চলমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে যে সব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তা অপর্যাপ্ত। চলমান সার্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো স্বীকারও করা হয়নি। এ সময়ে সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় পদক্ষেপ নিতে এ বাজেট ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়া বাজেটের আয় ও ব্যয় কাঠামো নির্ধারণের ক্ষেত্রে চলতি অর্থবছরের বাস্তবায়ন অভিজ্ঞতাকে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। জিডিপি, মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি বিনিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনুমিত প্রাক্কলনের সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই। কাঠামোগত এ দুর্বলতার কারণে প্রস্তাবিত বাজেট ‘অলীক’ এবং বাস্তবায়নের অযোগ্য।

আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বিশ্লেষণে এমন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডি। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর গুলশানে হোটেল লেকশোরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সিপিডির পর্যালোচনা তুলে ধরেন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। সংস্থার সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খানসহ অন্যরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

সিপিডির পর্যালোচনায় বলা হয়, অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ, বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ জিডিপির ২২ থেকে ২৭ শতাংশে নিয়ে যাওয়া ও মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি চলতি অর্থবছরজুড়ে যেখানে লক্ষ্যমাত্রার অনেক ওপরে রয়েছে। আবার বাজেটে অর্থনৈতিক সংস্কারের উদ্যোগও নেই।

পর্যালোচনায় বর্তমান সময়ের অর্থনীতির একটি চিত্র তুলে ধরে হয় সিপিডির পক্ষ থেকে। এতে বর্তমান অর্থনীতিকে ভঙ্গুর হিসেবে মন্তব্য করা হয়। বলা হয়– কম রেমিট্যান্স, বৈদেশিক মুদ্রার ক্রমশ নিম্নমুখী প্রবণতা, রপ্তানি আয়ে পতন, প্রয়োজনীয় আমদানি করতে না পারার পাশাপাশি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ঘাটতিতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

বাজেটে আইএমএফের শর্তের প্রতিফলন প্রসঙ্গে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, আইএমএফের শর্তের বিষয়ে প্রস্তাবিত বাজেটে প্রচ্ছন্ন আভাস রয়েছে। বিভিন্ন প্রস্তাবনায় আইএমএফের শর্ত পরিপালন করা হয়েছে। এ কারণে রাজস্ব আহরণে সরকারকে মরিয়া মনে হয়েছে। তবে আইএমএফের প্রসঙ্গটি কোথাও উল্লেখ করা হয়নি। কর আদায়ে এজেন্সি নিয়োগেরও সমালোচনা করা হয় সিপিডির পর্যালোচনায়। বলা হয়, এতে মধ্যস্বত্বভোগী তৈরি হবে। করদাতাদের মধ্যে অস্থিরতা দেখা দেবে। এক্ষেত্রে দুর্নীতির শঙ্কা রয়েছে। এ বিষয়টি কার্যকরের আগে অবশ্যই সব পক্ষের মধ্যে আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।

সামাজিক নিরাপত্তা খাতের বরাদ্দ যথেষ্ট নয় বলে মনে করে সিপিডি। সংস্থার পর্যালোচনায় বলা হয়, সংশোধিত বাজেটের বরাদ্দের চেয়ে প্রস্তাবিত বাজেট বেড়েছে মাত্র ৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ, যা গত ১০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। ২০১০-১১ থেকে ২০২২-২৩ পর্যন্ত এ খাতের গড় বরাদ্দ বেড়েছিল ১৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ হারে। সামাজিক সুরক্ষা খাতে সরকারি কর্মকর্তাদের পেনশন থাকার সমালোচনা করে সিপিডি বলেছে, এ খাতের মোট বরাদ্দের ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ চলে যাচ্ছে পেনশনের পেছনে। পেনশন বাদ দিলে সামাজিক সুরক্ষায় চলতি অর্থবছরের জিডিপির ২ দশমিক ১৫ থেকে কমে ১ দশমিক ৯৭ শতাংশ হয়েছে।

কিছু বিষয়ে বাজেটের পদক্ষেপের প্রশংসাও করা হয়েছে সিপিডির পক্ষ থেকে। এ প্রসঙ্গে ফাহমিদা খাতুন বলেন– পরিবহন, যোগাযোগ, জ্বালানি, বিদ্যুৎসহ ৫টি খাতে অগ্রাধিকার নির্ধারণ যথার্থই করেছে সরকার। করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে তিন লাখ টাকায় উন্নীত করার পদক্ষেপ ইতিবাচক। তবে টিআইএন থাকলেই ২ হাজার টাকা কর আদায় প্রস্তাবের সমালোচনা করা হয়েছে। সিপিডি বলেছে, করযোগ্য আয়সীমার নিচে যার আয়, টিআইএন থাকার কারণে তার কাছে আয়কর আদায়ের প্রস্তাব অন্যায্য।

প্রশ্নোত্তর পর্বে অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থনীতির বিভিন্ন চলকের যে অনুমিত প্রাক্কলন তার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। এ দুর্বলতার কারণে এসবের প্রতিটি ক্ষেত্রেই অভিঘাত আসবে। বাজেট বাস্তবায়ন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতির সার্বিক পরিস্থিতিতে চলতি অর্থবছর বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ কমেছে। সেখানে আগামী অর্থবছর বেসরকারি বিনিয়োগ অতিরিক্ত ৬ শতাংশ বাড়ানো কীভাবে সম্ভব হতে পারে। বিভিন্ন প্রাক্কলন নির্ধারণের সময় বাস্তবতা বিবেচনা না করার কারণে বাজেট বাস্তবায়ন হয় না।

বাজেটের অন্যতম দুর্বলতা হিসেবে প্রত্যক্ষ করের চেয়ে পরোক্ষ করের প্রতি বেশি নির্ভরতার কথা বলেন ড. মোস্তাফিজ। তিনি বলেন, বছর বছর এই প্রবণতার কারণে মানুষের মধ্যে আয়বৈষম্য বাড়ছে। ভর্তুকি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভর্তুকি লাগবেই। জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ভর্তুকির প্রয়োজন রয়েছে। খেলাপি ঋণ প্রসঙ্গে বলেন, ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ নিয়ে যেন কারও কোনো মাথাব্যথা নেই। এত বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণের কারণে সার্বিক অর্থনীতি চাপে পড়ে। কারা এ ধরনের ঋণ নেয়, কীভাবে নেয়– বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করা দরকার। একটি স্বাধীন কমিশন করা দরকার।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বাজেটের বড় দুর্বলতা হচ্ছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কোনো পদক্ষেপ না থাকা। সামাজিক নিরাপত্তায় কম বরাদ্দের সমালোচনা করে প্রতিটি কর্মসূচিতে জনপ্রতি অন্তত আড়াই হাজার টাকা বরাদ্দ থাকা প্রয়োজন। কর ফাঁকি বাবদ বছরে ২ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব বঞ্চিত হয় সরকার। এ অর্থ পাওয়া গেলে বরাদ্দ নিয়ে সমস্যা হয় না। বড় ব্যবসায়ী এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের স্বার্থে প্রত্যক্ষ কর বাড়াতে সরকারের অনীহা রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণের কারণে আগামীতে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে।








বিষয় : চলমান সংকট

মন্তব্য করুন