুপি ছাড়িয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে ছিল ১১৯ দশমিক ৬২ নেপালি রুপি। ছয় মাসের ব্যবধানে নেপালি রুপির দরপতন হয়েছে ৫ দশমিক ৭২ শতাংশ।

অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে তুলনামূলক স্বস্তিকর অবস্থায় থাকা বাংলাদেশেও ডলারের দাম অনেক বেড়েছে। গত ছয় মাসে প্রতি ডলারে টাকার মূল্যমান কমেছে ১০ শতাংশের বেশি। গত ১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি ডলার ৮৬ টাকায় বিক্রি করে ব্যাংকগুলোর কাছে। আগস্টের প্রথম দিন এ দর বেড়ে হয়েছে ৯৪ দশমিক ৭০ টাকা।

প্রতিবেশী দেশ ভারতে ছয় মাসে স্থানীয় মুদ্রার দরপতন হয়েছে ৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ। গত ১ আগস্ট ডলারপ্রতি ৭৯ দশমিক ১৬ ভারতীয় রুপি খরচ করতে হয়েছে, যা ফেব্রুয়ারির শুরুতে ছিল ৭৪ দশমিক ৭৫ রুপি।

চলতি মাসের শুরুতে প্রতি ডলারের জন্য গুনতে হয়েছে ৭৯ ভুটানি গুলট্রামের বেশি। গত ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে এ দর ছিল ৭৪ দশমিক ৭৬ গুলট্রাম। ছয় মাসে স্থানীয় মুদ্রার দর কমেছে ৫ দশমিক ৭২ শতাংশ।

মালদ্বীপের মুদ্রা রুপিয়াহর দর অনেকটা স্থিতিশীল থাকতে দেখা গেছে। গত ১ আগস্ট প্রতি ডলার বিক্রি হয়েছে ১৫ দশমিক ৪৫ রুপিয়াহতে। মাঝে কিছুটা ওঠানামা করলেও ছয় মাসের গড় মোটামুটি এ রকমই।

অধ্যাপক শাহ মো. আহসান হাবীবের মতে, মুদ্রাবাজারে আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে আসা যে কোনো বিপদ মোকাবিলার জন্য আগে থেকে তৈরি থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির ওপর নির্ভরতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। আমদানি নির্ভরতা কমানো, রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে হবে। সেই সঙ্গে রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে আর্থিক প্রণোদনার পাশাপাশি প্রবাসীদের সঞ্চয় ও বিনিয়োগে আরও বেশি সুবিধা দেওয়া দরকার। খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি জ্বালানিতে আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের পথও খুঁজতে হবে।