সোহেল রহমান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সহকারী সচিব হিসেবে যোগ দিয়েছে পাঁচ মাসও হয়নি। কাঙ্ক্ষিত মন্ত্রণালয়ে যোগ দিতে পেরে সে মহাখুশি। সিনিয়রদের কাছে কাজ শেখা, তাঁদের ভালো দিকগুলো ফলো করা, তাঁদের কাছে নিজেকে যোগ্য অফিসার হিসেবে প্রমাণ করার জন্য বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে নিজেকে উপস্থাপন করে এরই মধ্যে দু-চারজনের সুনজরে পড়েছে।
অফিসের গাড়ি তার ফ্ল্যাটের দরজায় আসে না। বড় রাস্তায় দাঁড়াতে হয়। তার জন্য অন্য কলিগরা বিরক্ত হোক সে তা চায় না। প্রতিদিনের মতো আজও সে পাঁচ মিনিট আগে সিঁড়ি দিয়ে নামছে। নিচ থেকে ওপরে উঠে আসছেন বড় ভাইয়ের কলিগ আলী ভাই।
সোহেল আলী ভাইকে পছন্দ করে না। সব সময় এড়িয়ে চলতে চায়। আলী ভাই মনে করেন বাংলাদেশ স্বাধীন কোনো রাষ্ট্র নয়। ভারতের একটি অঙ্গরাজ্য। সিকিমের মতো। সময়-সুযোগ বুঝে ভুটান বাংলাদেশ সব গিলে খাবে। বঙ্গবন্ধুকে প্রতিদিন বকা দিতে না পারলে তার সুখনিদ্রা হয় না।
আলী ভাইয়ের পাশ কাটিয়ে সোহেল না দেখার ভান করে নেমে আসছে, আলী ভাই হাসিমুখে জিজ্ঞেস করল-
অফিস যাচ্ছ? যেতে হবে না। আজ ছুটি।
তার মানে! কিসের ছুটি?
তুমি দেখছি কিছুই জানো না। শেখ সাহেব নেই।
নেই মানে?
নেই মানে খতম। সপরিবারে সব খতম। শত্রুর শেষ রাখতে নেই। আর্মিরা এটা ভালো করেই জানে। দেশের বাইরে ছিল, তাই মেয়ে দুইটা বেঁচে গেল।
সোহেল ভয়ংকর ক্রোধে নিঃশব্দ চিৎকারে কুৎসিত বকা দিল, বাস্টার্ড। তারপর সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নেমে তার অফিস গাড়ির স্টপেজে এসে দাঁড়াল। সোহেলের মনে হলো আলী ভাই তাকে নির্মম যাতনা দিয়ে কুৎসিত আনন্দ উপভোগ করছে। আসলে এসব কিছু ঘটেনি।
দিনটি আজ অস্বাভাবিক। পথঘাট জনশূন্য। লোকজন, গাড়ি, বাস-ট্রাকের অভাবে বড় রাস্তা খাঁখাঁ করছে। পাশ দিয়ে এক মধ্যবয়সী ভদ্রলোক বাজারের থলে হাতে ত্রস্তে হেঁটে যাচ্ছেন। সোহেলকে অফিস ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন- দাঁড়িয়ে আছেন কেন? কারফিউ দিয়েছে। মার্শাল ল' ঘোষণা করেছে। এই ছিল কপালে! রাস্তায় বেরোনো ঠিক না। যে কোনো সময় বিপদ হতে পারে। ঘরে ফিরে যান।
সোহেলের কেমন এলোমেলো লাগছে। দুঃস্বপ্টম্ন মনে হচ্ছে। কোথাও কোনো ভুল হয়নি তো? বদলোকের কোনো গুজব? স্বাধীনতার নায়ক, ২৩ বছরের জেল-জুলুম, অত্যাচার সয়ে মানুষের অন্তরে গড়ে তুলেছেন স্বাধীনতার স্বপ্টম্ন- পাকিস্তান, আমেরিকা, চীন, বৃহৎ এই ত্রয়ী শক্তি যে স্বাধীনতা আটকাতে পারল না। বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসির মঞ্চে তুলেও সসম্মানে ফেরত পাঠাতে বাধ্য হলো। কী এমন ঘটল, কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সপরিবারে হত্যা করা হলো?
সোহেল ক্লান্ত বিধ্বস্ত পরাজিত। নত মাথায় ঘরে ফিরে এলো। মৃত্যু বঙ্গবন্ধুর হয়নি, তার হয়েছে। যদি এমন হতো! পৃথিবীতে কত অলৌকিক ঘটনা ঘটে, এমন কি ঘটতে পারে না বঙ্গবন্ধু বেঁচে আছে। যা শুনেছে তা নেহাতই গল্প।
বেদনা আরও তীক্ষষ্ট নির্মম, হারিকুরির মতো হৃদয় ছিন্নভিন্ন হয় যখন শুনি বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তান নয়, আমেরিকা নয়, চীন নয়, হত্যা করেছে ঘরের শত্রুবিভীষণ। মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসা মুক্তিযোদ্ধার গ্রুপটি। এরা কি মুক্তিযোদ্ধার ছদ্মবেশে পাকিস্তানি প্রশিক্ষিত গুপ্তচর? তাদের মিশন ছিল স্বাধীন বাংলাদেশকে পাকিস্তানি কনফেডারেশন বন্দি করা? সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি স্তরে স্তরে গোপন ষড়যন্ত্র। পরাজিত পাকিস্তানি সৈন্যদের সারেন্ডারের মুহূর্তে পাকিস্তানি এজেন্ট আলবদর- রাজাকার দিয়ে বুদ্ধিজীবী নিধন। বাংলাদেশকে ধ্বংস করার জন্য, পরাজয়ের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য এমনই কত ষড়যন্ত্রের স্তর সাজানো আছে কে জানে!
