সরকারি-বেসরকারি খাতে ঋণ চাহিদার তুলনায় আমানত বাড়ছে কম হারে। এর মধ্যে ডলার কিনতে গিয়ে ব্যাংকের টাকা চলে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকে। সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোকে ধার দেওয়া বাড়িয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পাশাপাশি ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার যে ঋণ নিচ্ছে তার বেশিরভাগই দিচ্ছে এ নিয়ন্ত্রক সংস্থা। তবে ঋণ দেওয়া হচ্ছে ভিন্ন কৌশলে 'ডিভল্বমেন্ট' পদ্ধতিতে। গত এক বছরে ডিভল্বমেন্টের পরিমাণ ১৮৭ শতাংশের বেশি বেড়ে ৭২ হাজার ৬৮ কোটি টাকায় ঠেকেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, সাধারণভাবে সরকারের ঋণ চাহিদা মেটানো হয় ট্রেজারি বিল ও বন্ডের উন্মুক্ত নিলামের মাধ্যমে। কোনো কারণে নিলামে বিল বা বন্ড বিক্রি না হলে তখন প্রাইমারি ডিলার (পিডি) ব্যাংকের ওপর ডিভল্ক্ব করা বা চাপিয়ে দেওয়া হয়। অনেক সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেই কিনে নেয়। তবে এখন তারল্য কম থাকায় বাংলাদেশ ব্যাংক নিজের ওপর ডিভল্ক্ব করে সরকারকে ঋণ দিচ্ছে। অনেক ব্যাংকের পুরোনো বন্ড কিনে নিচ্ছে। তারল্য প্রবাহ বাড়লেই এসব বিল, বন্ড আবার 'অফলোড' বাজারে ছাড়া হবে। এটা বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি ব্যবস্থাপনার একটি মাধ্যম।

জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক ট্রেজারি বিল ও বন্ডের বিপরীতে সরকারকে এখন নতুন করে ঋণ সরবরাহের পাশাপাশি আগের অনেক বন্ডও কিনে নিচ্ছে। যে কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিভল্বমেন্টের পরিমাণ বাড়ছে। বাজারে তারল্য বাড়াতে যা সহায়ক হচ্ছে। পাশাপাশি পুনঃক্রয় চুক্তির (রেপো) এবং তারল্য সহায়তার বিপরীতে ধার দেওয়া বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তারল্য সংকটের কারণে কোনো ব্যাংক যেন সমস্যায় না পড়ে, সে জন্য এ রকম কৌশল নেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার নিট ২৮ হাজার ২৯৫ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে। অথচ এ সময়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকে সরকারের ঋণ কমেছে ৩ হাজার ৪৭ কোটি টাকা। আর বাংলাদেশ ব্যাংকে বেড়েছে ৩১ হাজার ৩৪২ কোটি টাকা। এ সময়ে নতুন বিল-বন্ডে ডিভল্ক্ব করার পাশাপাশি পুরোনো বন্ডও কিনে নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে করে ডিভল্বমেন্ট বেড়ে ৭২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। চলতি বছরের জুন শেষে যা ছিল ৫৩ হাজার ১৯৪ কোটি টাকা। আর গত বছরের একই সময় শেষে ছিল মাত্র ২৩ হাজার ৯৬ কোটি টাকা। ঋণ নেওয়া এবং মেয়াদ শেষে পরিশোধ করা সরকারের একটি চলমান প্রক্রিয়া। সব মিলিয়ে ব্যাংকে সরকারের ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৯৮ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে রয়েছে ২ লাখ ১১ হাজার ২৭২ কোটি টাকা। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ৮৭ হাজার ২০৯ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই ঋণের মধ্যে ৭২ হাজার ৬৮ কোটি টাকাই ডিভল্বমেন্ট।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডিভল্বমেন্টের মাধ্যমে সরকারকে ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে বাজারে তারল্য বাড়াচ্ছে। পাশাপশি রেপো ও তারল্য সহায়তা হিসেবেও ব্যাংকগুলোকে ধার দেওয়া বাড়িয়েছে। গত কয়েক দিন ধরে ধার নেওয়া বাড়ছে ব্যাংকগুলোর। গত বৃহস্পতিবার ১২টি ব্যাংককে ১১ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা ধার দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর মধ্যে ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ সুদের রেপোর বিপরীতে দেওয়া হয় ৯ হাজার ২২২ কোটি টাকা। আর ৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ সুদের তারল্য সহায়তা হিসেবে দেওয়া হয় ২ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা। গত রোবার ছিল ৬ হাজার ২৯৪ কোটি টাকা। আগের বৃহস্পতিবার ১ হাজার ৭৪৮ কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনা এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বেড়েছে পণ্যমূল্য। মধ্য ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির অনেকে এখন সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। নতুন সঞ্চয় তো দূরে থাক, কেউ কেউ পুরোনো সঞ্চয় ভেঙে ফেলছেন। ধারদেনা বা ঋণ করে চলছেন কেউ কেউ। এর মধ্যে একদিকে ডলারের বিপরীতে বাজার থেকে তারল্য উঠে যাচ্ছে। আরেক দিকে ব্যাংক থেকে আমানত তুলে নেওয়ার ষড়যন্ত্রমূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সব মিলিয়ে বাজারে তারল্যের কিছুটা সংকট তৈরি হওয়ায় এভাবে তারল্য সহায়তা বাড়ানো হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের এ পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে প্রায় ৬০০ ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতি ডলার ৯৫ টাকা দরে বিক্রির বিপরীতে বাজার থেকে উঠে এসেছে ৫৭ হাজার কোটি টাকার মতো। গত অর্থবছর ৭৬২ কোটি ১৭ লাখ ডলার বিক্রির ফলে উঠে আসে ৬৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকে টাকা উঠে যাওয়ার মানে, বাজারে তারল্য কমে যাওয়া। পদ্ধতিগত কারণে এ পরিমাণ তারল্য কমলেও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি রয়েছে ১৪ শতাংশের মতো। সরকারও ঋণ নিচ্ছে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে।