বাজার পরিস্থিতির উন্নতির জন্য সরকারের তরফ থেকে দেওয়া হয়েছে নানা প্রণোদনা। পাশাপাশি বিশ্ব বাজারেও কমেছে বিভিন্ন পণ্যের দাম। এসবের সুফল দেশের বাজারে নেই। কোনোভাবেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দর সাধারণ মানুষের নাগালে আসছে না। গত কয়েকদিনে চালসহ কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে আরেক দফা। বাজারে ঊর্ধ্বমুখী দামে পণ্য কিনতে গিয়ে খেই হারাচ্ছেন নিম্ন আয়ের মানুষ।
বাজারের উচ্চমূল্যের চাপে নিম্ন আয়ের মানুষ কম দামে পণ্য পাওয়ার জন্য রাষ্ট্রীয় বিপণন সংস্থা টিসিবির বিক্রয় কেন্দ্রে ভিড় জমাচ্ছেন। টিসিবি গত রমজান থেকে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করছে। শুধু কার্ডধারীরা পণ্য কিনতে পারছেন। তবু বাজারের এমন টালমাটাল পরিস্থিতিতে যাঁদের কার্ড নেই তাঁরাও টিসিবির দোকানের লাইনে দাঁড়িয়ে পণ্য কেনার চেষ্টা চালাচ্ছেন। আবার যাঁদের কার্ড আছে তাঁরা বলছেন, টিসিবি যেন চাল ও আলুও বিক্রি শুরু করে। যে সয়াবিন তেল, চিনি, ডাল ও পেঁয়াজ দেওয়া হচ্ছে সেগুলোর পরিমাণ যাতে বাড়ানো হয়।

গত ৮ থেকে ১০ দিনের মধ্যে চাল, ডিম, গুঁড়ো দুধ, টিস্যু পেপার, মসুর ডাল, আলু ও আমদানি করা রসুনের দাম বেড়েছে। আগে থেকেই বেড়ে আছে আটা, ভোজ্যতেল, ডাল, শাকসবজি, মাছ, মাংস ও মসলার দাম। ভোজ্যতেলের দাম সম্প্রতি কিছুটা কমেছে। তবে আগে কয়েক দফা বেড়ে যাওয়া দরের চেয়ে এখনও সেটা অনেক বেশি।
টিসিবির বাজার দরের তথ্য অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের দাম ৩ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। সরকারের মূল্যস্ম্ফীতির তথ্যেও বাজারের এ চিত্র উঠে আসছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাস থেকে মূল্যস্ম্ফীতি ৭ শতাংশের ওপরে রয়েছে। মে মাসে মূল্যস্ম্ফীতি উঠেছিল ৭ দশমিক ৫৪ শতাংশে, যা গত আট বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। মূল্যস্ম্ফীতির চাপে দরিদ্ররা আরও দরিদ্র হচ্ছেন। নিম্ন আয়ের পরিবারে পুষ্টির জোগানও কমছে।

