দেশের রাজনীতি এখন অনেকটা অস্থির। বিএনপির কথা যদি ঠিক হয়, তাহলে ১০ ডিসেম্বর থেকে দেশে একজন নতুন প্রধানমন্ত্রীর আবির্ভাব হতে পারে- নাম তাঁর খালেদা জিয়া। বর্তমানে তিনি দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত হয়ে ১০ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কৃপায় কারাগারের বদলে তিনি নিজ বাড়িতে পারিবারিক পরিসরে অবস্থান করছেন। স্মর্তব্য, এই খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকাকালে ২০০৪ সালে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে দলীয় সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার শিকার হয়েছিলেন আওয়ামী লীগপ্রধান শেখ হাসিনা।
১০ ডিসেম্বর থেকে কীভাবে খালেদা জিয়ার নির্দেশনায় দেশ চলবে- তা অবশ্য পরিস্কার নয়। যদিও বিএনপির অনেক নেতা-নেত্রী বেশ জোর গলায় বলে বেড়াচ্ছেন- তারেক জিয়া আসবেন। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মূল কুশীলব ছিলেন তিনি; এখন লন্ডনে পলাতক। গ্রেনেড হামলা, মানি লন্ডারিংসহ একাধিক মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত। বিএনপি নেতারা বলছেন, তারেক রহমান দেশে এসে খালেদা জিয়ার হাত থেকে 'ক্ষমতা' গ্রহণ করবেন। তাঁর মায়ের বয়স হয়েছে। নানা রোগে আক্রান্ত। বিএনপি নেতারা দুই বছর ধরে বলে বেড়াচ্ছেন, খালেদা জিয়া এমন সব কঠিন রোগে আক্রান্ত; কেবল বিদেশে নিলেই তিনি বেঁচে যেতে পারেন। আল্লাহর রহমতে তিনি দেশীয় চিকিৎসকদের সেবায় এখন পর্যন্ত ভালো আছেন।
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পরিবর্তন সম্পর্কে বিএনপিরই অপর কিছু নেতা এবং তাদের কিছু মিত্র অবশ্য এতটা 'মিরাকল' দেখতে পাচ্ছেন না। বছরখানেক ধরে তাঁরা দাবি করছেন- শেখ হাসিনার সরকারকে একটি বায়বীয় নির্বাচনকালীন সরকারের কাছে ক্ষমতা ছাড়তে হবে। বিএনপির এই সমকালীন মিত্রের মধ্যে আছেন কতিপয় আওয়ামী লীগ পরিত্যক্ত ব্যক্তি, কয়েকজন ওয়ানম্যান পার্টির নেতা। বিএনপির জোটে ভিড়েছে স্বামী-স্ত্রী পার্টি, কিছু বাম সংগঠন; যারা এক সময় বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের খাল কাটা কর্মসূচিতে যোগ দিয়ে তাঁর 'হাঁ'-'না' ভোটে অংশ নেওয়ার জন্য দলীয় নেতাকর্মীকে নির্দেশ দিয়েছিল।
'বায়বীয়' এ কারণেই বলছি, এই নির্বাচনকালীন বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা দেশের সর্বোচ্চ আদালতে বাতিল হওয়ার আগে কারা ওই সরকারের অংশ হতে পারবে, তার একটি ফর্মুলা ছিল। এর কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন দেশের সর্বোচ্চ আদালতের সাবেক বিচারপতিরা। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করার রায়ে এক স্থানে মন্তব্য (রায়ে নয়) করা হয়েছে- সংসদ যদি মনে করে তাহলে পরবর্তী দুটি নির্বাচন এই ব্যবস্থার অধীনে হতে পারে। তবে তা থেকে দেশের জুডিশিয়ারিকে (বিচারাঙ্গন) দূরে রাখতে হবে। এরই মধ্যে সংসদ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু না রাখার পক্ষে মত দিয়েছে। এর অর্থ, বাংলাদেশে এই ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তা-ই যদি হয়, তাহলে বর্তমান সরকার কার কাছে ক্ষমতা ছেড়ে পদত্যাগ করবে? এই বিষয়ে মামলা বিশ্নেষণে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে- কোনো গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় ১ মিনিটের জন্যও দেশের শাসনভার কোনো অনির্বাচিত ব্যক্তির হাতে যাওয়া উচিত নয়।
বিএনপি আর তার মিত্ররা যে কয়টি বিষয় নিয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলন করছে, তার মধ্যে রয়েছে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ। অবশ্য ইদানীং দ্রব্যমূল্য নিয়ে সবাই কথা বলেন। কারণ নিত্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা ক্রমেই খারাপ হচ্ছে। কোনো কোনো পণ্ডিত ব্যক্তি আর রাজনৈতিক নেতা মিডিয়ায় এসে বলেন, বাজারে গেলে মনে হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পুরো খরচ বাংলাদেশ বহন করছে। এমন কথা যদি কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তির কাছ থেকে আসে, সাধারণ মানুষ মনে করতে পারে- এই পরিস্থিতি বুঝি শুধু বাংলাদেশেই। আসলে কি তাই?


