আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার দোহাই দিয়ে সরকার জ্বালানি তেলের দাম একবারেই ৪৭ শতাংশ বাড়িয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান কমানো, পাচার রোধ, বিপিসির আর্থিক সক্ষমতা ধরে রাখা এবং উন্নয়ন প্রকল্প চলমান রাখতেই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে বলে দাবি করছে জ্বালানি বিভাগ।

তবে খাতসংশ্নিষ্টরা বলছেন, দেশের চলমান অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম না বাড়িয়েও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যেত। দাম বাড়ানোর বিকল্প ছিল উল্লেখ করে তাঁরা বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানির মতো অতি-জনসম্পৃক্ত পণ্য থেকে রাজস্ব আদায়ে ছাড় দিতে পারত সরকার। গত ৮ বছরে তেল বিক্রি করে বিপিসি যে লাভ করেছে, তা এই আপৎকালে ব্যবহার করলে জনগণের ঘাড়ে দাম বৃদ্ধির বোঝা চাপত না।

দেশে উৎপাদিত পেট্রোল-অকেটেনের দাম বৃদ্ধিরও যৌক্তিকতা দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের দাবি, বিপিসির আর্থিক অব্যবস্থাপনা ও অস্বচ্ছতা জ্বালানি খাতের বর্তমান অরাজক পরিস্থিতি ডেকে এনেছে। বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কায় এখন আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম পড়তির দিকে। তাই এ মুহূর্তে দেশে জ্বালানির দাম বৃদ্ধিকে অন্যায্য বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, গত কয়েক বছরে বিপিসি প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা লাভ করেছে। এর বড় অংশ সরকার নিয়ে গেছে। এই অর্থ দিয়ে তহবিল গঠন করলে সংকট মুহূর্তে কাজে লাগানো যেত। এতে জনগণের ওপর দাম বৃদ্ধির বোঝা চাপাতে হতো না।

আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে জ্বালানির দাম বাড়ানো হলেও দাম এখন কমে আসছে। খাতসংশ্নিষ্ট বিশ্নেষণগুলো বলছে, আগামী মাসগুলোতে দাম আরও কমবে। কারণ ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে অর্থনৈতিক মন্দায় বিশ্বব্যাপী জ্বালানির চাহিদা কমে যেতে পারে।

সরকার দাম বৃদ্ধির ব্যাখ্যায় রেফারেন্স হিসেবে জুলাইয়ের দাম সামনে এনেছে। জুলাইয়ে প্রতি ব্যারেল ক্রুড অয়েলের দাম সরকার উল্লেখ করেছে ১১৭ ডলার। সেই দাম এখন কমে ৯৫ ডলারে নেমেছে। পরিশোধিত ডিজিলের দাম জুলাইয়ে ১৩৯ দশমিক ৪৩ ডলার দেখানো হয়েছে সরকারের বিজ্ঞপ্তিতে। তা এখন ১৩২ ডলারে নেমে এসেছে।

আপৎকালে মেলে না মুনাফার অর্থ: ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে ধারাবাহিকভাবে মুনাফা করছে বিপিসি। গত ৮ বছরে ৪৮ হাজার ১২২ কোটি টাকা মুনাফা করেছে রাষ্ট্রীয় এ সংস্থা। এর মধ্যে ২০২০-২১ অর্থবছরে ৯ হাজার ৫৫৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা লাভ করে বিপিসি। আর চলতি অর্থবছরের ৮ মে পর্যন্ত ১ হাজার ২৬৩ কোটি টাকা মুনাফা হয়েছে রাষ্ট্রীয় তেল বিপণনকারী সংস্থার।

