বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা জলে ফেলা নিয়ে সমালোচনার অন্ত নেই। এরই মধ্যে জানা গেল, এলএনজি বা তরল প্রাকৃতিক গ্যাসকে রূপান্তরে (রিগ্যাসিফিকেশন) দৈনিক গচ্চা যাচ্ছে ২ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে এই জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় কমে গেছে আমদানি। এতে কক্সবাজারের মহেশখালীর অদূরে গভীর সমুদ্রে স্থাপন করা দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে সরবরাহ কমে যাওয়ায় উৎপাদন অর্ধেক হয়ে গেছে। তবে চুক্তি অনুসারে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে সক্ষমতা অনুযায়ী।

এলএনজি টার্মিনাল বা ফ্লটিং স্টোরেজ রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিটে (এফএসআরইউ) তরল গ্যাসকে পূর্বের গ্যাসীয় অবস্থায় রূপান্তর করে দেশের অভ্যন্তরে তথা জাতীয় গ্রিডে পাঠানো হয়। আমদানি কমে যাওয়ায় ইউনিট দুটির ক্ষমতার অর্ধেক ব্যবহার না হলেও দিনে প্রায় ২ কোটি টাকা (২ লাখ ডলার) ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে পেট্রোবাংলাকে। সূত্র জানায়, ১০০ কোটি ঘনফুটের জন্য দুই এফএসআরইউর দৈনিক রিগ্যাসিফিকেশন চার্জ প্রায় ৪ কোটি ২৭ লাখ টাকা (সাড়ে ৪ লাখ ডলার)। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিলারেট এনার্জির চার্জ ২ কোটি ২৫ লাখ টাকা (২ লাখ ৩৭ হাজার ডলার) এবং দেশীয় সামিট গ্রুপের এফএসআরইউর জন্য চার্জ ২ কোটি ৬ লাখ টাকা (দুই লাখ ১৭ হাজার ডলার)। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় জুলাই মাস থেকে স্পট মার্কেট (খোলাবাজার) থেকে এলএনজি কেনা বন্ধ আছে। এতে এলএনজির সরবরাহ কমে গেছে। তাই দুই এফএসআরইউ থেকে দিনে কম-বেশি ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হচ্ছে, যা সক্ষমতার অর্ধেক। তবে রিগ্যাসিফিকেশন না করলেও বাকি সক্ষমতার জন্য ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে প্রায় ২ কোটি টাকা পাচ্ছে এফএসআরইউর উদ্যোক্তারা।

বিদ্যুতেও ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে অনেক সমালোচনা আছে। চাহিদার চেয়ে উৎপাদন সক্ষমতা বেশি হওয়ায় অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র বছরের একটি উল্লেখযোগ্য সময় বন্ধ থাকে। তবে চুুক্তি অনুযায়ী তাদের ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়। গত ১১ বছরে বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা পেয়েছে সরকারের কাছ থেকে।

ঘাটতি মেটাতে ২০১৮ সালে এলএনজি আমদানি শুরু করে বাংলাদেশ। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ দ্রুত সরবরাহ আইনের আওতায় বিনা টেন্ডারে দুটি কোম্পানিকে এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কাজ দেওয়া হয়। দৈনিক ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস রিগ্যাসিফিকেশন ক্ষমতার এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালটি ২০১৮ সালের আগস্ট মাসে কার্যক্রম শুরু করে। সামিটের টার্মিনাল অপারেশনে আসে ২০১৯ সালের ৩০ এপ্রিল। চালুর প্রথম দিকেও পাইপলাইন সীমাবদ্ধতায় দীর্ঘদিন পূর্ণ সক্ষমতায় গ্যাস নিতে না পারলেও দুই এফএসআরইউকে পুরো চার্জ পরিশোধ করতে হয়েছিল পেট্রোবাংলাকে।

কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, বিনা দরপত্রে সমঝোতার মাধ্যমে এই চুক্তিগুলো করা হয়েছে। ফলে চার্জ নির্ধারণে দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হয়েছে। রিগ্যাসিফিকেশন করুক বা নাই করুক পুরো চার্জ দিতেই হবে এমন শর্ত সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। তারপরও চুক্তি হয়েছে। বছর বছর শত শত কোটি টাকা গচ্চা যাচ্ছে। প্রতিযোগিতা থাকলে এমন হওয়ার সুযোগ কম ছিল।

জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংস্থাটির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, তাঁরা চুক্তিপত্র যাচাই করে রিগ্যাসিফিকেশন চার্জ সমন্বয়ের বিষয়টি বিবেচনা করছেন।