দুপুরে ভাত খেতে গিয়ে সোহেল অনুভব করল সে খেতে পারছে না। ভাত গলা দিয়ে নামছে না। মনে হয় বমি করে ফেলবে।
মা জিজ্ঞেস করলেন- না খেয়ে উঠে পড়লি যে?
সোহেল কোনো কথা না বলে হাত ধুয়ে নিজের ঘরে এসে শুয়ে পড়ল। কপালে ঠান্ডা হাতের স্পর্শ পেয়ে সোহেল ফিরে তাকাল।
কী হয়েছে?
ভালো লাগছে না। বমি বমি লাগছে। মনে হয় জ্বরটর হবে হয়তো।
মা বললেন- বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে, তা নিদারুণ কষ্টের। মেনে নেওয়া যায় না। তুই সরকারি কর্মকর্তা। দলীয় লোক না। কষ্টটা অন্তরে থাক। বাইরে এর কোনো প্রকাশ এ মুহূর্তে ঠিক না। ধৈর্য ধরতে হবে। মনকে শক্ত রাখতে হবে।
খন্দকার মোশতাককে সামনে রেখে খুনি মেজররা দেশ শাসনের চেষ্টা করতে লাগল। তারপর খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থান। আওয়ামী লীগরা চাঙা হয়ে উঠল। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী তিন জাতীয় নেতাকে জেলখানায় হত্যা করে খুনি মেজররা দেশ ছেড়ে পালাল। সব যেন সাজানো নাটকের অভিনয় চলছে। এরপর ক্ষমতার মঞ্চে এলো নাটকের নায়ক তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়া। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তিন মাস ধরে চলল হত্যা, ক্ষমতা দখল, পাল্টা দখলের হানাহানি। রাজনীতি চলে গেল বন্দুকের নলের দখলে। মাস্তানদের বাহুবলের অধীনে।
সোহেল এক কঠিন সমস্যায় ঘুরপাক খাচ্ছে। বাংলাদেশে এই দমবন্ধ পরিবেশে থাকতে তার ইচ্ছে করে না। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। পালাতে পারলে বাঁচে। কোথায় পালাবে? কেন পালাবে? পালানোর অর্থ কি মুক্তি? সে কি পালিয়ে একা বাঁচতে চায়?
মুক্তিযুদ্ধের সময় তার অনেক বন্ধু মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছে। কেউ শহীদ হয়েছে, কেউ বিজয়ী আনন্দে ফিরেছে। তখন তার যুদ্ধে যাবার সময়। বেঁচে থাকার জন্য সে নানা জায়গায় পালিয়ে বেরিয়েছে। আজও সে পালিয়ে বাঁচতে চায়? যুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস তার নেই।
মৃত্তিকা সোহেলের প্রেমিকা। উভয় পরিবারের ইচ্ছে শিগগির তাদের বিয়েটা হয়ে যাক। বঙ্গবন্ধুর হত্যার ঘটনা না ঘটলে এতদিনে তারা বর-বধূ হয়ে বসতি করত।
মৃত্তিকা রহস্য করে জিজ্ঞেস করল-
কীরে মাথা নিচু করে আসিছ কেন? অন্য কোনো সুন্দরী তোর মনে ছায়া ফেলেনি তো? এখন তুই ফরেন মিনিস্ট্রির স্মার্ট অফিসার। কোনো ভয় নেই, আমি কখনও তোর স্বপ্টেম্নর বাধা হবো না। তোর সুখের জন্য নীরবে পথ ছেড়ে দেওয়ার সাহস আমার আছে।
সোহেল মৃত্তিকার দিকে মুখ তুলে তাকাল। চোখে জল টলমল।
ওমা, এ কী! পুরুষ মানুষ কখনও কাঁদে? আশঙ্কায় ভালোবাসায় থরোথরো কম্পিত মৃত্তিকা সোহেলের বেদনা তার বুকে আঁকড়ে ধরে। ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল-
কী হয়েছে, সোনা?
সোহেল মৃত্তিকার কম্পিত বুক থেকে তার চোখের দিকে মুখ তুলে তাকাল। ফিসফিস করে বলল-
ভয়।
কিসের ভয়?
জানি না।
তোর বাবা-মা, ভাইয়া-ভাবি সকলে আছে। আমি একা। তোকে একা রাখতে আমার ভয় করছে। বিয়ের তারিখ এগিয়ে আনি। বাবাকে বলি আগামী রোববার আমাদের বিয়ের আয়োজন করতে। প্লিজ, তুই না করিস না।
আগামী রোববার আমাকে দেশ ছাড়তে হবে।
তার মানে! মৃত্তিকা বিস্মিত। কেন?
