বাংলাদেশের পোশাক শিল্প তার যাত্রাপথে অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আজ ৪২ বিলিয়ন বার্ষিক রপ্তানি টার্নওভারের শিল্পে পরিণত হয়েছে। পোশাক শিল্পের দৃপ্ত পদচারণা, শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে গৌরবময় পরিচিতি এবং স্থানীয় পর্যায়ে আর্থসামাজিক প্রতিটি ক্ষেত্রে সফলতা এনে দিয়েছে, তা দৈবক্রমে হয়নি। এটি মূলত সম্ভব হয়েছে গত ৪০ বছরে কারখানাগুলোর আধুনিকীকরণ, টেকনিক্যাল আপগ্রেডেশন; সেই সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, পরিবেশগত টেকসই উন্নয়ন, কমপ্লায়েন্স ইস্যু প্রভৃতি ক্ষেত্রে শিল্প যে অনন্য অগ্রগতি অর্জন করেছে, সেগুলোর কারণে।
পোশাক শিল্পের শীর্ষ সংগঠন হওয়ায় বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি-বিজিএমইএ সম্প্রতি পরিবেশ, সাসটেইনেবিলিটি এবং সুশাসন (ইএসজি) প্রভৃতি অগ্রাধিকারকে গুরুত্ব দিয়ে শিল্পের জন্য নতুন রূপকল্প ঘোষণা করেছে।
বিজিএমইএর লোগো নতুন করে ডিজাইন করা এবং রূপকল্প পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রে আমাদের প্রথম ও প্রধান অগ্রাধিকারই ছিল বিজিএমইএর ঐতিহ্য সমুন্নত রাখা। প্রতিষ্ঠানটি সূচনালগ্ন থেকেই ধারাবাহিকভাবে নেতৃত্ব দানকারী অগ্রজ নেতাদের মাধ্যমে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রপ্তানি আয়কারী খাতটিকে সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছে। বিগত দশকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রগুলোতে এ শিল্প অভূতপূর্ব অগ্রগতি অর্জন করেছে এবং শিল্প যে দায়িত্ববোধ থেকে স্বতঃস্ম্ফূর্ত হয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করতে সক্ষম ও দৃঢ়প্রত্যয়ী- সে ব্যাপারে সফলভাবে নিজেকে প্রমাণ করেছে। এই প্রক্রিয়ায় বিজিএমইএতে ধারাবাহিকভাবে নেতৃত্ব দানকারী নেতারা শত প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেও দিকনির্দেশনা দিয়ে শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যেতে অবদান রেখেছেন।
লোগোতে আমরা এ বিষয়টি সমুন্নত ও অক্ষুণ্ণ রাখতে চেয়েছি। তাই নতুন লোগোর মৌলিক কালার প্যালেট অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। পার্থক্য হলো, এখন আমাদের লোগোর রং ও প্রতীকের পেছনে একটি গল্প আছে।
বিজিএমইএর নতুন লোগোকে বলা হচ্ছে 'নাইন ডট'। এই ডটগুলো বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তনশীল গতি-প্রকৃতির সঙ্গে ব্যবসার কৌশল সমন্বয় সাধনের ক্ষেত্রে একটি সাধারণ বৈশ্বিক অভীষ্ট অর্জনের পথে সব স্টেকহোল্ডারকে একত্রিত করবে।
এই ডটগুলো কী প্রতিনিধিত্ব করে :আমরা ৯টি ডটকে এমনভাবে সাজিয়েছি, যেখানে প্রথম ডট বা বিন্দু প্রতিনিধিত্ব করছে জনগণকে। জনগণ হচ্ছে প্রথম অগ্রাধিকার। শিল্পের ভেতরে-বাইরে ব্যাপক অর্থে বাংলাদেশের প্রত্যেক মানুষের উন্নয়নে এবং মানব জাতির কল্যাণে কাজ করাই আমাদের মূলমন্ত্র। এখানে অন্তর্নিহিত বিষয় হচ্ছে, দেশের প্রায় ৪০ লাখ পোশাক কর্মীর অবস্থার উন্নয়ন ঘটানো; জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখা এবং সাধারণ মানুষের ভাগ্যের উন্নতি ঘটানো আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য।
দ্বিতীয় বিন্দুটি অন্তর্ভুক্তিকরণ বোঝায়, যা ইতোমধ্যে বাংলাশের পোশাক শিল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে সর্বজনবিদিত। দেশের সর্ববৃহৎ আনুষ্ঠানিক খাত, যার কর্মীদের মধ্যে ৬০ শতাংশই নারী; সে খাতের নিয়োগকর্তা হিসেবে আমরা কোনো ধরনের বৈষম্য ছাড়াই প্রতিটি কণ্ঠের আওয়াজ শুনতে ও প্রত্যেক মানুষের কাছে যেতে চাই।
তৃতীয় বিন্দুটি হচ্ছে স্বচ্ছতা। কারখানার নিরাপত্তা এবং ভ্যালু চেইনে দায়িত্বের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যে এগিয়ে আছে, তা আজ দৃশ্যমান। একটি বিশ্বস্ত, ফ্লেক্সিবল ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার অন্যতম প্রধান শর্ত হচ্ছে দায়বদ্ধতা ও তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিতকরণ।
লোগোর চতুর্থ বিন্দু হচ্ছে অবকাঠামো সম্পর্কিত। গত এক দশকে আমরা আমাদের কারখানাগুলো নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব এবং শ্রমিকবান্ধব করার ক্ষেত্রে ব্যাপক অগ্রগতি সাধন করেছি। ফলে পোশাক খাতের জন্য কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা অতীতের একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কিন্তু আমরা এখানেই থেমে যেতে পারি না।
লোগোর এই অন্তর্নিহিত থিমটি আমাদের অত্যাধুনিক নিরাপত্তামূলক সরঞ্জামসহ নিরাপদ, টেকসই এবং গ্রিন কারখানা গড়ে তুলতে অনুপ্রাণিত করবে।
লোগোর পঞ্চম বিন্দুটি উদ্ভাবন নির্দেশ করে। শিল্পের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার মূলমন্ত্র হচ্ছে উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব (ফোরআইআর) অটোমেশন এবং ভার্চুয়াল প্রোটোটাইপিংয়ের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে। বৈশ্বিক প্রবণতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে ইতোমধ্যে অনেক কারখানা দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা প্রভৃতি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করেছে।
যখন আমাদের কারখানাগুলো রপ্তানির জন্য অত্যাধুনিক ডিজাইনের হাই-এন্ড পোশাক তৈরি করতে নিজস্ব উদ্যোগে পণ্য উদ্ভাবন ও ডিজাইন নিয়ে কাজ করছে, তখন বিজিএমইএ তার উত্তরাস্থ বিজিএমইএ কমপ্লেক্সে একটি 'সেন্টার ফর ইনোভেশন, এফিশিয়েন্সি এবং ওএসএইচ' স্থাপন করেছে, যা উদ্ভাবন ও উৎকর্ষ বাড়াতে শিল্পকে সহায়তা করবে।
ষষ্ঠ বিন্দুটি 'সার্কুলারিটি' সম্পর্কে, যা আমাদের প্রাকৃতিক ইকো-সিস্টেম সংরক্ষণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশ সচেতন শিল্প হিসেবে আমরা ক্রমবর্ধমানভাবে লিনিয়ার অর্থনীতি থেকে সরে এসে সার্কুলার অর্থনীতির মডেল অনুসরণ করার দিকে আমাদের সব মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করেছি। বর্তমানে বাংলাদেশে টেক্সটাইল বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের জন্য প্রস্তুতকারক, ক্রেতা এবং রিসাইক্লেয়ার বা পুনর্ব্যবহারকারীরা সমন্বিত প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন।
সপ্তম বিন্দুটি সারাবিশ্বে আমাদের নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করার বিষয়ে। এটি উদ্ভাবন, নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা ও যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ- এগুলোর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিসরে নিজের পরিচয় সুপ্রতিষ্ঠিত করে বিশ্বে এগিয়ে থাকতে অনুপ্রেরণার সঞ্চার করবে।
বিজিএমইএর নতুন লোগোর অষ্টম বিন্দুর ফোকাস হলো 'ব্র্যান্ডিং বাংলাদেশ'। এর উদ্দেশ্য হলো- বিজিএমইএ কী প্রতিনিধিত্ব করছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে ব্র্যান্ডিং করার ক্ষেত্রে বিজিএমইএ গুরুত্বপূর্ণ কী ভূমিকা পালন করছে, তার বার্তা বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দেওয়া।
এবং লোগোর নবম ও শেষ বিন্দুটি পরিবেশ রক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত। এটি প্রকৃতির জন্য বিজিএমইএর শ্রদ্ধাশীল মনোভাব, পরিবেশ সুরক্ষায় বিজিএমইএর দায়বদ্ধতা এবং প্রাকৃতিক ইকো-সিস্টেম বা বাস্তুসংস্থান সংরক্ষণের জন্য বিজিএমইএর গভীর নিষ্ঠারই প্রতীক।
এ ৯টি ডট বা বিন্দু হলো বিজিএমইএর কাজ করা ও অবদান রাখার ক্ষেত্রগুলোর মেট্রিক্স।
প্রতীকী অর্থে লোগোতে ডটগুলোকে এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যার মধ্য দিয়ে আমাদের যাত্রাপথ ক্রমানুসারে ব্যষ্টিক থেকে সামষ্টিক, কর্ম থেকে ফল এবং স্থানীয় থেকে বিশ্বব্যাপী পদচারণা চিত্রিত হয়েছে। এটি শিল্পের অর্গানিক রূপান্তর। আমরা যখন লোগোর মধ্যে সারিগুলোর দিক থেকে ৯টি বিন্দুর দিকে দৃষ্টিপাত করি, তখন সেগুলোর মধ্যে একটি অব্যাহত সংযোগ আবিস্কার করি।
প্রথম তিনটি বিন্দু কাজের ক্ষেত্রগুলোতে প্রবেশ; দ্বিতীয় তিনটি বিন্দু রূপান্তর এবং তৃতীয় তিনটি বিন্দু সাসটেইনেবিলিটির ওপর জোর দেয়। এ ৯টি বিন্দু একত্রে বিজিএমইএর নতুন পরিচয়কে প্রকাশ করছে। গত ৪০ বছরে আমরা অনেকটা পথ অতিক্রম করেছি এবং আরও কিছু পথ পাড়ি দিতে হবে; কিন্তু এর প্রাপ্তি বা পুরস্কার বিশাল।
আগামী দিনগুলোতে আমাদের এই গতি ধরে রাখা এবং পণ্য বৈচিত্র্যকরণ, উদ্ভাবন, মূল্য সংযোজন, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব প্রভৃতি ক্ষেত্রে চলমান প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। সেই দিন আর বেশি দূরে নয়, যখন আমরা এই গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাত থেকে বার্ষিক ১০০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে সক্ষম হবো।
ফারুক হাসান :সভাপতি, বিজিএমইএ এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক, জায়ান্ট গ্রুপ