পণ্য ও খাত নির্বিশেষে জাতীয়ভাবে সর্বোচ্চ রপ্তানির জন্য সেরা রপ্তানিকারক হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রপ্তানি ট্রফি পেল হা-মীম গ্রুপের প্রতিষ্ঠান রিফাত গার্মেন্টস লিমিটেড। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি আয়ের বিবেচনায় মর্যাদাপূর্ণ এ ট্রফি দেওয়া হয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে গত বছর এ পুরস্কার চালু করেছে সরকার।

আজ মঙ্গলবার বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির হাত থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রপ্তানি ট্রফি (স্বর্ণ) গ্রহণ করেন হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি এ. কে. আজাদ। বঙ্গবন্ধু রপ্তানি ট্রফিসহ ২৯ খাতের ৭১ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের হাতে জাতীয় রপ্তানি ট্রফি তুলে দেওয়া হয়।

পোশাক খাতের ওভেন ক্যাটাগরিতেও জাতীয় রপ্তানি ট্রফি (স্বর্ণ) পেয়েছে রিফাত গার্মেন্টস লিমিটেড। হা-মীম গ্রুপের ডিএমডি লে. কর্নেল (অব.) দেলোয়ার হোসেন গ্রুপের এ ট্রফি গ্রহণ করেন।

জাতীয় রপ্তানি ট্রফি প্রদান উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টারে আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব তপন কান্তি ঘোষ এতে সভাপতিত্ব করেন। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন, ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান এ এইচ এম আহসান এবং হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ. কে. আজাদ। 

পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ. কে. আজাদ। ছবি- সমকাল

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটময় পরিস্থিতির বিষয়ে সরকার অবগত। শিগগিরই ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের নিয়ে বৈঠক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বৈঠকের আলোচনা থেকে একটি খসড়া তৈরি করা হবে। খসড়া প্রস্তাবসহ ব্যবসায়ী নেতাদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করবেন তারা। সেখানেই প্রধানমন্ত্রী জ্বালানি সংকটের সমাধান দেবেন। আগামী সপ্তাহের মধ্যেই এটা হতে পারে। 

তিনি বলেন, দেশের মানুষের প্রতি সরকারের দায়বদ্ধতা রয়েছে। সব সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু রপ্তানি ট্রফি পাওয়ায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ. কে. আজাদকে অভিনন্দন জানান তিনি।

বাণিজ্য সচিব জানান, জ্বালানি সংকট নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন তারা। এ নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয়ের ওপর চাপ আছে। খুব সহজ কোনো সমাধান দেখছেন না তারা। ভর্তুকি ধীরে ধীরে কমিয়ে আনতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এ. কে. আজাদ বলেন, বঙ্গবন্ধুর নামে প্রচলন করা ট্রফি অর্জন অনেক সম্মানের। এ সম্মানের যোগ্য মর্যাদা দিতে কর্মসংস্থান এবং জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থে উৎপাদন ও রপ্তানিকার্যক্রম আরও বাড়ানোর দিকে মনোনিবেশ করবে হা-মীম গ্রুপ। 

রপ্তানি বাজার পরিস্থিতি তুলে ধরতে এ. কে. আজাদ বলেন, প্রধান রপ্তানি বাজার ইউরোপ এবং আমেরিকায় এখন অর্থনৈতিক সংকট চলছে। পোশাকের চাহিদা কমে আসায় ব্র্যান্ড ক্রেতাদের স্টকে অনেক পণ্য অবিক্রিত। এ কারণে রপ্তানি আদেশ ৩০ শতাংশ কম। চাহিদা কম থাকায় ক্রেতাদের সঙ্গে দরকষাকষি করার সুযোগ নেই। যে দামই পাওয়া যায় তাতেই রপ্তানি আদেশ নেওয়া হচ্ছে। কারণ, মেশিন খালি পড়ে থাকলে আর্থিক লোকসান আরও বেশি। ২০২৩ সালে রপ্তানিতে বিরাট আঘাতের আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর মধ্যে জ্বালানি সংকট চলছে। লোডশেডিংয়ের কারণে দিনে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা ডিজেল দিয়ে জেনারেটর চালু রাখতে হয়। ডিজেলের দাম বেড়েছে ইউনিটপ্রতি প্রায় ৩১ টাকা। গ্যাসের সংকটে বস্ত্র খাতও সংকটে আছে। দিনে ১২ থেকে ১৩ ঘণ্টা উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। পণ্য ডেলিভারি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের স্বার্থে রপ্তানি গতি ধরে রাখা প্রয়োজন। আগামীতে গ্যাসের সংস্থান কীভাবে হবে সে বিষয়েও সিদ্ধান্ত জানা প্রয়োজন। তাহলে শিল্প বিনিয়োগ পরিকল্পনা নেওয়া যাবে। তা না হলে বর্তামান শিল্প টিকিয়ে রাখাই সমস্যা হয়ে যাবে। ক্রেতারা অন্য দেশে চলে যাবেন। উদ্যোক্তার খেলাপি হবেন। রপ্তানি পর্যায়ে উৎসে করের ১ শতাংশ কর্তনের ফলেও সংকটে পড়েছে শিল্প। বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার অনুরোধ জানান তিনি।

এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, আমদানি করে ৫ বিলিয়ন ডলারের গ্যাস শিল্পে দেওয়া হলে ব্যবসায়ীরা ১৫ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয় আনবেন দেশে। গ্যাসের বর্ধিত দর দিতেও রাজি আছেন তারা। গ্যাস ও বিদ্যুৎ পাওয়া গেলে স্থানীয় বাজারের পণ্য উৎপাদন করছে যেসব শিল্প কারখানা সেগুলোও টিকে যাবে। এতে রিজার্ভের ওপর চাপ কমবে। শিল্পে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট দূর না হলে রিজার্ভের ওপর আরও চাপ বাড়বে। রপ্তানিতে উৎসে করও আগের মতো শূন্য দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার দাবি জানান তিনি।

যেসব প্রতিষ্ঠান ট্রফি পেল 

তৈরি পোশাকের ওভেন ক্যাটাগরিতে রিফাত গার্মেন্টস লিমিটেড স্বর্ণপদক, এ কে এম নিটওয়্যার রৌপ্যপদক এবং অনন্ত এ্যাপারেলস ব্রোঞ্জ পদক পেয়েছে। নিটওয়্যার খাতে স্বর্ণ পদক জি এম এস কম্পোজিট নিটিং ইন্ডাস্ট্রিজ, রৌপ্য পদক স্কয়ার ফ্যাশনস এবং ব্রোঞ্জ পদক পেয়েছে ফোর এইচ ফ্যাশনস।

সব ধরনের সুতা খাতে স্বর্ণ, রৌপ্য ও ব্রোঞ্জ পেয়েছে যথাক্রমে বাদশা টেক্সটাইল, কামাল ইয়ার্ন ও নাইস কটন। টেক্সটাইল ফেব্রিকস খাতে স্বর্ণপদক এনভয় টেক্সটাইল, রৌপ্য আকিজ টেক্সটাইল মিলস ও ব্রোঞ্জ পেয়েছে নাইস ডেনিম মিলস। হোম ও বিশেষায়িত টেক্সটাইল পণ্য খাতে স্বর্ণপদক পেয়েছে জাবের অ্যান্ড জোবায়ের ফেব্রিকস। টেরিটাওয়েল খাতে স্বর্ণপদক পেয়েছে নোমান টেরিটাওয়েল মিলস। হিমায়িত খাদ্যপণ্য খাতে স্বর্ণ, রৌপ্য ও ব্রোঞ্জপদক পেয়েছে যথাক্রমে জালালাবাদ ফ্রোজেন ফুডস, এপেক্স ফুডস ও এমইউ সি ফুডস। কাঁচা পাটপণ্য খাতে স্বর্ণপদক পেয়েছে ইন্টারন্যাশনাল জুট ট্রেডার্স। পাটজাত দ্রব্যে স্বর্ণপদক আকিজ জুট মিলস, রৌপ্য করিম জুট স্পিনার্স এবং ব্রোঞ্জ পেয়েছে ওহাব জুট মিলস।

