বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা কারণে জিনিসপত্র ও ডলারের দাম বৃদ্ধি এবং বাজারে অব্যবস্থাপনার কারণে নিম্ন আয়ের পরিবারে ব্যয় বেড়েছে গড়ে ১৩ শতাংশ। তবে এ সময় তাদের কোনো আয় বাড়েনি। ফলে বাড়তি এ ব্যয় সামাল দিতে গত ছয় মাসে নিম্ন আয়ের ৭৩ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ অর্থ ধার করে চলেছে। সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে।

বুধবার রাজধানীর মহাখালী ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলন এ তথ্য তুলে ধরেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান। জরিপটি গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত- এ ছয় মাসের। দেশের ৮ বিভাগের ১ হাজার ৬০০ পরিবারের ওপর করা এই জরিপের ফলাফল তুলে ধরে সানেম। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আছেন ৪০ শতাংশ এবং ৬০ মানুষ এ আওতার বাইরে।

তবে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, দেশে দরিদ্র জনগোষ্ঠী বেড়েছে, না কমেছে, তা তুলে ধরার জন্য এই জরিপ করা হয়নি। জরিপটি করা হয়েছে মূল্যস্ফীতির চাপে দরিদ্র মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক চাপের বিষয়টি নীতিনির্ধারকদের সামনে নিয়ে আসার জন্য।

সংবাদ সম্মেলনে জরিপে ফলাফল সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরে সেলিম রায়হান বলেন, ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ৭৩ দশমিক ৮ শতাংশ পরিবার ঋণ করে চলেছে। ৩৫ শতাংশ পরিবার তাদের সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে। ৫৫ পরিবার সঞ্চয় বিমুখ হচ্ছে। তবে জিনিসপত্রের দাম এভাবে বাড়তে থাকলে আরও ৮৫ পরিবারের মানুষ মনে করে তাদের ঋণ করা ছাড়া বিকল্প নাই। আর ৪১ শতাংশ পরিবার মনে করে ভবিষ্যতে তাদের ভিক্ষা অথবা শর্তহীন সাহায্য নিয়ে চলতে হতে পারে।

গত ৬ মাসে প্রায় ৯০ শতাংশ পরিবারের মানুষ তাদের খাদ্যভ্যাসে পরিবর্তন এনেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর মধ্যে ৯৬ দশমিক ৪ শতাংশ পরিবার মাংস খাওয়া কমিয়েছে। মাছ খাওয়া কমিয়েছে ৮৮ দশমিক ২২ শতাংশ পরিবার। এছাড়া ৭৭ শতাংশ পরিবার ডিম ও ৮১ দশমিক ৪৩ শতাংশ পরিবার ভোজ্যতেল খাওয়া কমিয়েছে। এছাড়াও অনেক মানুষ খাবারের গুনগত মান কমিয়েছেন। অর্থাৎ আগের চেয়ে কমদামি খাবার খাচ্ছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জরিপের আগে পরিবারগুলো মাসে অন্তত চারবার মুরগি, ৮ বার ডিম, ৬ বার রুই-কাতলা মাছ এবং একবার গরুর মাংস খেতেন। কিন্তু এখন মাসে মুরগি ২ বার, ডিম ৬ বার, রুই-কাতলা মাছ ৪ বার এবং গরুর মাংস খায় না বললেই চলে।

তবে খাদ্যের বাহিরেও পরিবারগুলো ব্যয় কমিয়েছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, জামাকাপড় বাবদ ব্যয় কমিয়েছেন ৯২ শতাংশ পরিবারের মানুষ। স্বাস্থ্যে ব্যয় কমিয়েছে ৬১ শতাংশ পরিবার। এ ছাড়াও ৫৮ শতাং পরিবারে ইউটিলিটি খরচ এবং ৪৫ শতাংশ পরিবার শিশুদের শিক্ষা ব্যয় কমাতে বাধ্য হয়েছেন।

সানেমের জরিপে দেখা গেছে, তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এমন পরিবারের সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে ২৫ শতাংশ পরিবার খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। যা ৬ মাস আগে ছিল ১২ শতাংশ। এরমধ্যে শহরে প্রায় ৩১ এবং গ্রামে ২০ শতাংশ পরিবারের মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