এ ব্যাপারে কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ডলারের দাম বাড়ার কারণে আমদানি করা কিছু জিনিসের দাম বাড়তে পারে। তবে দেশে যেসব পণ্যের উৎপাদন হয়, সেগুলোর দাম বাড়ার পেছনে কোনো যুক্তি নেই। নিত্যপণ্যের আমদানি ও বাজার দর নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা দরকার।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে জানা গেছে, হঠাৎ করে গত দুই দিনে ডিমের ডজনে বেড়েছে ১০ থেকে ২০ টাকা। গতকাল প্রতি ডজন ফার্মের মুরগির ডিম ১৩০ থেকে ১৪০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। তেজগাঁওয়ের পাইকারি ডিমের আড়ত নেয়ামতপুর ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী জসীম উদ্দীন বলেন, বাজারে অন্য জিনিসের দাম বাড়ার কারণে অনেকেই ডিম বেশি কিনছেন। এতে চাহিদা বেড়েছে। তবে চাহিদা মতো ডিম আসছে না বাজারে। এছাড়া লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদনও কমেছে। চার-পাঁচ দিনের ব্যবধানে গুঁড়ো দুধের দাম কেজিতে বেড়েছে ৪০ থেকে ৫০ টাকা। তেজগাঁওয়ের নিউজিল্যান্ড ডেইরি ব্র্যান্ডের পরিবেশক ইউনিকন ডিস্ট্রিবিউটরের কর্মী সাহাব উদ্দিন জানান, ডানোর প্রতি কেজি গুঁড়ো দুধের দাম ৪৮ টাকা বেড়েছে। টিসিবির তথ্যমতে, গত এক বছরে ১৪ থেকে ২১ শতাংশ বেড়েছে গুঁড়ো দুধের দাম।
এদিকে এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে আলুর দাম বাড়তি। কেজিতে দুই থেকে চার টাকা বেড়ে ২৮ থেকে ৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। টিস্যু পেপারের দাম বেড়েছে দুই টাকা করে। তেজকুনীপাড়া এলাকার তাসমি জেনারেল স্টোরের মালিক মিজানুর রহমান বলেন, সাদা টিস্যু পেপারের দাম ১৮ থেকে ২০ টাকা এবং লাল টিস্যুর দাম ২৮ টাকা ৩০ টাকা দাম নির্ধারণ করেছে কোম্পানিগুলো। আমদানি করা চিকন মসুর ডালের দাম বেড়েছে ৫ থেকে ১০ টাকা। দুই সপ্তাহ আগে যে ডাল ১২৫ থেকে ১৩০ টাকায় বিক্রি হয়েছে গতকাল সেই ডাল বিক্রি হয়েছে ১৩৫ থেকে ১৪০ টাকা কেজি দরে। আমদানি করা রসুনের দামও বেড়েছে কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা। কাঁচামরিচের কেজি ২০০ থেকে ২৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

টিসিবির দোকানে বাড়তি ভিড় :গত বুধবার থেকে টিসিবির পণ্য বিক্রি শুরু হয়েছে। টিসিবির কার্ডধারী ক্রেতারা বিক্রির শুরুতেই পণ্য সংগ্রহ করে নিতে চাচ্ছেন। এজন্য দোকানগুলোতে ভিড় বেড়েছে। পাশাপাশি অনেক মানুষের কার্ড না থাকলেও টিসিবির দোকানে আসছেন পণ্য নিতে। তাঁরা বলছেন, বাজারে পণ্যের যে দাম তাতে তাঁরা প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে পারছেন না। এজন্য টিসিবির দোকানে এসেছেন। অনেকেই আরও কার্ড দেওয়ার বা সাময়িকভাবে কেনার সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ করেছেন। এদিকে যাঁদের কার্ড আছে তাঁরা বলছেন, টিসিবি যে পরিমাণ পণ্য দিচ্ছে তাতে পুরো মাস পার হয় না। এজন্য পণ্যের পরিমাণ বিশেষ করে সয়াবিন তেল, ডাল ও পেঁয়াজ বেশি পরিমাণে দেওয়ার অনুরোধ করেছেন। একইসঙ্গে টিসিবির মাধ্যমে সরকার যাতে চাল ও আলু বিক্রি শুরু করে সেই অনুরোধও করছেন।

গতকাল দুপুরে রাজধানীর তেজকুনিপাড়া এলাকার টিসিবির দোকানে পণ্য কিনতে আসেন আল্পনা বেগম। তিনি জানান, তাঁর ও স্বামীর আয় দিয়ে তিন সন্তানের লেখাপড়ার খরচ ও সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। টিসিবি থেকে যদি পুরো মাসের সয়াবিন তেল, ডাল, পেঁয়াজ পাওয়া যেত, বেশ ভালো হতো। একই এলাকায় টিসিবির অন্য আরেকটি পরিবেশকের দোকানে পণ্য কেনেন এরশাদ নামে এক ক্রেতা। তিনি বলেন, 'বাজারে দাম বাড়ার কারণে টিসিবির পণ্য কিনছি। তবে এগুলোর (তেল, চিনি, ডাল ও পেঁয়াজ) সঙ্গে চাল আর আলু দিলে ভালো হতো।' বেগুনবাড়ি এলাকার মর্জিনা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করেন নিম্নমানের পেঁয়াজ নিয়ে। তিনি বলেন, 'পেঁয়াজের অনেকটাই ফেলে দিতে হবে।'

টিসিবির তেজকুনিপাড়া এলাকার পরিবেশক আরিয়ান ট্রেডার্সের এক বিক্রয়কর্মী জানান, লাইনে অনেক বেশি মানুষ দাঁড়ায়। প্যাকেট করতে দেরি হওয়ার কারণে অনেকে বিরক্ত হন। ফ্যামিলি কার্ড ছাড়াও কেউ কেউ কাউন্সিলরের সিল ও সই নিয়ে আসেন। তাদেরও পণ্য দিতে হয়।

