বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি থাকবে কিনা- এ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনা উঠেছে। আমার মতে, বুয়েটসহ যে কোনো উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বর্তমানে ছাত্র রাজনীতি বাদ দেওয়ার অর্থ হচ্ছে, মধ্য ও বামপন্থি ছাত্র রাজনীতিই বাদ দেওয়া। কারণ শুধু ঘোষণা দিয়ে মিটিং-মিছিল নিষিদ্ধ করে মধ্যপন্থিদের নিষ্ফ্ক্রিয় করতে পারলেও ডানপন্থি-প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতি থামানো যাবে না। কারণ, ডানপন্থি ছাত্র সংগঠনের রাজনীতি বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মিটিং-মিছিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কথিত মিটিং-মিছিলের বাইরেও রাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া বা টিকে থাকার উপায় গত কয়েক দশকে তারা বের করে নিয়েছে।

এটা ঠিক, বুয়েটসহ অন্যান্য উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতি আগের মতো ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারছে না। এ নিয়ে আমাদের মধ্যে শক্ত কোনো মতবিরোধ নেই। কিন্তু আমরা যতটা সরলভাবে ছাত্র রাজনীতি বাদ দিতে বলছি; বিষয়টা ততটা সরল নয়।

মোটা দাগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিন ধরনের ছাত্র রাজনীতি কাজ করে। যেমন- ডান (ছাত্রশিবির, ছাত্র আন্দোলন), বাম ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রফ্রন্ট, ছাত্র ফেডারেশন) ও মধ্যপন্থি (ছাত্রলীগ, ছাত্রদল)। মধ্যপন্থিদের রাজনীতি বিশ্ববিদ্যালয়ে কখনোই স্থায়ী কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না। বিশেষত সাধারণ ছাত্রদের মনে। সাধারণ ছাত্ররা মধ্যপন্থি দলীয় আদর্শ সাধারণত পরিবার বা এলাকা থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে গ্রহণ করেই বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে। আর নব্বইয়ের পর থেকে অভিভাবক সংগঠন আওয়ামী লীগ বা বিএনপি শুধু ক্ষমতায় থাকলেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগ বা ছাত্রদল সক্রিয় থাকে বা থাকতে পারে। সরকার বা কেন্দ্রের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য সবসময় মিটিং-মিছিলে সীমাবদ্ধ থাকে এদের মূল রাজনীতি। ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ বা ছাত্রদল না করেই ভবিষ্যতে মূল রাজনৈতিক দল যেমন আওয়ামী লীগ বা বিএনপির রাজনীতি করবে- এমন চিন্তা করা ছাত্রের সংখ্যাও নেহাত কম নয়।

অস্বীকার করা যাবে না- ছাত্র রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন আগেও ছিল, এখনও আছে। ছাত্র রাজনীতির এই নেতিবাচক চরিত্রের ভেতর থেকেই জাতির প্রয়োজনে ইতিবাচক চরিত্রটি মাঝেমধ্যে বের হয়ে আসে বা আসত। কিন্তু মৌলবাদী ছাত্র রাজনীতিই ছাত্রদের গুণগত মানকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে শিক্ষকদের দলীয় লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি। বর্তমান জাতীয় রাজনীতির বাস্তবতায় প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মীয় ছাত্র রাজনীতি ছত্রভঙ্গ হলেও ছাত্রদের মনস্তাত্ত্বিক জায়গায় দীর্ঘদিনে ব্যাপক পরিবর্তন এনে দিয়েছে। বর্তমানে তারা ছত্রভঙ্গ হলেও মূলধারা বা মধ্যপন্থি ছাত্র সংগঠনে অনুপ্রবেশের মাধ্যমে হলেও তাদের নিজেদের মনস্তাত্ত্বিক উপস্থিতি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। সুবিধা ও স্বার্থে জনপ্রিয় ছাত্র সংগঠনগুলোতে পদের ব্যাপক প্রতিযোগিতা থাকার কারণে তারা সরকারের অংশীদার বামপন্থি ছাত্র সংগঠনেও অবস্থান নিচ্ছে। এই বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলো এখনও আদর্শের কথা বলছে। কিন্তু কর্মসূচির ক্ষেত্রে আদর্শের তেমন কোনো প্রতিফলন নেই। প্রান্তিক বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা 'ছাত্র সাংবাদিক' হিসেবে হলেও টিকে থাকার চেষ্টা করছে।

আমরা জানি, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে বেশি অধঃপতন হয়েছে নিম্নমানের শিক্ষক নিয়োগে। আর সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে ছাত্র সংগঠনের ব্যাপক হস্তক্ষেপ শুরু হয় ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে। ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগরের মতো কেন্দ্রে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই হস্তক্ষেপ খুব সূক্ষ্ণভাবে হলেও রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রান্তে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মহামারি আকার ধারণ করেছিল। আমার পর্যবেক্ষণে, বাংলাদেশে ইসলামী ছাত্রশিবির হচ্ছে প্রথম ছাত্র সংগঠন যেটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে সাংগঠনিকভাবে ব্যাপক হস্তক্ষেপ শুরু করে ২০০১ সালের পর থেকে।