এছাড়া জরিপে অংশ নেওয়াদের মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় যে ৪০ শতাংশ পরিবার রয়েছে। এর মধ্যে ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার টিসিবি এবং ওএমএসের পণ্যের আওতাভুক্ত। এ ছাড়াও বয়স্ক ভাতার অধীনে ৭ শতাংশ এবং বাকিরা অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ভবিষ্যত জীবন কীভাবে পরিচালনা করা হবে এমন প্রশ্ন করা হয়েছিল জরিপে অংশগ্রহণকারীদের। তাদের ৮৫ শতাংশ পরিবারের মানুষ মনে করেন আবার তাদের ঋণ করতে হবে। ৫৩ শতাংশ পরিবার বলেছে, তাদের পরিবারের কর্মহীন ব্যক্তিকে কর্মে যুক্ত হতে হবে। ৪১ শতাংশ পরিবারের মানুষ মনে করেন ভবিষ্যতে তাদের ভিক্ষা অথবা শর্তহীন সাহায্য নিয়ে চলতে হতে পারে। ২৪ শতাংশ পরিবার মনে করে ব্যয় কমাতে তাদের সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ করতে হতে পারে। ১৯ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে টিকে থাকার জন্য তাদের শিশুদের শিশুশ্রমে নিযুক্ত করা লাগতে পারে। জমি বিক্রি করে চলতে হতে পারে বলে মনে করে ১৭ শতাংশ পরিবার।

এ জরিপে উঠে আসা সমস্যাগুলোর সমাধানে কিছু পরামর্শ দিয়েছে সানেম। সংস্থাটি বলেছে, মূল্যস্ফীতি হচ্ছে প্রান্তিক মানুষের জন্য করের সবচেয়ে নিষ্ঠুরতম ধরন। তাই মূল্যস্ফীতি এবং খাদ্য নিরাপত্তাহীনতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। বাজারে পণ্যের সরবরাহ বাড়াতে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়াতে হবে। পাশাপাশি আমদানির জন্য বিকল্প উৎস খুঁজতে হবে। একই সঙ্গে খাদ্যপণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা আরও বিস্তৃত করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে জরীপের ফলাফল নিয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান ও অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা।

এক প্রশ্নের জবাবে সেলিম রায়হাম বলেন, করোনার পর অনেকেই ঘুরে দাঁড়াত পারেনি। এর মধ্যে পণ্যমূল্য বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে আরও সংকটে পড়েছেন তারা। বাজারে হুটহাট জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়। কিন্তু কেন বাড়ে সেই কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। এক্ষেত্রে বাজার তদারকির দায়িত্বে যারা রয়েছেন তাদের দায়িত্বশীল হতে হবে। সরকারের উদ্যোগে ব্যবসায়ীদের বাজার ব্যবস্থাপনা ও পণ্যের দামের বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।

সেলিম রায়হান বলেন, নিত্যপণ্যের বাজারের নিয়ন্ত্রণ কয়েকটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে। তারা একচেটিয়া ব্যবসা করে যাচ্ছে। বাজারের এ অব্যবস্থাপনা নিরসনে সরকারকে তড়িৎ পদক্ষেপ নিতে হবে।

আরেক প্রশ্নের জবাবে বিদিশা হক বলেন, সংসারে খরচ বেড়ে যাওয়ায় পরিবারগুলো স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ে কাটছাঁট করছে। অনেকে জমিজমা বিক্রি করে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এ ছাড়া আমিষে কাটছাঁটের কারণে শিশুরা অপুষ্টিতে ভুগবে। যা দীর্ঘমেয়াদে সমস্যা তৈরি করবে। এদিকে সরকারের নজর দেওয়া জরুরি।

সানেম জানিয়েছে, দেশের ৮টি বিভাগে নির্দিষ্ট এলাকা থেকে গ্রাম ও শহর ভাগ করে এই জরিপ চালিয়েছে তারা। তথ্য নেওয়া হয়েছে বিভাগীয় শহরের বস্তি এলাকা এবং ওই বিভাগের নির্দিষ্ট উপজেলা থেকে। এ ছাড়া উপজেলা পর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ করতে নির্দিষ্ট উপজেলার চারটি গ্রামের নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে গেছে সানেম। সংস্থাটি নিম্ন আয়ের মানুষ ধরণ নির্ধারণ করতে বিশ্ব ব্যাংকের দেওয়া সংজ্ঞা ও পদ্ধতিকে অনুসরণ করেছে।