চামড়া (ক্রাস্ট বা ফিনিশড) পণ্য খাতে স্বর্ণপদক পেয়েছে এপেক্স ট্যানারি এবং রৌপ্যপদক পেয়েছে এস এ এফ ইন্ডাস্ট্রিজ। চামড়াজাত পণ্য খাতে স্বর্ণপদক পেয়েছে পিকার্ড বাংলাদেশ, রৌপ্য এবিসি ফুট ওয়্যার ইন্ড্রাস্ট্রিজ এবং ব্রোঞ্জপদক পেয়েছে বিবিজে লেদার গুডস। ফুটওয়্যার খাতে স্বর্ণপদক বে-ফুটওয়্যার, রৌপ্য রয়েল ফুটওয়্যার এবং ব্রোঞ্জপদক পেয়েছে এফবি ফুটওয়্যার। কৃষিজ পণ্য (তামাক ব্যতীত) খাতে স্বর্ণপদক পেয়েছে মনসুর জেনারেল ট্রেডিং এবং রৌপ্য পেয়েছে ইনডিগো কর্পোরেশন। কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য খাতে স্বর্ণপদক পেয়েছে প্রাণ ডেইরি, রৌপ্যপদক পেয়েছে প্রাণ অ্যাগ্রো এবং ব্রোঞ্জ পেয়েছে প্রাণ ফুডস।

ফুল ফলিয়েজ ক্যাটাগরিতে স্বর্ণপদক রাজধানী এন্টারপ্রাইজ এবং রৌপ্যপদক পেয়েছে এলিন ফুডস ট্রেন্ড। হস্তশিল্পজাত পণ্য খাতে স্বর্ণপদক কারুপণ্য রংপুর লিমিটেড, রৌপ্য বিডি ক্রিয়েশন এবং ব্রোঞ্জ পেয়েছে ক্ল্যাসিক্যাল হ্যান্ডমেড প্রোডাক্ট। প্লাস্টিকপণ্য খাতে স্বর্ণপদক বেঙ্গল প্লাস্টিকস, রৌপ্য ডিউরেবল প্লাস্টিক এবং ব্রোঞ্জপদক পেয়েছে বঙ্গ প্লাস্টিক ইন্টারন্যাশনাল। সিরামিক সামগ্রী খাতে স্বর্ণপদক শাইনপুকুর সিরামিকস, রৌপ্য আর্টিসান সিরামিকস এবং ব্রোঞ্জপদক পেয়েছে প্যারাগন সিরামিক। হালকা প্রকৌশল খাতে স্বর্ণপদক  ইউনিগ্লোরি সাইকেল কম্পোনেন্ট, রৌপ্য ইউনিগ্লোরি সাইকেল ইন্ডাস্ট্রি এবং ব্রোঞ্জ পদক পেয়েছে রংপুর মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ। ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক্সপণ্য খাতে স্বর্ণপদক এনার্জিপ্যাক ইঞ্জিনিয়ারিং, রৌপ্য কনফিডেন্স স্টিল এবং ব্রোঞ্জ পেয়েছে রহিম আফরোজ ব্যাটারি।

অন্যান্য শিল্পজাত পণ্য খাতে স্বর্ণপদক তাসনিম কেমিক্যালস কমপ্লেক্স, রৌপ্য মেরিন সেফটি সিস্টেম এবং ব্রোঞ্জপদক পেয়েছে মুমানু পলিয়েস্টার ইন্ড্রাস্ট্রিজ। কম্পিউটার সফটওয়্যার ক্যাটাগরিতে স্বর্ণপদক পেয়েছে সার্ভিস ইঞ্জিন। প্যাকেজিং ও এক্সেসরিজ পণ্য খাতে স্বর্ণপদক এম অ্যান্ড ইউ প্যাকেজিং, রৌপ্য মনট্রিমস এবং ব্রোঞ্জপদক পেয়েছে ইউনিগ্লোরি পেপার অ্যান্ড প্যাকেজিং। ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্যে স্বর্ণপদক বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, রৌপ্য স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস ও ব্রোঞ্জপদক পেয়েছে ইনসেপটা ফার্মাসিউটিক্যালস। কম্পিউটার সফটওয়্যার ক্যাটাগরিতে স্বর্ণপদক পেয়েছে সার্ভিস ইঞ্জিন।