চাল, সবজি, মাছ, মুরগি, ডিম- কোনো কিছুতেই যেন রাখা যাচ্ছে না হাত। আগেই ছিল নিত্যপণ্যের বাজারে অগ্নিরূপ। এখন জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ছুতায় আরও লাফিয়ে ছুটছে দামের ঘোড়া। দুই দিনের ব্যবধানে বাজার পরিস্থিতি চলে গেছে ক্রেতাদের আরও নাগালের বাইরে। জ্বালানির দর বাড়ার পটভূমিতে বাজারের সব পণ্য এখন আরও 'দামি'। তবে বাজার-সংশ্নিষ্ট সরকারি বিভিন্ন সংস্থার কর্তারা আশ্বাস দিচ্ছেন, শিগগিরই বাজারদর তদারকি করা হবে, টেনে ধরা হবে বাড়তি দরের লাগাম।

তবু স্বস্তি ফিরছে না ক্রেতাদের মনে।

বেসরকারি চাকরিজীবী আরিফুল ইসলাম। তাঁর সঙ্গে কথা হয় রাজধানীর মগবাজারে। তিনি বলেন, এখন ব্যবসায়ীরা যে চাল, ডাল, তেল বিক্রি করছেন, সেগুলো অন্তত এক সপ্তাহ আগে কেনা। তাঁরা অযৌক্তিভাবে দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ২৫ কেজির এক বস্তা মিনিকেট চালের দাম ১ হাজার ৮০০ টাকায় কিনতে হয়েছে। কয়েকদিন আগেও একই মানের চালের বস্তা কিনেছি ১ হাজার ৭০০ টাকায়। অর্থাৎ কেজিতে বেড়েছে চার টাকা।

গত শুক্রবার রাতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সরকার। ওইদিন রাজধানীর বাজারগুলোতে যেসব সবজি বিক্রি হয়েছিল ৪০ থেকে ৫০ টাকার মধ্যে, গতকাল রোববার সেসব সবজি কেজিতে ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দরে কিনতে হয়েছে ক্রেতাদের। সবচেয়ে প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য চালের দাম বেড়েছে কেজিতে দুই থেকে পাঁচ টাকা। মুরগির দাম ২০ থেকে ৩০ এবং ডিমের ডজনে ৫ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে।

মোটা ও মিনিকেট চাল কেজিতে দুই টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে যথাক্রমে ৫২ থেকে ৫৪ টাকা ও ৭০ থেকে ৭২ টাকায়। পাঁচ টাকা বেড়ে নাজিরশাইল বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৯০ টাকায়।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে পরিবহন মালিকরা ইচ্ছামতো ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের। দূরপাল্লার ট্রাকগুলো পণ্য পরিবহনে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা ভাড়া বাড়িয়েছেন। নতুন করে যেসব পণ্য কিনে আনছেন, সেসব পণ্যের খরচ ৫০ শতাংশ বেড়েছে। ফলে পণ্যের ক্রয়মূল্য বেড়ে গেছে।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে চালের অন্যতম বড় পাইকারি ব্যবসায়ী হাজি ইসমাইল অ্যান্ড সন্সের স্বত্বাধিকারী মো. জসিম উদ্দিন বলেন, বেশিরভাগ চাল আসে কুষ্টিয়া, দিনাজপুরসহ উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলা থেকে। ট্রাকপ্রতি এতদিন ভাড়া ছিল ১৬ থেকে ১৮ হাজার টাকা। এখন আরও ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। ফলে ট্রাক ভাড়াবাবদ খরচ হচ্ছে ২১ থেকে ২৪ হাজার টাকা। এ ছাড়া চালকল মালিকরাও মিলগেটে চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন বস্তাপ্রতি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা।

তিনি বলেন, একদিকে মিল পর্যায়ে দাম বেড়েছে। অন্যদিকে, পরিবহন খরচ বেড়েছে। এ দুই বাড়তি খরচের কারণে সব ধরনের চাল কেজিতে অন্তত পাঁচ টাকা বেড়েছে।

দুই দিনের ব্যবধানে মুরগির দাম বেড়েছে কেজিতে ২০ টাকা। ব্রয়লারের কেজি ১৭০ থেকে ১৮০ এবং পাকিস্তানি ককের কেজি বিক্রি হচ্ছে ২৭০ থেকে ২৯০ টাকায়। খুচরা বিক্রেতারা ডিমের ডজন বিক্রি করছেন ১৩৫ থেকে ১৪০ টাকায়।

তেলের দাম বাড়ানোর পরদিনই এক দফা বেড়েছে বেশিরভাগ সবজির দাম। গতকাল নতুন করে করোলা, বেগুনসহ আরও কয়েকটি সবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ৩০ টাকা বেড়েছে।

রসুনের দাম গত তিন দিনে বেড়েছে ২৫ টাকা পর্যন্ত। প্রতি কেজি আমদানি করা রসুন বিক্রি হচ্ছে ১২৫ থেকে ১৩৫ টাকায়। আমদানি করা পেঁয়াজের দাম না বাড়লেও দেশি পেঁয়াজের দাম বেড়েছে কেজিতে পাঁচ টাকা। প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ৪৫ এবং আমদানি করা পেঁয়াজ ৩০ থেকে ৩৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

কুষ্টিয়া ও যশোর থেকে প্রতিদিন রাজধানীর কারওয়ান বাজার, যাত্রাবাড়ী ও মিরপুর এলাকায় বিভিন্ন ধরনের সবজি নিজের ট্রাকে বহন করেন মাসুদ মিয়া। তিনি বলেন, তেলের দাম বাড়ার কারণে কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় আসতে খরচ বেড়েছে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা। এ ছাড়া কয়েকটি সেতুর টোলসহ রাস্তায় আছে বিভিন্ন খরচ।

পরিবহন ভাড়া নির্ধারণের আগেই পণ্যের বেশি দাম নেওয়া অযৌক্তিক বলে মনে করেন সরকারের বাজার তদারকির সঙ্গে সংশ্নিষ্ট ব্যক্তিরা।

এ ব্যাপারে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এএইচএম সফিকুজ্জামান বলেন, ব্যবসায়ীরা সুযোগসন্ধানী। তাদের অজুহাতেরও শেষ নেই। এখন পর্যন্ত পরিবহন ভাড়াও ঠিকভাবে নির্ধারণ করা হয়নি। তাই এখনই পণ্যের দাম বাড়ানোর যুক্তি নেই। তবে আমরা অগ্রাধিকারভিত্তিতে কাজ করছি। সারাদেশে পেট্রোল পাম্পগুলোতে আজ (গতকাল) ৪১টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। কারণ, পেট্রোল নিয়ে নানা অনিয়ম পাওয়া গেছে। এর পরই নিত্যপণ্যের বাজারে অভিযান চালানো হবে।