মধ্যপন্থি বা বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলোর কর্মীরাও যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়নি, তা বলব না। কিন্তু এগুলো ছিল বিচ্ছিন্ন ঘটনা, মানে ছাত্র সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক হস্তক্ষেপ ছিল না। ধর্মীয় এই ছাত্র সংগঠন তাদের মতাদর্শের শিক্ষকদের সঙ্গে আঁতাত ও শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে শিক্ষক হত্যা থেকে শুরু করে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস, নিজেদের কোচিং সেন্টারের গাইড বই থেকে প্রশ্ন কমন ফেলানো, এমনকি বিভাগীয় পরীক্ষায় ছাত্রদের রেজাল্ট ম্যানিপুলেশনসহ এমন কোনো অন্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই যা তারা করেনি। ছাত্র সংগঠনটি শিক্ষকদের সঙ্গে যোগসাজশে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোচিং বাণিজ্য করে ভর্তি প্রক্রিয়ায়ও পরোক্ষভাবে হস্তক্ষেপ করে।

ডানপন্থি ছাত্র সংগঠনটি এখন শুধু দেশের প্রান্তিক বিশ্ববিদ্যালয়েই সীমাবদ্ধ নেই; কেন্দ্রেও ছড়িয়ে পড়েছে, ভেতরে ভেতরে। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন বাম আর মধ্যপন্থি মিলেও যদি প্যানেল দেয় ডাকসু নির্বাচনে; ডানদের কাছে ফেল করার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে।

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিসিএসকেন্দ্রিক পড়াশানোকে কেন্দ্র করেও এদের একটা সাংগঠনিক অবদান আছে। এটিকে শিক্ষায় আমলাতান্ত্রিক হস্তক্ষেপের সাম্প্রদায়িক ভ্রাতৃত্ববন্ধনের একটি নমুনা হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। এই ধর্মীয় সংগঠনটি একমাত্র ছাত্র সংগঠন, যার প্রথম বর্ষের একজন কর্মীও শিক্ষকের কাছে কোনো নৈতিক বা আদর্শিক শিক্ষা গ্রহণ করে না, যা অনেকটা সাংগঠনিক বৈশিষ্ট্যে। এদের অনেক সময় দেখেছি উল্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদেরই 'ধর্মীয়' শিক্ষার 'দাওয়াত' দিতে।

সত্তর ও আশির দশক পর্যন্ত মধ্যপন্থি ছাত্র রাজনীতির ভারসাম্য হতো বামপন্থি ছাত্র রাজনীতি ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড দিয়ে। এখন ডানপন্থি ধর্মীয় রাজনীতি জনপ্রিয় হওয়াতে সেখানে ভারসাম্যের বদলে পরিস্থিতির অবনতিই হচ্ছে। যেখানে বামপন্থি ছাত্র রাজনীতির দলীয় নীতি শিক্ষা-বাণিজ্যের বিরুদ্ধে, সেখানে শিক্ষা-বাণিজ্য উল্টো ডানপন্থিদের অন্যতম সাংগঠনিক শক্তি ও অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার। মধ্যপন্থিদের বিরুদ্ধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুর্বৃত্তায়ন ও অর্থ উপার্জনের যে অভিযোগ; তার সঙ্গে ডানপন্থিদের শিক্ষা-বাণিজ্য নতুন ও ভয়ংকর সংযোজন, যা শিক্ষার মানকে আরও বেশি প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত করবে। আরও স্পষ্ট করে বললে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ডানপন্থি ছাত্র রাজনীতি ছাত্র-শিক্ষক জ্ঞান আদান-প্রদানে সরাসরি বাধা তৈরি করে।

আমরা বলছি না, বুয়েটে অধিকাংশ ছাত্র ডানপন্থি মতাদর্শের। দেশের বিজ্ঞানের এই শীর্ষ মেধাবী ছাত্ররা অধিকাংশই সাধারণ, নিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল। এখনও কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই বুয়েটে মেধাতালিকা অনুযায়ী শিক্ষক নিয়োগ হয়, বিশেষত কোর ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে। অনেক মেধাবী ছাত্র-শিক্ষক দেশের বাইরে চলে গেলেও যারা থেকে যায়, তারাও কম মেধাবী নয়। তাদেরও দেশের সেরা মেধাবী বলা যায়। কিন্তু দেশের সেরা সব মেধাবী ছাত্র-শিক্ষক নিয়ে বিশ্ব র‌্যাঙ্কিংয়ে এমন নাজুক পরিস্থিতি পৃথিবীতে ব্যতিক্রম। আমার ধারণা, বিশ্ব র‌্যাঙ্কিংয়ে বুয়েটের আশানুরূপ অবস্থানে থাকতে না পারার কারণটা আসলে দর্শনগত ও সাংস্কৃতিক দৈন্য থেকে উৎসারিত। এখন যদি ছাত্র রাজনীতি বন্ধের নামে কার্যত মধ্য ও বামপন্থি ছাত্র রাজনীতির পথই রুদ্ধ হয়, তাহলে সামনে আরও নেতিবাচক পরিস্থিতির জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

আলতাফ হোসেন রাসেল :পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব গ্লাসগো অ্যাডাম স্মিথ বিজনেস স্কুল, যুক্তরাজ্য
rasel_stat71@yahoo.com