টিসিবির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আরিফুল হাসান সমকালকে বলেন, এই মুহূর্তে পণ্যের পরিমাণ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেই। এছাড়া চাল, আটা ও আলু দেওয়ার বিষয়েও ভাবছে না টিসিবি। কারণ চাল ও আটা খাদ্য মন্ত্রণালয় ওএমএসের মাধ্যমে বিক্রি করছে। নিম্নমানের পেঁয়াজের বিষয়ে তিনি বলেন, একসঙ্গে অনেক পেঁয়াজ কেনা হয়। সেগুলো গুদামজাত করে রাখা হয়। এখন প্রচণ্ড গরম। তাছাড়া লোডশেডিংও রয়েছে। সেই কারণে কিছু পেঁয়াজ নষ্ট হতে পারে। তবে ডিলারদের কাছে বিক্রয়ের সময় প্রতি বস্তায় নষ্ট হওয়া পেঁয়াজের আনুমানিক পরিমাণ নির্ধারণ করে তা দাম থেকে বাদ দেওয়া হয়। তারপরও কোনো ডিলার নষ্ট পেঁয়াজ দিলে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিশ্ববাজারে দাম কমার সুফল নেই :সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেল, ডাল, চিনি, চাল, গম, গুঁড়ো দুধসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের দাম কমেছে। অনেক দেশে উৎপাদন বেড়েছে। আবার যেসব দেশ রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তারা রপ্তানি শুরু করছে। তুরস্কের মধ্যস্থতায় খাদ্যপণ্য সরবরাহে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে সমঝোতা চুক্তি হওয়ায় পণ্যের সরবরাহও স্বাভাবিক হওয়ার আশা করা হচ্ছে। জ্বালানি তেলের দামও ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০ ডলার কমেছে। এসব কারণে খাদ্যপণ্যের দাম কমছে। বাংলাদেশ ট্যারিফ অ্যান্ড ট্রেড কমিশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত মে মাসের শেষ সপ্তাহের চেয়ে জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম গড়ে ৩০ শতাংশ কমেছে। সয়াবিন তেলের দাম কমেছে ৩১ শতাংশ, পাম অয়েলে ৩৬ শতাংশ, চিনি ৬ শতাংশ, চালে ১২ শতাংশ, মসুর ডালে ১৯ শতাংশ দাম কমেছে। তবু দেশের বাজারে দাম কমার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। যদিও আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে সঙ্গে সঙ্গে দেশের বাজারেও বাড়িয়ে দেন ব্যবসায়ীরা।

কাজে আসছে না সরকারের উদ্যোগ :নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়। বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলের দাম বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সয়াবিন ও পাম অয়েল আমদানিতে শুল্ক্ক কমানো হয়েছে। এই ভোজ্যতেল আমদানিতে থাকা ৪ শতাংশ আগাম কর, আমদানি ও উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট প্রত্যাহার করে সরকার। চালের আমদানি শুল্ক্ক ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে। চিনির আমদানি শুল্ক্কও কমানো হয়। এসব পণ্য আমদানিতে ব্যাংকগুলো যাতে ব্যবসায়ীদের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অর্থায়ন করে সেজন্য নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আমদানি করা পণ্য বন্দর থেকে দ্রুত খালাসের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সবশেষে জ্বালানি সংকটের মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদনকারী কারখানাকে রেশনিংয়ের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।
এর পাশাপাশি বাজারে টিসিবির মাধ্যমে সয়াবিন তেল, পেঁয়াজ, ডাল, চিনি সরবরাহ করছে। সারাদেশে এক কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিমাণে এসব পণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে। খোলা বাজারে কার্যক্রমের মাধ্যমে কম মূল্যে চাল ও আটা বিক্রি করছে সরকার। এর বাইরে ভিজিএফ, ভিজিডিসহ অন্য ব্যবস্থায়ও চাল, আটা সরবরাহ করা হচ্ছে।

অসাধু ব্যবসায়ীদের অপতৎপরতা বন্ধে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সংস্থা ও জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বাজার তদারকি করা হচ্ছে। এত উদ্যোগের পরও বাজারে যৌক্তিক মূল্য নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।