কাগজপত্র জমা, নথি খুঁজে বের করা কিংবা দপ্তরের সরকারি নথিতে বড় কর্তার সই- এসব কাজে যাদের থাকার কথা, তারা নেই কর্মমঞ্চে। নতুন ট্রেড লাইসেন্স কিংবা নবায়নের কাজ হাতে তুলে নিতে গিজগিজ করছে দালাল। লাইসেন্স শাখায় কাগজে-কলমে তিনজন সুপারভাইজার থাকলেও দালালদের সঙ্গেই তাঁদের দোস্তি। সরকারি অফিসের ভেতরেই দালালদের 'অফিস'। ফলে দালালের পকেটে টাকা গেলেই ট্রেড লাইসেন্স ও নবায়ন- সবই হয়ে যায় নিমেষে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মহাখালী অঞ্চল-৩ কার্যালয় ভবনের নিচতলার দৃশ্যপট নিত্যদিন থাকে এমনই। সেখানে টাকার তালে কাজ চলে। টাকার অঙ্ক যত বড়, কাজের সমাধানও তত দ্রুত। টাকা বেশি দিলে দুই দিনের মধ্যে কাজ হয়, না দিলে লাইসেন্স চাপা পড়ে মাসের পর মাস। তবে সিটি করপোরেশন কার্যালয়ে প্রকাশ্যে দালালদের এমন কীর্তি চললেও কর্মকর্তারা সব দেখেও করছেন না দেখার ভান! এই দালাল বিচরণ শুধু মহাখালীর অঞ্চল-৩ কার্যালয়ে নয়, রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের সব ট্রেন্ড লাইসেন্স শাখারও অভিন্ন ছবি এটি।

সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) এবং সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট এন্টারপ্রাইজের (সিআইপিই) সম্প্রতি প্রকাশিত জরিপেও ট্রেড লাইসেন্স তৈরি ও নবায়নে ঘুষ কারবারের চিত্র উঠে আসে। জরিপের ফলাফলে নতুন লাইসেন্স তৈরিতে ৩৬.৪ শতাংশ ও নবায়নের ক্ষেত্রে ৩১.৮ শতাংশ দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ পায়। ২০২১ সালের মধ্য অক্টোবর থেকে মধ্য ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের এসএমই খাতের ওপর সংস্থা দুটি যৌথভাবে এই জরিপ চালায়।
সিজিএসের কো-অর্ডিনেটর সঞ্জয় দেবনাথ সমকালকে বলেন, 'আমরা বিভিন্ন সেবা প্রতিষ্ঠানে ৮০০ প্রতিনিধির মাধ্যমে জরিপ চালিয়েছিলাম। এতে সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে দুর্নীতির এ চিত্র উঠে আসে।'

গত সোমবার মহাখালীর অঞ্চল-৩ কার্যালয়ে সরেজমিন দেখা যায়, ভবনের নিচতলায় ট্রেড লাইসেন্স তৈরি ও নবায়নের সুপারভাইজারের কক্ষে নির্দিষ্ট টেবিল ছাড়াও ৮ থেকে ১০ ব্যক্তি নিজেদের 'অফিস' বানিয়েছেন। দেখে বোঝার উপায় নেই, তাঁরা অফিসের কেউ নন।

গ্রাহকরা লাইসেন্স তৈরি বা নবায়ন করতে এলে সুপারভাইজাররা তাঁদের কাছেই পাঠিয়ে দেন। এর মধ্যে রুবেল, রিপন, জসিম ও রিয়াদ গ্রাহকদের নথি খুঁজে বের করে টাকা জমা নিচ্ছেন। তাঁরাই অনলাইনে ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের কাজ করে জানিয়ে দিচ্ছেন, কবে লাইসেন্সের সনদ নিতে আসতে হবে। তবে এ কাজের জন্য তাঁরা অতিরিক্ত ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেন। টাকা না দিলে দালালরা ফাইল আটকে দেওয়ার হুমকি দিয়ে বসেন সরকারি কার্যালয়ে বসেই।

ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করতে এ কার্যালয়ে এসেছেন বনশ্রীর ফ্যাশন ভলিয়মের কর্মচারী রানা হাসান। তিনি বলেন, 'লাইসেন্স নবায়ন করতে আমাকে কয়েকবার আসতে হয়েছে। দালালদের সঙ্গে কথা বললেই টাকা। সিটি করপোরেশন কার্যালয়ের ভেতরেই দিব্বি অফিস বানিয়ে বসেছে তারা। এর সঙ্গে কর্মকর্তারাও জড়িত। নিয়মের মধ্যে থেকে কাজ করলে দিনের পর দিন ঘুরতে হয়। নবায়নের পরও দেখা যাবে প্রতিষ্ঠান বা মালিকের নামের বানান ভুল, এটি ঠিক করতে আবার হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়।'

সিটি করপোরেশনের অফিসে বসে টাকার বিনিময়ে কাজ করার বিষয়ে রুবেল নামের একজনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'চা-নাশতা খাওয়ার জন্য টাকা নেওয়া হচ্ছে। তবে কাউকে জোর করা হচ্ছে না।' টাকা না দিলে ফাইল আটকে দিতে পারেন কিনা জানতে চাইলে তিনি আর কথা বলতে চাননি। দায়িত্বরত সুপারভাইজারের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মহাখালী জোনের শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক রুবেল। তিনি দায়িত্বরত লাইসেন্স সুপারভাইজার হাবীবের মাধ্যমে কাজ করেন। এ বিষয়ে হাবীবের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

তবে লাইসেন্স সুপারভাইজার সাইদুল ইসলামের কাছে সিটি করপোরেশনের অফিস কক্ষে দালালরা এভাবে কাজ করতে পারেন কিনা জানতে চাইলে তিনি কর কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে বলেন। দালালরা তাঁর কক্ষে কীভাবে আছে- এ বিষয়ে তিনি বলেন, 'আমি সিটি করপোরেশনের কর্মচারী, আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে ভালো বলতে পারবেন।'

কর কর্মকর্তা রাকিবুল হাসান মিরাজ বলেন, 'অভিযুক্ত দালালদের আমি চিনি না। আমাদের ট্রেড লাইসেন্স শাখায় তিনজন লাইসেন্স সুপারভাইজার কাজ করেন। তাঁদের ওয়ার্ক স্টেশনে যদি কেউ এসে ফাইলপত্র জমা নেওয়া, লাইসেন্স দেওয়া, ঘুষ লেনদেনের কাজ করে থাকে, তবে এ দায়-দায়িত্ব সুপারভাইজারদের। তাঁরা কেন তাঁদের কাজ আরেকজনকে দিয়ে করাবে? তবে আমাদের দপ্তর সিসি ক্যামেরার আওতাধীন, আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা এসব ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণ করেন।' জানা যায়, গণমাধ্যমকর্মী অঞ্চল-৩ কার্যালয়ে গেছেন, এ রকম খবর চাউর হওয়ার পর দালালের বিষয়টি তদন্তে একটি কমিটি হয়েছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কারওয়ান বাজারের অঞ্চল-৫ কার্যালয়েও অভিন্ন ছবি। এ কার্যালয়ে দালালদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কর্মকর্তারাও কাজের জন্য টাকা চেয়ে বসেন। লাইসেন্স সুপারভাইজার বজলুল মোহাইমিন বকুল নিজে অফিস না করে কাজ করার জন্য আনোয়ার, জুয়েল, রবিন, কাজলসহ কয়েকজনকে রেখেছেন। এই আঞ্চলিক কার্যালয়ে গিয়ে তাঁরা যে বহিরাগত, সেটা চেনার উপায় নেই। তাঁরাই কার্যালয়ে বসে ট্রেড লাইসেন্স তৈরি ও নবায়নে সরকারি দপ্তরের কাগজপত্র সইসহ সবকিছু দেখভাল করছেন। তবে লাইসেন্স সুপারভাইজার বকুল তাঁর কক্ষে থাকা ব্যক্তিদের চেনেন না বলে দাবি করেন।

একটি কনসাল্টিং ফার্মের লাইসেন্স নবায়ন করতে গত রোববার অঞ্চল-৫ কার্যালয়ে এসেছিলেন মোহাম্মদপুরের অর্ণব। ওই কার্যালয়ে পূর্বপরিচিত কোনো কর্মকর্তা না থাকায় তিন হাজার টাকা অতিরিক্ত দিয়ে এক দিনের মধ্যেই লাইসেন্স নবায়ন করে নিয়েছেন। তবে কারওয়ান বাজারের শ্রীরাম ও কৃষ্ণের মাছের আড়তের লাইসেন্স নবায়নের জন্য অতিরিক্ত ৫ হাজার টাকা ঘুষ না দেওয়ায় ঘুরতে হচ্ছে দুই মাস। পরিচয় না দিয়ে একটি ছোট ফটোকপির দোকানের ট্রেড লাইসেন্স তৈরির প্রক্রিয়া জানতে চাইলে এ কার্যালয়ের কম্পিউটার অপারেটর রবিন এ প্রতিবেদককে ভোটার আইডির সঙ্গে দুই কপি ছবি আর দুই দিনের মধ্যে সনদ পেতে ৫ হাজার টাকা দাবি করেন। রবিন জানান, ৫ হাজার টাকা দিলে দুই দিনে লাইসেন্স হবে, নইলে দুই মাসেও হবে না।

এ ব্যাপারে অঞ্চল-৩-এর নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল বাকী বলেন, সিটি করপোরেশনের কক্ষে দালালদের কাজ কিংবা লেনদেনের সুযোগ নেই।



বিষয় : নতুন ট্রেড লাইসেন্স ও নবায়ন

মন্তব্য করুন