আমাকে কানাডায় বাংলাদেশ এমবাসিতে ট্রান্সফার করেছে। আগামী রোববার ফ্লাইট।
মৃত্তিকা জেদি গলায় বলল- তোকে একা ছাড়ব না। আমরা আজই বিয়ে করব।
সোহেল মাটির দিকে চোখ নামিয়ে মৃদু গলায় বলল-
কানাডায় গিয়ে চাকরিতে জয়েন করেই বিয়ের ছুটি নিয়ে চলে আসব। স্যারের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারপর দু'জন একসঙ্গে ফিরে যাবো।
মৃত্তিকা সোহেলের বুকে মাথা রেখে আষাঢ়ের মেঘের মতো মুষলধারে কাঁদতে লাগল। মৃত্তিকার চোখের জল সোহেলের জামা ভিজে তার বুক ভিজছে। সোহেল আবেগতাড়িত হলো না। সোহেলের কঠিন বুক বেয়ে মৃত্তিকার নোনাজল গড়িয়ে পড়তে লাগল, যা সোহেলের হৃদয় স্পর্শ করতে পারল না।
বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের স্বাভাবিক বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু না হলে বিশ্বে বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা কলঙ্কিত হবে। যখন দেখল সামরিক সরকারের প্রেসিডেন্ট বঙ্গবন্ধুসহ সপরিবারে হত্যাকারীদের দেশের কোনো আদালতে এখন কিংবা পরে বিচারের আওতায় আনা যাবে না, এই বিষয়ে ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারি করে চাকরিতে খুনিদের পদোন্নতি, নানাবিধ পুরস্কার, সুযোগ-সুবিধা ও সম্মান জানাতে লাগল। যেন তারা জাতীয় বীর। অন্তঃসত্ত্বা নারী, শিশু, নবদম্পতিসহ সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে মহান বীরের কাজ করেছেন। বঙ্গভবনের চার দেয়ালের মধ্যে এই বীরদের যতো আস্টম্ফালন। দেশের জনগণের সঙ্গে মেশার সাহস তাদের হলো না।
এক বছর পার হতে চলল সোহেলের বিয়ের ছুটি নিয়ে ঢাকায় ফেরা হলো না। মৃত্তিকার সঙ্গে যোগাযোগ দিনে দিনে কমে আসছে। বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগও তেমনি। তাদের ফোন ধরা ছেড়ে দিয়েছে। সোহেল নিজ থেকে ফোন করে না। মৃত্তিকা পাগলের মতো ফোন করে যায়। দশবার ফোন করলে সোহেল হয়তো একবার ফোন ধরে। কোনো আবেগ নেই, দুঃখ নেই, যন্ত্রের মতো ফোন ধরে। শুধু কথা শোনে। কোনো উত্তর দিতে, কথা বলতে ইচ্ছে করে না।
মৃত্তিকা কান্নাকাটি করে। আর সহ্য করতে পারছে না। অবশেষে মৃত্তিকা তার সিদ্ধান্ত জানাল, সে কানাডায় আসছে সে কথা সোহেলকে জানিয়ে দিল।
সোহেল বেদনার সঙ্গে বলল- মৃত্তিকা, তুই খুব ভালো মেয়ে। তোর সঙ্গে ঘর বাঁধার স্বপ্টম্ন দেখেছি। আমি এখন পথ হারিয়ে ফেলেছি। আমি কোনোদিন বিয়ে করব না। আমি এখন আগের মতো নেই। ভিন্ন অচেনা পথে চলি। তোকে, বাবা-মা, ভাই-ভাবি, তোদের কাউকে চিনতে পারি না। তুই নিজের মতো করে তোর পথ খুঁজে নিস।
মৃত্তিকা ব্যাকুল কণ্ঠে বলল- পনেরো দিন পর তোমার সঙ্গে দেখা হচ্ছে। আমার টিকিট ভিসা সব রেডি। তোমাকে দেখার কথা বলার সুযোগ দিও, প্লিজ। তারপর তোমার যা ইচ্ছে সিদ্ধান্ত নিও। আমি কোনো বাধা দেব না।
সোহেল লাইন কেটে দিল। এক মাস হতে চলেছে বঙ্গবন্ধুর এক খুনিকে কানাডা বাংলাদেশ দূতাবাসে দ্বিতীয় সচিব পদে চাকরি দিয়ে পাঠিয়েছে। এখানে চাকরি করা আর সম্ভব নয়। তার যে লক্ষ্য কানাডা সে জায়গা নয়। লন্ডন হলো উপযুক্ত স্থান। সোহেল লন্ডনের একটি ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি প্রোগ্রামে অ্যাপ্লাই করেছিল, সে সুযোগ পেয়েছে। মৃত্তিকা আসার আগে তাকে কানাডা ছাড়তে হবে।
পাঁচ বছর পার হয়ে গেছে। সোহেলের পিএইচডি প্রোগ্রামের বিষয় 'তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর সেনা অভ্যুত্থানের কারণ'। সোহেল বিয়ে করেনি। বাংলাদেশের কারোর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখে না। তার ফোন নম্বর কাউকে দেয়নি। লন্ডনের দু-তিনজন শুধু জানে। এদের একজন লন্ডনের বিখ্যাত সুলতান রেস্তোরাঁর মালিক বঙ্গবন্ধু অন্তঃপ্রাণ তার অভিভাবক বেলাল চৌধুরী। তার জীবনের ধ্রুব লক্ষ্য বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিশোধ। এরই পরিকল্পনা তৈরি করা, সম্ভাবনা যাচাই ও প্রয়োগ নিয়ে সে বছরের পর বছর কাটিয়ে দিচ্ছে।
সোহেল সুলতান রেস্তোরাঁয় কাজ করে। রেস্তোরাঁর মালিক ধনী সিলেটি ব্যবসায়ী বেলাল চৌধুরীর সঙ্গে তার অদ্ভুত এক সখ্য গড়ে উঠেছে। স্বভাবে আচরণে শিক্ষায় বয়সে তাদের কোনো মিল নেই। দুটি কারণে বন্ধুত্ব হতে পারে। বেলাল চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার চেয়ে প্রতিদিন ৩০ রাকাত নফল নামাজ পড়ে আল্লার কাছে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেন। বেলাল চৌধুরীর বিবাহযোগ্য একটি সুন্দরী মেয়ে আছে। এ বিষয়ে সরাসরি কোনো কথা না বললেও দু-একবার আকার ইঙ্গিতে জানিয়েছে কোনো উচ্চশিক্ষিত ছেলের কাছে মেয়ের বিয়ে দিতে চায়। মেয়েটি যে সোহেলের প্রতি আগ্রহী সোহেল তা বুঝতে পারে।
রেস্তোরাঁর কাজ শেষ করে মাঝে মাঝে অনেক রাত পর্যন্ত বেলাল চৌধুরী সোহেলের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সুখ-দুঃখের গল্প করে। সোহেল একদিন বলল- বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে কী দিয়ে?
অস্ত্র দিয়ে।
প্রতিশোধও নিতে হবে অস্ত্র দিয়ে। খুনের বদলে খুন।
বেলাল চৌধুরী নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করে- তুমি কোনো পথ পেয়েছ?
পেলে আপনাকে জানাব। সে যে অনেক টাকার দরকার। টাকাই মূল সমস্যা। টাকা থাকলে অনেক পথ খুলে যায়। এত টাকা কোথায় পাবো?
টাকার চিন্তা তুমি করো না। টাকার চিন্তা আমার। বঙ্গবন্ধুরে জান দিয়ে ভালোবাসে, এমন হাজার হাজার মানুষ আমার সিলেটি গোষ্ঠীতে আছে। একেকজন পাঁচ হাজার পাউন্ড করে দেয় তাহলে কয়েক মিলিয়ন পাউন্ড হবে। আমার জীবনের সব উপার্জন দিয়ে দিবো।
এ বিষয়ে কারও সঙ্গে কোনো আলাপ করবেন না। আমি আপনি ছাড়া আর কেউ যেন জানতে না পারে।
অফিসপাড়ায় বেলাল চৌধুরীর রেস্তোরাঁ সুলতানের সুনাম আছে। লাঞ্চের সময় এত ভিড় হয় যে খাবারের জন্য লাইনে অপেক্ষা করতে হয়। এই পিক আওয়ারে কোনার টেবিলে গোলমাল বেধে গেল। সুঠাম স্বাস্থ্যের প্রায় সাড়ে ছ'ফুট লম্বা ৪০-৪৫ বয়সের এক ভদ্রলোক খাবারের বিল মেটাতে মানিব্যাগ খুঁজে হয়রান। সে খুব বিব্রত। মানিব্যাগ মিসিং হয়েছে। ম্যানেজার পুলিশে কল করতে চাচ্ছে। ভদ্রলোক করুণ মুখে মিনতি করছে- বিশ্বাস করো, আগামীকাল খেতে এসে বিল মিটিয়ে দেব।
এ অবস্থায় সোহেল ভদ্রলোকের মুখোমুখি বসল। আশ্বাস দিয়ে বলল- তোমার বিব্রত হবার কোনো কারণ নেই। এমনটা হতেই পারে। আমি সোহেল, ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ডে পিএইচডি প্রোগ্রামের স্টুডেন্ট। আমি এখানে পার্টটাইম কাজ করি। তুমি?
লোকটি হাত বাড়িয়ে বলল- আমি পিটার, ইউকে আর্মির এক্স সোলজার। সিগন্যাল এক্সপার্ট। চাকরি শেষ। এখন বেকার। চাকরি খুঁজছি।
সোহেল বলল- তোমাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে। আমরা কি বন্ধু হতে পারি?
পিটার হাত বাড়িয়ে বলল- আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি। আমাদের বন্ধুত্বের সেলিব্রেট হোক। আমার পক্ষ থেকে। কী ড্রিঙ্কস পছন্দ?
আজ যে ঠান্ডা, ভদকা হলে মন্দ হয় না।
সোহেল বলল- আমার রেস্তোরাঁয় আসবে। বন্ধু হিসেবে তোমার জন্য সবসময় একটা ড্রিঙ্ক ফ্রি অফার পাবে। তোমার সঙ্গে আমার বারবার দেখা হোক, সেটা আমার ইচ্ছে।
ছ'মাসের মধ্যে পিটারের সঙ্গে সোহেলের ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বে পরিণত হলো। পিটার বিনয়ী ভদ্র কৃতজ্ঞ এবং বন্ধত্বকে সম্মান করে। প্রতি সপ্তাহে সোহেলের সঙ্গে একবার করে দেখা হয়। আড্ডা হয়। এতদিনের পর্যবেক্ষণে সোহেলের মনে হয়েছে পিটারকে বিশ্বাস করা যায়।
সোহেল বলল- পিটার, আমাকে তোমার সাহায্য করতে হবে।
কী রকম সাহায্য?
পিটার হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করল- আমার কাছে টাকাপয়সা ধার চাইবে না তো?
সোহেল মৃদু হেসে বলল- টাকা চাইব না, অন্যকিছু চাইব।
বলে ফেল।
জানো তো, আমার থিসিসের বিষয় হচ্ছে তৃতীয় বিশ্ব মানে এশিয়া আফ্রিকার অনুন্নত দেশগুলোতে সামরিক অভ্যুত্থানের কারণ ও প্রতিকার বিষয়গুলো চিহ্নিত করা। মিডিয়া ও বিভিন্ন গবেষণালব্ধ জ্ঞান থেকে জানা যায়, অনেক সময় ভাড়াটে সৈন্যরা এসব অভ্যুত্থানে জড়িত থাকে। কোনো পক্ষের হয়ে টাকার বিনিময়ে তারা কাজ করে। এসব ভাড়াটে দু-তিনজন সৈন্যের ইন্টারভিউ আমার থিসিসের জন্য খুব প্রয়োজন। এই কাজটি না হওয়ায় আমি থিসিস সাবমিট করতে পারছি না। আমার এতদিনের পরিশ্রম স্বপ্টম্ন ব্যর্থ হতে চলেছে। তুমি কি এ ব্যাপারে আমাকে কোনো সাহায্য করতে পারবে? তুমি কাজটাকে আপাতত পার্টটাইম জব হিসেবে নিতে পারো। বেকার সময়টাকে কাজে লাগাও। বন্ধুর উপকার করো। মান্থলি ফোর থাউজ্যান্ড পাউন্ড। প্লাস ট্রাভেল অ্যালাউন্স এক হাজার পাউন্ড স্টার্লিং। চলবে?
চলবে। কতদূর সফল হতে পারব জানি না। তোমার স্বপ্টম্ন পূরণের চেষ্টা করব। আশা করছি এক মাসের মধ্যে কিছু তথ্য তোমাকে দিতে পারব। আমার এক ক্লোজ ফ্রেন্ডের সূত্রে শুনেছি তার এক আত্মীয় আফ্রিকার কোনো এক রাষ্ট্রে ভাড়াটে সৈন্য হিসেবে যুদ্ধ করতে গিয়েছিল। প্রচুর ধনসম্পদ নিয়ে দেশে ফিরেছে। ওদের মধ্যে অদ্ভুত এক কুসংস্কার আছে- যে ভাড়াটে সৈন্য হিসেবে একবার যায় সে দ্বিতীয়বার যায় না। হতে পারে একবার গিয়ে সে এত টাকা আয় করে দ্বিতীয়বার যাওয়ার প্রয়োজন হয় না।
দু'মাস হয় পিটারের সঙ্গে সোহেলের দেখা নেই। সোহেল ফোনে যোগাযোগ, কথা বলা বন্ধ রেখেছে। প্রতিদিনই মনে হয় আজ হয়তো পিটার আসবে। কিছু আশাবাদী তথ্য পাবে। যে সূত্র ধরে সে তার পরিকল্পনা সাজাতে পারবে। যত দিন যাচ্ছে সে অস্থির হচ্ছে। হতাশা বাড়ছে। এক দুপুরে ইউনিভার্সিটি থেকে হোটেলের কাজে ফিরে দেখে পিটার লাঞ্চ করছে। পিটার ক্ষমা চেয়ে বলল- এত ক্ষিধে পেয়েছে তোমার জন্য অপেক্ষা করতে পারিনি। সোহেল চাপা উত্তেজনায় চাপা স্বরে জিজ্ঞেস করল- রেজাল্ট?
পিটার চারপাশে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল- পজিটিভ।
সোহেল পিটারকে তার বাসায় নিয়ে এলো। পিটার বলল-
প্রতিটি ব্যক্তির নাম, ঠিকানা, কাজের ধরন, কোথায় কখন তাদের দেখা পাওয়ার সম্ভাবনা আছে, কোন সময় তাদের মেজাজ ভালো থাকে, কথা বলার সুযোগ পেতে পারো; এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে খোঁজখবর নিয়ে তোমার সহায়ক প্রোগ্রাম তৈরি করেছি।
প্রথমত, তুমি কোনো ক্যামেরা নেবে না। সাংবাদিকদের মতো কথা বলবে না। স্মার্ট বা ওভার স্মার্ট দেখাবে না। কোনো চালাকি ধরা পড়লে সোজা হাসপাতালে চালান হয়ে যাবে। তুমি একজন মহান যোদ্ধার কাছে যাচ্ছ। তুমি বোকাসোকা গরিব ছাত্র, তার সাহায্য না পেলে তুমি পাস করতে পারবে না। তোমার জীবন বরবাদ হয়ে যাবে। এ ভাবটা বজায় রেখে তার মন ভেজাতে হবে।
ঘণ্টা হিসেবে তারা ফি দাবি করতে পারে, তা তোমাকে দিতে হবে। কারোর বাসার ঠিকানায় তুমি খোঁজখবর করবে না, যাবে না। তাদের কখন কোথায় খোঁজখবর করবে তার সম্ভাবনাময় দিকনির্দেশনা তোমার জন্য তৈরি করেছি। তুমি যে গিয়েই তাদের দেখা পেয়ে যাবে, সে তোমাকে সাদর অভ্যর্থনা করবে এমনটা আশা করো না। এমনও হতে পারে দিনের পর দিন তুমি অপেক্ষা করলে কিন্তু সে তোমার সঙ্গে কথা বলল না। মারধর করে তাড়িয়ে দিল। যদি সফল হতে চাও ধৈর্য, অসীম ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হবে।
