জ্বালানি সংকটে শিল্প খাতের এখন দুঃসময়। গ্যাসের অভাবে ধুঁকছে বস্ত্র ও পোশাক খাতের উৎপাদন। টিমটিম করে যেসব কারখানা চালু রাখা হয়েছে, সেগুলোর উৎপাদনও সক্ষমতার প্রায় অর্ধেক। একে তো গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ নেই, তার ওপর আছে বিদ্যুতের আসা-যাওয়ার খেলা। অর্থাৎ মানসম্পন্ন জ্বালানির অভাবে উৎপাদিত পণ্যের বড় একটা অংশই এখন মানহীন। পরিত্যক্ত পণ্য হিসেবে ট্যাগ লাগানো পণ্য ক্রেতারা নেয় না।

জ্বালানি সংকটের এই পরিণতি নিয়ে বিদেশি ক্রেতারাও এখন বেশ সতর্ক। তারা পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখছেন। সময়মতো পণ্য হাতে পাওয়া যাবে না- এ শঙ্কায় রপ্তানি আদেশ অন্তত ৩০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে তারা। যতটুকু রপ্তানি আদেশ আছে তাও সরবরাহ করা যাচ্ছে না বিঘ্নিত উৎপাদন পরিস্থিতিতে। গত ছয় মাসের বেশি সময় ধরে বস্ত্র ও পোশাক খাতে চলছে এই সংকট।

বস্ত্র ও পোশাক খাতের এই দুর্দিনে নীরবে নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদনের চাকা সচল রেখেছে দেশের একটি বস্ত্রকল। ক্রেতাদের রপ্তানি আদেশের বস্ত্র পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে যথাসময়ে। পাশাপাশি গ্যাসের অভাবে উৎপাদন সংকটে থাকা দেশের বড় কয়েকটি বস্ত্রকলকেও এই দুঃসময়ে সহযোগিতা করা হচ্ছে। ক্রেতাদের সঙ্গে চুক্তি করার সময় পণ্য সরবরাহ করতে ব্যর্থ বস্ত্রকলের বস্ত্রও উৎপাদন করে দেওয়া হচ্ছে।

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের দুপতারার মিথিলা টেক্সটাইল মিলসের এই বাজিমাতের রহস্য নিজস্ব স্টিম প্ল্যান্ট। ২০১৮ সালে সংযোজিত জাপানি এ প্রযুক্তির 'তুরুপের তাস' হচ্ছে ধানের তুষ। তুষ পুড়িয়ে নিজেরাই উৎপাদন করে স্টিম বা বাষ্প।

আহামরি কোনো প্রযুক্তি নয়। প্রয়োজন হয় না বড় অঙ্কের বিনিয়োগ। তবে রয়েছে বিশাল আকারের অটো রাইস মিল। ঘণ্টায় ১০ টন চাল ছাঁটাইয়ে সক্ষম নিজস্ব এই রাইস মিল ২৪ ঘণ্টা চালু থাকে। মোট চালের তিন ভাগের এক ভাগ তুষ পাওয়া যায়।

এই তুষই গ্যাসের বিকল্প হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে। এতেই দিব্যি চলছে মিথিলা টেক্সটাইলের উইভিং, ডায়িং, ওয়াশিং, ফিনিশিং- এই চার ইউনিটের কাজ। নিরবচ্ছিন্ন নিজস্ব জোগান থাকায় গ্যাসের সংকটে স্টক লটও নেই। ঘুরছে ঘড়ি, চলছে চাকা। হুগোবস, সিঅ্যান্ডএ, জারা, জেসিপেনির মতো বিশ্ববিখ্যাত ব্র্যান্ডের রপ্তানি আদেশ আসে ১২ মাস।

সবুজ প্রযুক্তির সনদের লিডের (লিডারশিপ ইন এনভায়রনমেন্ট ডিজাইন) সর্বোচ্চ মান প্লাটিনামধারী বিশ্বের প্রথম এবং একমাত্র ওভেন টেক্সটাইল কারখানা মিথিলা টেক্সটাইল। আর সব ধরনের শিল্পের বিবেচনায় মিথিলার অবস্থান বিশ্বে পঞ্চম।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড স্টেট গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল (ইউএসজিবিসি) এ সনদ দিয়ে থাকে। ভবন নির্মাণ থেকে শুরু করে উৎপাদনের সব পর্যায়ে পরিবেশ এবং প্রতিবেশ সুরক্ষা, সাশ্রয়ী এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার; এমনকি শ্রমিকের স্বার্থ কতটা সুরক্ষা পেল- এসব কঠিন নিক্তির মাপে বছরের পর বছর যাচাইয়ের মাধ্যমে লিড সনদ দিয়ে থাকে ইউএসজিবিসি। ২০১৮ সালে মিথিলাকে লিড প্লাটিনাম সনদ দিয়েছে ইউএসজিবিসি। লিডের চার ক্যাটাগরির মধ্যে প্লাটিনাম সর্বোচ্চ মানের। গোল্ড, সিলভার ও সাধারণ সনদ নামে আরও তিনটি ক্যাটাগরি রয়েছে।

