পলিশে চাল সরু হয়, বাড়ে সৌন্দর্য। পুষ্টিগুণ কমলেও ভাত টেকে বেশি সময়। নগরজীবনে বারবার রান্নার ঝক্কি এড়াতে হেঁশেলের দখল নিয়েছে 'মিনিকেট' চাল। এই ভাত রুচিতে জমলেও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতি বিবেচনায় সরকার কঠোর হচ্ছে। তারা আইনে জেল-জরিমানার বিধান রেখে উৎপাদিত ধানের নামেই চাল বাজারজাতের উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে আইনটি পাসের পর বাজারে আর মিনিকেট চাল থাকবে না বলে ধরে নিলেও ব্যবসায়ীরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাঁদের ভাষ্য, মিনিকেট যেভাবে গৃহিণীর হেঁশেল দখল করেছে, তা আইনের মাধ্যমে কাগজে-কলমে হয়তো বন্ধ করা যাবে। কিন্তু ঠিকই এই চিকন চালের আধিপত্য ভিন্ন নামে থেকে যাবে।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে পাইকারি চালের ব্যবসা করেন জসিম উদ্দিন। ইসমাইল অ্যান্ড সন্স রাইস এজেন্সির এই কর্ণধার সমকালকে বলেন, আইন করলেও মিনিকেট নামে পরিচিত চাল বিক্রি বন্ধ হবে না। চিকন বা অন্য নামে বাজারে থেকে যাবে।

বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কে এম লায়েক আলী বলেন, আইন করে মিনিকেট বন্ধ হলেও একই চাল জিরাশাইল বা ভিন্ন নামে বিক্রি হবে। তিনি যুক্তি দেন, এখন ঢাকায় যে চাল মিনিকেট- চট্টগ্রাম, সিলেট, কুমিল্লা অঞ্চলে তা জিরাশাইল নামে বিক্রি হচ্ছে। আইন হলে ঢাকাতেও ভিন্ন নামে থাকবে এখনকার মিনিকেট।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খাদ্য মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, মিনিকেট নামে চাল বাজারজাত করাই বড় ধরনের অপরাধ। ব্যবসায়ীরা এর মাধ্যমে ভোক্তার সঙ্গে প্রতারণা করছেন। আইন পাসের আগেই মিনিকেটের বাজারজাত বন্ধ হওয়া উচিত। তবে আমরা আশা করছি, আইনের পর মিনিকেটের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না।

চাল পলিশ বন্ধ হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী চালের বস্তা বা প্যাকেটে ধানের জাত উল্লেখ থাকবে। ফলে পলিশের সুযোগ থাকবে না। বাস্তবে এত চিকন চাল হয় না। পলিশ ঠেকানো গেলে অপচয় বন্ধ হয়ে বাড়বে চালের উৎপাদন।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ভিন্ন জাতের চাল মিনিকেট নামে বিক্রি করলে সর্বোচ্চ ৫ বছর জেল বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রেখে একটি খসড়া আইন অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা কমিটি। আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে এটি সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে পাস হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিদ্যমান 'দ্য ফুড গ্রেইন্স সাপ্লাই' (প্রিভেনশন অব প্রিজুডিক্যাল অ্যাক্টিভিটি) অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৯ এবং 'দ্য ফুড' (স্পেশাল কোর্টস) অ্যাক্ট, ১৯৫৬ যুগোপযোগী করে নতুন 'খাদ্যদ্রব্যের উৎপাদন, মজুত, স্থানান্তর, পরিবহন, সরবরাহ, বিতরণ ও বিপণন (ক্ষতিকর কার্যক্রম প্রতিরোধ) আইন-২০২২' নামে এটি করা হয়েছে।

খসড়া আইনে বলা হয়েছে, খাদ্যদ্রব্য থেকে কোনো স্বাভাবিক উপাদান সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে অপসারণ করে তা আকর্ষণীয় করে বিক্রির কারণে ক্রেতার আর্থিক বা স্বাস্থ্যগত ক্ষতি হলে সেটি অপরাধ বিবেচিত হবে। কোনো স্বীকৃত জাতের খাদ্যশস্য থেকে উৎপাদিত খাদ্যদ্রব্যকে ওই জাতের উপজাত হিসেবে উল্লেখ না করে ভিন্ন বা কাল্পনিক নামে বাজারজাতে ক্রেতাকে প্রতারিত করাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। দোষীরা এ অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

অনেক মিল মালিক পুরোনো চাল পলিশ করে সরকারি গুদামে সরবরাহ করেন। খসড়া আইনে এটাকে অপরাধ ধরা হয়েছে। প্রকল্পে বিতরণ করা চাল পরিমাণে কম দেওয়া বা প্রকৃত উপকারভোগী ছাড়া অন্য কাউকে দিলেও আইন অনুযায়ী শাস্তি হবে। এ ধরনের বিচারিক কার্যক্রম সম্পাদনে খাদ্যদ্রব্য বিশেষ আদালত গঠন করা হবে বলে খসড়ায় উল্লেখ রয়েছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, আইনটি যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে বাজারে খাদ্যপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক ও দাম স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে। আর সংশ্নিষ্ট অপরাধীদের সহজেই শাস্তির আওতায় আনা যাবে।

গবেষকদের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে প্রায় ২০০ জাতের হাইব্রিড ধান থাকলেও মিনিকেট, নাজিরশাইল কিংবা লতা নামে কোনো জাত নেই। অথচ এসব নামের চালে বাজার সয়লাব। মূলত মোটা চাল অটোমিলের মাধ্যমে পলিশ করে ওপরের আবরণ ফেলে দিয়ে চিকন করা হয়। পলিশের চকচকে হলেও চালে থাকা প্রোটিন, ফ্যাট, ভিটামিন, মিনারেল ও ফাইবারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদন কমে যায়। বিপরীতে কার্বোহাইড্রেটের বড় একটা অংশ অবশিষ্ট থেকে যায়। চাল বারবার পলিশ করলে পুষ্টিগুণ কমে যায়। শরীরে নানা রোগব্যাধির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ ধরনের চালে স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

গবেষকরা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, আইন বাস্তবায়ন হলে চালের বাজারে প্রতারণা কমে আসবে। পাশাপাশি পলিশ বন্ধে পুষ্টিগুণ অক্ষুণ্ণ রাখা সম্ভব হবে এবং ধান থেকে চালের উৎপাদন বাড়বে। তবে আইনের বাস্তবায়ন কতটুকু হবে, সেটি নিয়ে তাদের সংশয় রয়েছে।

এ বিষয়ে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য অধ্যাপক মো. আব্দুল আলীম সমকালকে বলেন, দেশের মানুষ বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠী পুষ্টির চাহিদা মেটান ভাত খেয়ে। চাল পলিশ না হলে পুষ্টির চাহিদা অনেকাংশে মেটানো যাবে। বর্তমানে চাল প্রায় ১৭ শতাংশ পলিশ করা হয়। এটি না করলে ধান থেকে চালের পরিমাণ বাড়বে। তবে করপোরেট স্বার্থ উপেক্ষা করে আইন কতটা বাস্তবায়ন হয়, তা দেখতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।