সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাংক থেকে আমানত তুলে নেওয়ার প্রচারণা চালাচ্ছে একটি চক্র। এর বিরুদ্ধে ব্যাংকগুলোকে সোচ্চার হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন গভর্নর। একই সঙ্গে কোনো ব্যাংক যেন সমস্যায় না পড়ে সে জন্য ব্যাংকগুলোকে ধার দেওয়া বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গতকাল এক দিনেই বিভিন্ন ব্যাংককে রেপো ও বিশেষ তারল্য সহায়তা হিসেবে ১৭ হাজার ১০৬ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, গতকাল ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ সুদে রেপো বা পুনঃক্রয় চুক্তির বিপরীতে কয়েকটি ব্যাংককে ধার দেওয়া হয়েছে ৯ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা। আর ৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ সুদের তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে আরও ৭ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা। সাম্প্রতিক সময়ে এক দিনে ব্যাংক খাতে এত তারল্য সহায়তার দরকার পড়েনি। চলতি সপ্তাহের প্রথম দিন গত রোববার ব্যাংকগুলো রেপোর মাধ্যমে ৮ হাজার ৭১৫ কোটি টাকা চাহিদার বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দিয়েছিল ৪ হাজার ৩৫৮ কোটি টাকা। তারল্য সহায়তা হিসেবে দেওয়া হয় ১ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ওই দিন মোট ধারের পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ২৯৪ কোটি টাকা। গত বৃহস্পতিবার ধারের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৭৪৮ কোটি টাকা।

সংশ্নিষ্টরা জানান, কোনো ব্যাংক তারল্য সমস্যায় পড়লে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ধার নেয়। পাশাপাশি আন্তঃব্যাংক কলমানিতে আরেক ব্যাংক থেকে ধার করে। গতকাল কলমানিতে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা। গত রোববার ছিল ৫ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা। আর বৃহস্পতিবার ছিল ৭ হাজার ১৭৩ কোটি টাকা। ডলার কেনার বিপরীতে পরিশোধ এবং আমানত প্রবৃদ্ধি কম থাকার কারণে কোনো কোনো ব্যাংকে টাকার চাহিদার তুলনায় নিজস্ব সরবরাহ কম রয়েছে। এ কারণে আন্তঃব্যাংকে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ধার নেওয়া বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি সপ্তাহে জরুরি বিজ্ঞপ্তি, সংবাদ সম্মেলন ও এমডিদের নিয়ে বৈঠকে ব্যাংকের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক প্রচারণার কথা জানিয়েছে। গত রোববার ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এমডিদের নিয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার বলেন, একটি মহল দুরভিসন্ধিমূলক উদ্দেশ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে দেশের কোনো কোনো ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাবে বলে অপপ্রচার চালাচ্ছে। এতে ক্ষুদ্র আমানতকারীরা আতঙ্কিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অপপ্রচারের কারণে ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট হওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হতে পারে। এ ধরনের মিথ্যাচার প্রসূত ঝুঁকি কমাতে গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাংক ও ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন সম্পর্কে প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে সঠিক তথ্য তুলে ধরতে হবে।

ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এবিবির চেয়ারম্যান ও ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম আর. এফ. হোসেন সমকালকে বলেন, ব্যাংক খাত নিয়েঅপপ্রচার ছড়ানো হচ্ছে। এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। তিনি বলেন, নানা কারণে সাম্প্রতিক সময়ে আমানত প্রবৃদ্ধি হয়তো কম। এরপরও ১০ শতাংশের মতো প্রবৃদ্ধি আছে। মূলত ডলার কেনার বিপরীতে বিপুল অঙ্কের টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যাচ্ছে। আবার বৈশ্বিক কারণে সব কিছুর দর বৃদ্ধির প্রভাবে নিম্ন আয়ের মানুষ আগের মতো সঞ্চয় করতে পারছে না। তাই বলে আমানত ফেরত দিতে পারবে না- এমন পরিস্থিতি নেই।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ নভেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতের মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৪১ হাজার ৮৬ কোটি টাকা। গত জুন শেষে যা ছিল ১৬ লাখ ২৪ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা। এর মানে নানা চাপের মধ্যেও গত চার মাসে আমানত বেড়েছে ১৬ হাজার ৬১৫ কোটি টাকা। গত ৩ নভেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ লাখ ৬৬ হাজার ৮০৯ কোটি টাকা। গত জুন শেষে যা ছিল ১৩ লাখ ২০ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা। গত চার মাসে ঋণ বেড়েছে ৪৬ হাজার ২৯ কোটি টাকা। উচ্চ মূল্যস্ম্ফীতির প্রভাবসহ বিভিন্ন কারণে সঞ্চয় প্রবণতা কমেছে।