প্রতিদিন ২০ হাজার ১৬০ কিউবিক মিটার গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে এ প্রক্রিয়ায়। তাতে মিথিলা গ্রুপের চার ইউনিটের মোট চাহিদার ৭০ শতাংশের জোগান হচ্ছে। মিথিলার উইভিং, ডায়িং ও ফিনিশিং করা ৬০ লাখ গজ বস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে প্রতি মাসে। গ্যাসের এই সংকটকালে দেশের বৃহত্তম দুটি টেক্সটাইল মিলে মাসে ১৫ লাখ গজ বস্ত্র সরবরাহ করা হচ্ছে মিথিলা থেকে।

বিকল্প এই বাষ্প উৎপাদনে একদিকে জাতীয় গ্রিডের ১ কোটি টাকা মূল্যের গ্যাস সাশ্রয় হচ্ছে প্রতি মাসে। জাতীয় গ্রিডে এতে চাপও কিছুটা কমছে। তবে বিকল্প এ প্রক্রিয়ায় বাষ্প উৎপাদন খরচ জাতীয় গ্রিডের গ্যাসের মূল্যের চেয়ে প্রায় তিন গুণ। এ প্রক্রিয়ায় বাষ্প পেতে মোটামুটি ৫০ কোটি টাকার মতো প্রাথমিক বিনিয়োগ করা হয়েছে। তবে প্রায় স্বয়ংক্রিয় মেশিনারিজ আমদানি এবং সংযোজনে অন্তত ২ বছর সময় লেগে যায়। 

মিথিলা টেক্সটাইলে গত মঙ্গলবার গিয়ে দেখা যায় ধানের তুষকে কীভাবে বাষ্পে রূপান্তর করা হচ্ছে। মেশিনের মুখে ঢেলে দেওয়া আস্ত ধান বের হচ্ছে বাষ্প হয়ে। গোটা প্রক্রিয়া বিশাল এলাকাজুড়ে চলছে এত বড় কর্মযজ্ঞ, তবে স্বয়ংক্রিয় হওয়ায় প্রায় জনমানবহীন প্ল্যান্ট এলাকা।

মিথিলা গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. আজহার খান জানান, রপ্তানি আদেশের অভাব নেই। বছরজুড়ে কাজ থাকে। পৃথিবীর বিখ্যাত সব ব্র্যান্ড তাদের বস্ত্র আমদানি করে থাকে। দর নিয়েও খুব বেশি কষাকষির প্রয়োজন হয় না। নিজস্ব প্লান্টের গ্যাসের বিকল্প বাষ্পের কারণে উৎপাদন খরচ বেশি হলেও বাণিজ্যিকভাবে খুব বেশি সমস্যা হয় না। অনেক বস্ত্র ও পোশাক কারখানা যেখানে বন্ধ, সেখানে মিথিলার উৎপাদন চলছে মোটামুটি নির্বিঘ্নে। উৎপাদিত চাল বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত হচ্ছে সফলভাবে। মিথিলা গ্রুপের ১৫'শ শ্রমিক পরিবারের সারা বছরের চাল দেওয়া হচ্ছে রেয়াতি মূল্যে। কারখানার তাদের তিন বেলা খাবারও দেওয়া হচ্ছে ভর্তুকি মূল্যে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক বদরুল ইমাম সমকালকে বলেন, গ্যাস সংকট যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাতে এ ধরনের বিকল্প জ্বালানি অবশ্যই প্রশংসার। খরচ কিছুটা বেশি হলেও সংকটকালে উৎপাদন চলছে; সেটা অনেক বড় পাওয়া। শিল্পে বিনিয়োগের স্বার্থে এ ধরনের উদ্যোগকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। গবেষণা সংস্থা সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জমও মনে করেন, এটি শিল্প কারখানায় এই আকালে বিকল্প জ্বালানির নতুন পথ দেখাবে।