ইউরোপের দেশগুলোর ৪০ শতাংশ জ্বালানি আসে রাশিয়া থেকে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে; আর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের লেনদেনে যে সুইফট কোড ব্যবহূত হয়, তাও তারা বন্ধ করে দিয়েছে। এর অর্থ- রাশিয়ার সঙ্গে বিশ্বের কোনো দেশ এই মুহূর্তে স্বাভাবিক উপায়ে বাণিজ্য করতে পারছে না। অন্যদিকে রাশিয়া ঘোষণা দিয়েছে- যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ন্যাটো দেশগুলোয় জ্বালানি হয় তারা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেবে অথবা কমিয়ে দেবে। এর ফলে এ দেশগুলো জ্বালানি সাশ্রয়ে নানামুখী ব্যবস্থা নিয়েছে। এর মধ্যে আছে- এই শীতে যেখানে বেশিরভাগ ইউরোপীয় দেশের তাপমাত্রা হিমাঙ্কের ১০-১২ ডিগ্রি নিচে নেমে আসে, তারা বাড়িতে ঘর গরম করার কোনো যন্ত্র চালু করতে পারবে না। স্যুট-বুট পরে অর্ধডজন কম্বল মুড়ি দিয়ে রাতে ঘুমাতে যেতে হবে। এই শীতে কেউ গরম পানি দিয়ে গোসল করতে পারবে না। অনেক শহরে এখন রাতে সড়কবাতি জ্বলে না। অনেক শহরে সড়কে ট্রাফিক বাতি নিভে গেছে। জ্বালানি সাশ্রয়ে ব্রিটেন ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে- সামনের বড়দিন উপলক্ষে কোথাও আলোকসজ্জা হবে না।
বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ গম উৎপাদন হয় রাশিয়া ও ইউক্রেনে। যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার কারণে গম সরবরাহে তীব্র সমস্যা দেখা দিয়েছে। গত ২৪ নভেম্বর লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকার খবর- সে দেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ এক বেলা খাওয়া কমিয়ে দিয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতিতে শিশুরা, বিশেষত স্বামীহীন মা অথবা সিঙ্গেল মাদার। নিউইয়র্কের হান্টার কলেজের অধ্যাপক ড. চার্লস প্লাটকিন সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, শুধু নিউইয়র্ক সিটিতে প্রতি রাতে ১৫ লাখ মানুষ অভুক্ত অবস্থায় ঘুমাতে যায়। এটি শুরু হয়েছিল কভিডকালে, যার শেষ দেখা যাচ্ছে না। পুরো ইউরোপ আর যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রাস্ম্ফীতি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৯ থেকে ১১ শতাংশের ঘরে পৌঁছেছে। ইউরোপের অনেক দেশে মানুষ সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে বিক্ষোভ করছে।
অর্থনীতি নিয়ে বিএনপির প্রচারণার বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষের যাঁরা মিডিয়া, সভা-সমিতিতে কথা বলেন, তাঁদের কয়জন এসব তুলে ধরতে পারেন! গত ১২ বছরে সরকারের যেসব মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে, সেটি সম্পর্কে কতজন বলেন? সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্প, বিধবা ভাতা, মুক্তিযোদ্ধাদের গৃহায়ন, সফলভাবে কভিড মহামারি মোকাবিলা কিংবা অবসরপ্রাপ্তদের পেনশনপ্রাপ্তি সহজীকরণ- এসব নিয়ে কয়জন কথা বলেন?
বিএনপি মহাসচিব কথায় কথায় বলেন- মহাপ্রকল্পের নামে মহাদুর্নীতি হয়। দুর্নীতি এই সরকার আবিস্কার করেনি। বিএনপি আমলে দেশ এ ক্ষেত্রে পাঁচবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। তাদের আমলে মেগা দুর্নীতি হয়েছে, কিন্তু কোনো প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়নি।
কথা হচ্ছে, সুষ্ঠু নির্বাচন সবার কাম্য। নির্বাচন কোনো সরকার করে না; করে নির্বাচন কমিশন। তাকে সার্বিকভাবে সহায়তা করে সরকার, যা ২০২৩ বা ২০২৪ সালের নির্বাচনে বর্তমান সরকার করবে বলে বিশ্বাস। কারণ বিশ্বের দৃষ্টি এখন বাংলাদেশের দিকে। যাঁরা মিডিয়ায় কথা বলতে যান বা যাঁরা জনগণের সামনে কথা বলেন, তাঁদের বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও ওয়াকিবহাল থাকা প্রয়োজন। বর্তমান সরকার তার তিন মেয়াদে দেশকে যা দিয়েছে, অন্য কোনো সরকার কি তা দিতে পেরেছে? এসব বিষয় তো জনগণের সামনে স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরা সরকারি দলের নেতাকর্মীরই দায়িত্ব।
স্বীকার করতে হবে- বর্তমান সরকারের বড় শত্রু দুর্নীতি। দুর্নীতি সাধারণ মানুষ করে না- এই কথা জাতির পিতা বাংলাদেশের জন্মলগ্নেই বলেছেন। এটি কারা করে, তা সরকারেরও অজানা নয়। দেশ ও দলের স্বার্থে এদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা এখন জরুরি। সরকারের ভেতরে বেশ কিছু অপদার্থ ব্যক্তি বহাল তবিয়তে। তাঁরা প্রধানমন্ত্রীকে নানা অসত্য তথ্য দিয়ে থাকেন। এটি মনে হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে- তাঁরা সরকারের বিরুদ্ধেই কাজ করছেন। তাঁরা যত সত্বর বিদায় হন ততই মঙ্গল।
আবদুল মান্নান: বিশ্নেষক ও গবেষক