ব্যক্তি নং- ১ : টমাস মরিসন, হাইট ৬ ফুট ৫ ইঞ্চি। বয়স ৫২ থেকে ৫৪, ওজন ৯২ কেজি। চারটি যুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে। দুটি যুদ্ধ করেছে দেশের জন্য সেনাবাহিনীতে থাকাকালে। বাকি দুটি যুদ্ধ করেছে ভাড়াটে সৈন্য হিসেবে। তার সব মিশন সফল। হেলিকপ্টার চালনা থেকে আধুনিক সব ধরনের সামরিক অস্ত্রের ব্যবহারে সে একজন দক্ষ বিশেষজ্ঞ। সাহসী, কৌশলী, পরিস্থিতি বুঝে ক্ষিপ্র সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতায় কোনো যুদ্ধে সে পরাজয় হয়নি। সাহসী পদক্ষেপ ও যুদ্ধজয়ের বীরত্বের জন্য এত পদক পেয়েছে যে বারবার স্যালুট দিতে ইচ্ছে করে। সে প্যারাট্রুপার ও গেরিলা বিশেষজ্ঞ। তার দুর্বলতা : দামি মদ, জুয়া, সুন্দরী নারী। ভালো দিক : তিনজনের মধ্যে একমাত্র সেই দু'বার ভাড়াটে সৈন্য হিসেবে কাজ করেছে। অর্থাৎ সে কুসংস্কারে বিশ্বাসী নয়। সে বিবেকবান মানুষ। যত টাকাই দেওয়া হোক না কেন সে অন্যায়ের পক্ষে কাজ করে না। তার দেখা পাওয়ার সম্ভাবনা আছে রয়াল ক্যাসিনো, ব্লুবার্ড, কিংবা ব্ল্যাকহোল বার। এই তিনটি বারই তার বাড়ির কাছাকাছি। দশ থেকে পনেরো কিলোমিটারের মধ্যে। টমাস বললে দশজন টমাস এসে দাঁড়াবে। তোমাকে বলতে হবে বিগবস। বার জুয়ার আড্ডায় সকলে তাকে এ নামে চেনে।
পিটার একটি ম্যাপ মেলে বলল- এখানে টমাসের বাড়ির ঠিকানা লোকেশনসহ বার তিনটির লোকেশন এবং ২ নং ও ৩ নং ব্যক্তির যাবতীয় তথ্য দেওয়া আছে।
সোহেল বিস্মিত হয়ে বলল- তুমি দারুণ কাজ করেছ। আমার পিএইচডি ফেল।
পিটার বলল- আমার প্রফেশনাল অনুযায়ী কাজটি করেছি। তুমি খুশি হওয়াতে আমার ভালো লাগছে।

দুই.
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় সোহেল নাট্য গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত ছিল। সে ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয় করত, কিন্তু তার আগ্রহ ছিল মেকআপের প্রতি। সামান্য পরিবর্তনে একজন মানুষের চেহারা আমূল পরিবর্তন হয়ে যায়। নিজেকে নিজের কাছে অচেনা মনে হয়। মেকআপের কোর্স করে সে হয়ে উঠল তার নাট্য গ্রুপের মেকআপ ম্যান। একদিন মেকআপ নিয়ে সোহেল বাসায় ফিরল। ডোরবেল বাজিয়ে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে রইল। ওর ছোট বোন দরজা খুলে জিজ্ঞেস করল- কাকে চান?
সোহেল জিজ্ঞেস করল- সোহেল আছে?
বোন বলল- ভাইয়া ভার্সিটি থেকে এখনও ফেরেনি। ভাইয়াকে কিছু বলতে হবে?
মুখ থেকে মেকআপ খুলতে খুলতে সোহেল বলল- বলবেন, সোহেলের খোঁজে সোহেল এসেছিল।
বোন বিস্মিত। আর সে কী হাসাহাসি! বোন তাকে চিনতে পারেনি। নিজের প্রতি সোহেলের আস্থা বেড়ে যায়। দাড়ি গোঁফ রাখা এখন ফ্যাশন। তা ছাড়া চেহারা লুকাতে সাহায্য করে। সোহেল ইনোসেন্ট ছাত্রের ছদ্মবেশ নিলো। সরল সহজ, ইন্টেলেকচুয়ালদের মতো চুল ও পোশাক কিছুটা এলোমেলো। থিসিস বিষয়ে দুটি বই ও তার থিসিস পেপারের জেরক্স কপি, নোটবুক কলম নিয়ে রওনা দিলো। এর আগে একদিন দিনের বেলায় বার তিনটি রেকি করে এসেছে। রাত দশটায় সে রয়াল ক্যাসিনোতে প্রবেশ করল। তার মতো নিরীহ ছাত্র সাধারণত ক্যাসিনোতে আসে না। এক কোণে খালি টেবিল দেখে সে বসল। বোকার মতো ইতিউতি তাকাতে লাগল। একজন রূপবতী ওয়েট্রেস কাছে এসে জিজ্ঞেস করল-
বলুন স্যার, আপনার জন্য কী করতে পারি?
সোহেল একটা ড্রিঙ্কসের অর্ডার দিল। ড্রিঙ্ক সার্ভ করে ওয়েট্রেস জিজ্ঞেস করল- স্যারের কি আর কোন সার্ভিস লাগবে?
সোহেল নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল- বিগ বস কি আজ এসেছেন?
ওয়েট্রেস কোনো উত্তর না দিয়ে ফিরে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়িয়েছে, সোহেল পঞ্চাশ পাউন্ডের নোট বের করল।
এসেছেন। তার রুমে গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে আছে। এক ঘণ্টার আগে দেখা হবে না।
সোহেল তার সৌভাগ্যকে মনে মনে ধন্যবাদ দিল। প্রথম দিনেই দেখা হতে যাচ্ছে। এক ঘণ্টা পার হয়ে গেছে, দেড় ঘণ্টা ছুঁইছুঁই করছে। ওয়েট্রেসের দেখা নেই। সোহেলের টেনশন বাড়ছে। এমন সময় ওয়েট্রেস এসে হাজির হলো। জিজ্ঞেস করল-
তুমি তার সঙ্গে দেখা করতে চাও কেন?
সোহেল বলল- আমি অক্সফোর্ডের ছাত্র। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে ঘন ঘন সামরিক অভ্যুত্থানের কারণ ও প্রতিকার বিষয়ে থিসিস করছি। বিগ বসের সাহায্য না পেলে আমার ক্যারিয়ার শেষ।
ওয়েট্রেস ফিরে এসে বলল- এসো।
সোহেল পঞ্চাশ পাউন্ডের আরেকটি নোট এগিয়ে দিল। মেয়েটি বকশিশ গ্রহণ করল না। বলল- আমি জানতাম না তুমি একজন ছাত্র।
সোহেল একজন দৈত্যের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। যেটুকু তথ্য জানা ছিল সে তুলনায় অনেক ইয়াং। সোফায় বসে চুরুট টানছে। পাশে বসে এক অপূর্ব সুন্দরী তার বেশবাস ঠিক করছে। সোহেলকে দেখে বিগবসকে বলল- ডার্লিং, আমি যাই।
বিগবস হাত নাড়ল। সোহেলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল- এবার বলো, আমার মতো খারাপ লোকের কাছে তোমার কী প্রয়োজন?
সোহেল বলল- আমি ছাত্র। থিসিস করছি। আপনার সহযোগিতা না পেলে আমি থিসিস শেষ করতে পারছি না।
মুহূর্তে একটা চড় এসে পড়ল সোহেলের গালে। সেই চড়ের ওজন কত ছিল তা বুঝে ওঠার আগে চেয়ার উল্টে মেঝেতে ছিটকে পড়ে সোহেল জ্ঞান হারাল।
পাঁচ দিন হাসপাতালে থাকতে হলো। সোহেলের একটা দাঁত খোয়া গেছে। পিটার জিজ্ঞেস করল-
তুমি ছদ্মবেশ নিতে গেলে কেন? তোমাকে গুপ্তচর মনে করে রেগে গেছে। চালাকি করা তোমার ঠিক হয়নি। যাক অল্পের ভেতর গেছে। বিগবসের কাছে আর যেও না। বাকি যে দু'জন আছে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারো।
এক মাস বিশ্রাম নিয়ে সোহেল আবার রয়াল ক্যাসিনোতে গেল। সেদিনের সেই টেবিলটি বেছে নিল। সেদিনের সেই তরুণী ওয়েট্রেস এসে জিজ্ঞেস করল- তুমি আবার এসেছ?
সোহেল পঞ্চাশ পাউন্ডের নোট বের করে বলল- বিগবস কি আজ এসেছে?
ওয়েট্রেস নোটটি নিল না। বলল- বিগবস দশ দিন ধরে আসছে না। সম্ভবত সে অসুস্থ।
তুমি কি আমার একটা উপকার করবে?
সোহেল কাকুতি কণ্ঠে বলল- তাকে আমার খুব দরকার। প্লিজ, তার সঙ্গে দেখা করার একটা ব্যবস্থা করে দাও। আমি চিরকাল তোমার কথা মনে রাখব। সোহেল একশ পাউন্ডের পাঁচটি নোট তরুণী ওয়েট্রেসের দিকে এগিয়ে দিলো।
তোমার একটা দাঁত পড়ে শিক্ষা হয়নি? তোমার কোনো ক্ষতি হলে সে দায় আমার না মনে রেখো। আমার পরামর্শ হলো তার সঙ্গে তোমার দেখা না করাই ভালো।
আমার জন্য চিন্তা করো না। তোমার কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ।
তরুণীটি একটা ফোন নাম্বার দিয়ে বলল- তিন দিন পর এই নাম্বারে ফোন করে জেনে নেবে বিগবসের সঙ্গে তোমার দেখা হওয়া সম্ভব কিনা। পাঁচশ পাউন্ড ফেরত দিয়ে বলল- দেখা সম্ভব হলে সেদিন টাকাটা দিও।
বিগবস অসুস্থ। ইজিচেয়ারে আধশোয়া অবস্থায় বিশ্রাম নিচ্ছে। সোহেলকে বলল- আমার সঙ্গে কথা বললে প্রতি ঘণ্টার চার্জ একশ পাউন্ড। রাজি?
সোহেল বলল- রাজি।
বিগবস বলল- শুরু করো। তুমি কোন দেশের লোক?
বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ? সেটা আবার কোন দেশ! এর আগে নাম শুনিনি।
বাংলাদেশ কমনওয়েলথভুক্ত একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। গ্রেটার ইন্ডিয়া ব্রিটিশ কলোনি ছিল। ইন্ডিয়া ভাগ হয়ে ইন্ডিয়া ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র হয়। ইস্ট পাকিস্তান ও ওয়েস্ট পাকিস্তান মিলে হয় পাকিস্তান। ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে ক্ষমতার দাবিদার হয়। পাকিস্তানের সামরিক সরকার সংবিধান অনুসারে আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে অস্বীকার করে পূর্ব পাকিস্তানে জেনোসাইড শুরু করে। আমাদের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান তখন পাকিস্তানের ভাবী প্রধানমন্ত্রী। তিনি বাঙালিদের আবাসভূমি পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র ঘোষণা করেন। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের ফাদার অব দ্য নেশন।
বিগ বস হঠাৎ উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। তার সেই ঘটনা মনে পড়ে যায়। ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে জর্জ হ্যারিসনের বিটলস দল ও ইন্ডিয়ান মিউজিশিয়ানরা মিলে বিশাল কনসার্ট করে ছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ফান্ড সংগ্রহ করতে এবং বিশ্বকে বাংলাদেশে পাকিস্তানি আর্মির জেনোসাইড, এক কোটি শরণার্থীর মানবেতর জীবন জানাতে। মানবতা জাগাতে। বিগবস তার কয়েকজন বন্ধুসহ সেই কনসার্টে ছিলেন।
বিগবস বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল- সেই পুরোনো ঘটনা আমাকে বলছ কেন?
বাংলাদেশ আর্মির একটি দল আমাদের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করেছে। হত্যা করেছে তার স্ত্রী, পুত্র, পুত্রবধূ। অন্তঃসত্ত্বা নারী, দশ বছরের শিশুসহ নিকটাত্মীয় ২৪ জন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করেছে।
আদালতে যাও। আইনের আশ্রয় নাও।
সামরিক সরকার সকল আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের পথ বন্ধ করে দিয়েছে। সামরিক সরকারের প্রেসিডেন্ট ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারি করে এবং জেনারেল জিয়া সংবিধান সংশোধন করে ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জাতীয় সংসদে পাস করে বঙ্গবন্ধু ও অন্যদের হত্যার বিচার পাওয়ার মৌলিক অধিকার চিরতরে বন্ধ করে দিয়েছে। হত্যাকারীদের বর্তমানে বা ভবিষ্যতে বিচারের আওতায় আনা যাবে না।
আবেগে কান্নায় সোহেলের কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে। কিছুটা সময় বিষণ্ণ নীরবতায় কেটে যায়। বিগবস মৃদু স্বরে বলল- ভেরি স্যাড।
সোহেল বলল- বিচারের পথ খোলা থাকলে তোমার কাছে আসার প্রয়োজন হতো না।
তুমি কী করতে চাও?
জাতির পিতাকে যারা হত্যা করেছে আমি তাদের মৃত্যু দেখতে চাই। হত্যার প্রতিশোধ নিতে চাই। হত্যার প্রতিশোধ যতদিন নিতে না পারব দেশে ফিরব না। চাকরিতে জয়েন করব না। প্রেমিকা স্ত্রী হবে না। বাবা-মা, ভাইবোন কারও সঙ্গে যোগাযোগ রাখব না। তুমি আমার যে দাঁত ভেঙেছ তা-ও বাঁধাই করব না।
তোমার পরিকল্পনা শুনি।
হত্যাকারীরা কে কোথায় আছে, তাদের সকল বর্তমান তথ্য, তাদের ঠিকানা, ছবি, ফোন, কর্মস্থল, তাদের গতিবিধি, ম্যাপ এবং তোমাদের পারিশ্রমিক আমার কাছ থেকে পাবে। তোমাদের পাসপোর্ট ভিসা, হত্যার পরিকল্পনা, প্রয়োজনীয় অস্ত্র, মিশন সাকসেসফুল করা তোমাদের কাজ। শুনেছি তুমি কোনো মিশনে ব্যর্থ হওনি।
তোমার এ কাজের জন্য বিশাল অঙ্কের টাকা দরকার। তোমাকে দেখে মনে হয় না তুমি তা দিতে পারবে।
তোমার ডিমান্ড বলো। দিতে পারলে হবে, নইলে বিদায়।
ঠিক করে ছিলাম ভাড়াটে সৈনিক হিসেবে আর কোনো কাজ করব না। আমি খুব টাকার ক্রাইসিসে আছি। তোমাকে দেখে মায়া হচ্ছে। এ অন্যায় বিচারহীনতার সমাধান হওয়া উচিত। খুব কৌতূহল জাগছে তোমার নেতা বঙ্গবন্ধুর জন্য। যার জন্য জীবনের সব মৌলিক চাহিদা বিসর্জন দিয়ে কঠিন প্রতিজ্ঞা পালন করে চলেছ। এমনটা বাস্তবে হয় আমার জানা ছিল না।
তোমার অ্যামাউন্ট বলো।
দলে আমরা ছ'জন থাকি। সিক্স মিলিয়ন পাউন্ড। অর্ধেক দেবে অ্যাডভান্স। কাজ শেষে বাকি অর্ধেক। মিশনের কোড নেম বলো?
মিশন বাংলাদেশ।
ওকে। অ্যাকাউন্টে তিন মিলিয়ন জমা হলে কাজ শুরু হবে। তোমার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ থাকবে না। দু'মাস সময়। আমাদের সম্পর্কে কিছু জানতে চাইবে না। খোঁজখবর করবে না। মিশন বাংলাদেশ, চিয়ার্স!

বিষয় : গল্প মিশন বাংলাদেশ সিরাজউদ্দিন আহমেদ

মন্তব্য করুন