স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) কাতার থেকে উত্তরণের পর বর্তমান শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা হারাবে বাংলাদেশ। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং পরিবেশ রক্ষায় বৈশ্বিক কিছু পদক্ষেপও বাংলাদেশের অনুকূলে থাকছে না। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়ার বিষয়ে অনিশ্চয়তার পাশাপাশি ইইউ কর্তৃপক্ষের কার্বন কর আরোপ সংক্রান্ত পদক্ষেপের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের রপ্তানিতে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‌্যাপিড) এক কর্মশালায় এমন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন সংস্থার চেয়ারম্যান ড. আব্দুর রাজ্জাক। রাজধানীর গুলশানে র‌্যাপিড কার্যালয়ে গত রোববার এই কর্মশালার আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মী এতে অংশ নেন।

কর্মশালায় র‌্যাপিডের এ সংক্রান্ত একটি গবেষণা প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ ৫৫ শতাংশ এবং ২০৫০ সালের মধ্যে শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে একটি পথনকশা তৈরি করেছে ইইউ। ২০১৯ সালে নেওয়া সমন্বিত এ পথনকশার নাম দেওয়া হয়েছে 'ইইউ গ্রিন ডিল'। এর অংশ হিসেবে কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজমের (সিবিএএম) আওতায় ইইউর অভ্যন্তরে কয়েকটি খাতের পণ্যের ওপর কার্বন কর আরোপ করার কাজ চলছে। ২০২৬ সালে আমদানি পর্যায়েও এ শুল্ক আরোপ করা হতে পারে। যদিও বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা প্রাথমিক তালিকায় রাখা হয়নি। তবে ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে। নিকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশের এই তিন পণ্যে কার্বন কর আরোপ হতে পারে ৬ থেকে ৭ শতাংশের মতো। ইইউর ১৩ হাজার এবং ইইউর বাইরে চার হাজার প্রতিষ্ঠানকে পরিবেশের বিষয়ে ডিউ ডিলিজেন্স (যার যা করণীয়) মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এতে বাংলাদেশের রপ্তানি অন্তত ২৮ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে বেশি কার্বন নিঃসরণ করে স্থানীয় এমন পাঁচটি শিল্পের ওপর কার্বন কর আরোপ করেছে ইইউ। তবে পরিবেশ সুরক্ষা এবং কর এড়াতে কিছু প্রতিষ্ঠান ইউরোপের বাইরে বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ করে আবার ইইউতে নিয়ে আসে। এর ফলে ইইউতে কার্বন নিঃসরণ কমলেও বৈশ্বিকভাবে তা বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে কার্বন নিঃসরণের জন্য দায়ী পণ্যগুলোতে আমদানি পর্যায়েও কর আরোপ করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কোন পণ্যের উৎপাদনে কী পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ হয়, সে তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে করারোপ করা হবে। এ বিষয়ে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন ব্যবস্থার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছে ইইউ। ইইউর এমন পদক্ষেপে সতর্কতা হিসেবে চীন ইতোমধ্যে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। কার্বন মার্কেট চালু করা হয়েছে দেশটিতে। এর ফলে ইইউতে প্রবেশে চীনা পণ্যে কোনো রকম কার্বন কর আরোপ হবে না। প্রতিযোগী ভিয়েতনাম এবং ভারতও একই পদক্ষেপ নিচ্ছে। তবে বাংলাদেশ এখনও এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। আমদানি পর্যায়ে ২০২৭ সাল নাগাদ এই কার্বন কর আরোপ হতে পারে। এ সংক্রান্ত একটি বিলের ওপর যুক্তি-তর্ক চলছে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে।

এ অবস্থায় বাংলাদেশের করণীয় কী- জানতে চাইলে ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ইইউর কার্বন কর আরোপের আগেই বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণভাবে কার্বন কর আরোপ করা প্রয়োজন। কার্বন মার্কেট সৃষ্টি করা যেতে পারে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। যাতে ইইউ বাংলাদেশের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে পারে। এ ক্ষেত্রে সহযোগিতা চাওয়ারও সুযোগ রয়েছে।