অর্থবছরের শুরুর তুলনায় শেষ দিকে বাজেট বাস্তবায়ন গতিশীল হওয়ায় একসঙ্গে অনেক খরচের চাপে পড়ে সরকার। এতে সরকারের অপরিকল্পিত ঋণ নেওয়া ও সুদ ব্যয় বেড়ে যায়। এমনকি আর্থিক শৃঙ্খলাও ভেঙে পড়ে। আবার সরকারি ব্যয়ের গুণগত মান নিশ্চিত করাও সম্ভব হয় না। এ অবস্থা থেকে বের হতে অর্থবছরের শুরুতেই পরিকল্পিতভাবে বাজেট বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছে সরকার। এজন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাজেট বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট ও সময়নিষ্ঠ পরিকল্পনা নিতে বলেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। বাজেট বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্নিষ্টরা যাতে সুন্দরভাবে পরিকল্পনা সাজাতে পারেন সেজন্য অর্থ বিভাগ নির্দিষ্ট কিছু ফরমও তৈরি করে দিয়েছে। আগামী ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ওই ফরম অনুযায়ী পরিকল্পনা তৈরি করে মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থ বিভাগে পাঠাতে হবে। একই সঙ্গে পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়ন অগ্রগতি প্রতি তিন মাস পরপর অর্থ বিভাগকে জানাতে হবে।

অর্থ বিভাগ বলেছে, প্রতি মাসের তৃতীয় সপ্তাহের মধ্যে আগের মাসের ইউটিলিটি বিল পরিশোধ করতে হবে। অর্থবছরের শুরু থেকে মেরামত ও সংরক্ষণের কাজ শুরু করতে হবে। এমনভাবে মেরামত ও সংরক্ষণ কাজের পরিকল্পনা করতে হবে যাতে প্রতি ত্রৈমাসিকের ব্যয় মোটামুটিভাবে ভারসাম্যপূর্ণ থাকে। অর্থবছরের শেষ ত্রৈমাসিকে মাত্রাতিরিক্ত বিল পরিশোধের চাপ যাতে তৈরি না হয়। বাজেট কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে তা প্রতি ত্রৈমাসিকের পরের দুই সপ্তাহের মধ্যে অর্থ বিভাগে পাঠাতে হবে।

সূত্র জানায়, সরকার সময়মতো বাজেট বাস্তবায়নের একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করতে চায়। এজন্য অর্থ বিভাগ থেকে অন্যান্য মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানের বাজেট বাস্তবায়ন সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়মিতভাবে পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। গত কয়েক বছর ধরে এ উদ্যোগ নেওয়া হলেও অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। ২০২১-২২ অর্থবছরেও এ ধরনের বাস্তবায়ন পরিকল্পনা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অর্থবছর শেষে দেখা গেছে, শেষ প্রান্তিকে গিয়েই বাজেটের অর্ধেকের বেশি ব্যয় হয়েছে। আবার বাজেটে সরকার যেসব নতুন নীতি, কর্মসূচি ও কার্যক্রম নিচ্ছে, এর পুরোটা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। অর্থ বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বাজেটে নাগরিক স্বার্থসহ সামগ্রিকভাবে দেশের উন্নয়নে অনেক পরিকল্পনা থাকে। সময়মতো ও সুষ্ঠুভাবে সব ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন না হওয়ায় বাজেটের সুফল সবাই সমানভাবে পাচ্ছে না।

অর্থ বিভাগের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যথাসময়ে সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অর্থবছরের শুরুতে সুনির্দিষ্ট ও সময়নিষ্ঠ পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। প্রতিবছর বাজেটে নতুন কিছু নীতি, কার্যক্রম বা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। চলতি অর্থবছরেও এ ধরনের নতুন কিছু কার্যক্রম রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় বলছে, ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে এ পর্যন্ত নেওয়া অধিকাংশ নতুন নীতি, কর্মসূচি ও কার্যক্রম বাস্তবায়ন হলেও গত তিন অর্থবছরে নেওয়া অনেক কার্যক্রম বাস্তবায়ন হয়নি।

অর্থ বিভাগ বলছে, অর্থবছরের প্রথমভাগে বাজেট বাস্তবায়ন চলে ধীরগতিতে। অর্থবছরের শুরুর দিকে বাজেটের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আহরণেও ধীরগতি দেখা যায়। এ সময়ে বেতন-ভাতা ছাড়া প্রকল্পের অন্যান্য আইটেমের বিপরীতে ব্যয়ও কম হয়। বিশেষ করে বিভিন্ন ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, মেরামত, সংরক্ষণ, নির্মাণ ও পূর্ত কাজ এবং মালপত্র কেনা ও সংগ্রহের ক্ষেত্রে অর্থবছরের শেষ দিকে উদ্যোগ নেওয়া হয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে সরকারি ব্যয়ের গুণগত মান নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। উপরন্তু বছরের শেষে এসে সরকারকে অপরিকল্পিত ঋণের দায়ভার বহন করতে হয়। ফলে আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা যায় না।

অর্থ বিভাগ মনে করে, সরকারের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্যহীনতার অন্যতম কারণ রাজস্ব সংগ্রহ ও সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সুষ্ঠু পরিকল্পনা না থাকা। বাজেট সুষ্ঠুভাবে সময়মতো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আগাম পরিকল্পনা নেওয়া সম্ভব হলে অপরিকল্পিত ঋণ ও ঋণজনিত ব্যয় কমানো সম্ভব। এজন্য জাতীয় সংসদ বাজেট সুষ্ঠুভাবে সময়মতো বাস্তবায়নের জন্য আগাম পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে। এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, অপরিকল্পিত সরকারি ঋণ এড়ানো এবং ঋণজনিত ব্যয় কমানো।

উল্লেখ, চলতি অর্থবছরের জন্য সরকার ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে সামগ্রিক উন্নয়ন ব্যয় ২ লাখ ৫৯ হাজার ৬১৭ কোটি টাকা। বর্তমানে সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও প্রতিষ্ঠান কম্পিউটারভিত্তিক মাল্টিমডিউল ডাটাবেজের (আইবাস প্লাস প্লাস) মাধ্যমে বাজেট প্রণয়ন করছে। তা সত্ত্বেও বাজেটের সময়মতো ও সুষ্ঠু বাস্তবায়ন এখনও একটি প্রধান চ্যালেঞ্জ।