অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, গত কয়েক মাসে দেশে বাণিজ্য ঘাটতির পেছনে এলসির আড়ালে টাকা পাচার একটি কারণ হতে পারে। ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে যেসব রেমিট্যান্স দেশে আসে, সেগুলো কালো টাকায় পরিণত হয়। ফলে ওইসব অর্থে যেসব কার্যক্রম করা হয়, সেগুলোরও বৈধতা থাকে না। এ জন্য সরকার সব সময় বৈধ পথে রেমিট্যান্সকে উৎসাহিত করছে। কারণ, রপ্তানির পরেই রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে।

গতকাল বুধবার ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকের পরে ভার্চুয়াল ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অর্থমন্ত্রী বলেন, অবৈধ চ্যানেলে যেসব রেমিট্যান্স আসে, তার কোনো রেকর্ড থাকে না। এই অর্থের মালিকরা কোনো জবাবদিহিও করতে পারবে না। হুন্ডি হচ্ছে। সরকার চেষ্টা করে যাচ্ছে হুন্ডি বা অবৈধ পথে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স পাঠানো বন্ধ করতে। বেশ আগে করা নিজের এক গবেষণার বরাত দিয়ে তিনি বলেন, দেশে যত রেমিট্যান্স আসে, তার ৫১ শতাংশ আসে বৈধপথে আর ৪৯ শতাংশ হুন্ডিতে। এসব রেমিট্যান্স বৈধপথে আনা সম্ভব হলে অর্থ উপার্জনকারী ও দেশ সবাই উপকৃত হবে। এ জন্য সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বৈধ পথে রেমিট্যান্স উৎসাহিত করা হচ্ছে।

এ সময় শিগগিরই দেশে মার্কিন ডলারের দাম কমবে বলে আশা প্রকাশ করেন মুস্তফা কামাল। তিনি বলেন, রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স বাড়ছে। ফলে ডলারের দাম কমে আসবে। পাশাপাশি বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্য কমে আসার কারণে মূল্যস্ম্ফীতিও দু-এক মাসের মধ্যে স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, সম্প্রতি বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, খাদ্য ও শিল্পের কাঁচামালের দাম কমছে। ফলে দেশে মূল্যস্ম্ফীতি কমে আসবে। কারণ, দেশে যে মূল্যস্ম্ফীতি হয়েছে, সেটা আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য বেড়ে যাওয়ার কারণে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ম্ফীতি হলে তারা সুদহার বাড়িয়ে দেয়। তাতেই মূল্যস্ম্ফীতি প্রশমিত হয় বা জনগণ খাপ খাওয়াতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ম্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ নেই। এ জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মূল্যস্ম্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। সরকার মূল্যস্ম্ফীতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় নয়- এমন পণ্য আমদানি নিরুৎসাহিত করছে। এ জন্য শুল্ক্ক হার ও এলসি মার্জিন বাড়ানোসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে আওয়ামী লীগ দায়িত্ব নেওয়ার সময় মূল্যস্ম্ফীতি ছিল ১২ দশমিক ৩ শতাংশ। সেই থেকে নানা চড়াই-উতরাই পার করে আসছে সরকার। করোনা মহামারি, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের মতো সংকট অতিক্রম করতে হচ্ছে। এর মধ্যেও দেশের অর্থনীতি ভালো আছে। খুব শিগগিরই দেশের অর্থনীতি আগের অবস্থায় ফিরে যাবে।

দেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বিষয়ক এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, এফডিআই নিয়ে কী দুর্নীতি হয়, তা তাঁর জানা নেই। এই দুর্নীতি অনুমান মাত্র।

সারের দাম কি আইএমএফের পরামর্শে বাড়ানো হয়েছে- এমন প্রশ্নের জবাবে মুস্তফা কামাল বলেন, আপনারা কোন আইএমএফের কথা বলছেন, তা জানা নেই। সরকার কারোর পরামর্শে সারের দাম বাড়ায়নি।

বিদেশে পাচার করা অর্থ আয়কর রিটার্নে প্রদর্শনবিষয়ক এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আইন করা হয়েছে। বিভিন্ন কারণেই মানুষ আয়কর রিটার্নে সব সম্পদ উল্লেখ করতে পারে না। বাংলাদেশে পদ্ধতিগত জটিলতাও রয়েছে। এ জন্য এ বিষয়ে সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আশা করা যায়, এর ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া যাবে। তিনি বলেন, যাঁরা বিদেশে সম্পদ রেখেছেন, তাঁরা দেশের প্রতি মমত্ববোধের কারণে, দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে রিটার্নে ঘোষণা করবেন।

গতকালের ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশকে (টিসিবি) বিদেশ থেকে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ৩ কোটি ৩০ লাখ লিটার সয়াবিন তেল কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফেরানি পোলাস্কা জু ফুড স্টাফ ট্রেডিং থেকে ২ কোটি ২০ লাখ লিটার সয়াবিন তেল কেনা হচ্ছে। কানাডার কানাডা আইএনসি থেকে ১ কোটি ১০ লাখ লিটার তেল কেনা হবে।

এ ছাড়া বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) ৬০ হাজার টন ইউরিয়া সার কেনার প্রস্তাব অনুমোদন পেয়েছে।