এদিকে জ্বালানি তেলে দিন দিন জনগণের ব্যয় বাড়লেও সরকারের মুনাফা কমছে না। ট্যাক্স-ভ্যাট ও প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশ থেকে প্রতিবছর রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বিপিসি হাজার হাজার কোটি টাকা দিচ্ছে। বিপিসির লভ্যাংশ থেকে গত ৭ বছরে সরকার ১৩ হাজার কোটি টাকা নিয়েছে। এ ছাড়া এক লিটার ডিজেল থেকেই সরকার ১৯ থেকে ২০ টাকা ট্যাক্স-ভ্যাট হিসেবে আদায় করে। বছরে জ্বালানি তেল থেকে সরকার ৮-৯ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পায়। ট্যাক্স-ভ্যাট হিসেবে গত ৭ বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা সরকারকে দিয়েছে বিপিসি।

ট্যাক্স-ভ্যাট বাবদ অর্থ না নিলেই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হয় না বলে জানিয়েছেন ক্যাবের শামসুল আলম। তিনি বলেন, লোকসানের কথা বলে দাম বাড়িয়ে জনগণের পকেট থেকে অর্থ নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে ট্যাক্স-ভ্যাটের নামে টাকা কেটে রাখছে। দাম বাড়ায় সরকারের আয় আরও বাড়বে। অর্থনীতির সংকটময় পরিস্থিতিতে সরকারের উচিত ছিল জনগণের কথা ভেবে ট্যাক্স-ভ্যাটে ছাড় দেওয়া।

পেট্রোলে 'প্রতারণা': চাহিদার শতভাগ পেট্রোল ও অকটেনের ৪০ ভাগ দেশেই উৎপাদিত হয়। দেশের গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রাপ্ত কনডেনসেট পরিশোধন করে পেট্রোল ও অকটেন পাওয়া যায়। দেশে উৎপাদিত অকটেনের মান বাড়াতে আমদানি করা বুস্টার মেশানো হয়। বিশ্ববাজারে দাম বৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে এ দুই পণ্যেরও দাম ৫২ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম এ বিষয়ে বলেন, দেশে উৎপন্ন পণ্য পেট্রোলের দাম বাড়ানো এক ধরনের প্রতারণা।

হিসেবে নেই স্বচ্ছতা: অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, বিপিসির হিসাব ও অডিট নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আপত্তি জানিয়ে আসছে অর্থ মন্ত্রণালয়, কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (সিএজি) কার্যালয় ও আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলো। বিদেশি প্রতিষ্ঠান দিয়ে বিপিসির অডিট করানোর জন্য আইএমএফ বাংলাদেশ সরকারকে চাপ দিলেও তা কাজে আসেনি। অর্থ বিভাগ ও জ্বালানি বিভাগ বিপিসিতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য বারবার তাগিদ দিলেও লাভ হয়নি। সংস্থাটি তাদের মতোই চলছে।

তিনি বলেন, বিপিসিতে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেন হলেও এতে স্বচ্ছতা নেই। লোকসানের অস্বচ্ছ হিসাব দেখিয়ে হুট করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে দেয় বিপিসি। আইন অনুসারে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করার কথা এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের। কিন্তু বিপিসি কখনোই কমিশনের আওতায় আসেনি। ক্যাবের পক্ষ থেকে বারবার চিঠি দেওয়া হলেও এ বিষয়ে জ্বালানি বিভাগ কোনো উদ্যোগ নেয়নি। হিসাবে স্বচ্ছতা নেই বলেই প্রতিষ্ঠানটি জনগণের সামনে শুনানিতে অংশ নিতে ভয় পায়।

তিনি বলেন, তেলের আন্তর্জাতিক বাজরের দর ধরে দৈনিক লোকসানের হিসাব দেখায় বিপিসি। অথচ ওই দরের তেল দেশে আসে অন্তত ১৫-২০ দিন পর। অর্থাৎ আজকে যে তেল বিক্রি করছে বিপিসি, তা আগেই কেনা হয়েছে। এদিকে আজকের দর ধরেই লোকসানের হিসাব জনগণের সামনে তুলে ধরছে সংস্থাটি।