ইউরোপীয় পার্লামেন্টে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতিতে উদ্বেগ জানিয়ে গৃহীত প্রস্তাব নিয়ে দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের মধ্যে। বর্তমানের শুল্কমুক্ত সুবিধা ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ এর মেয়াদ বাড়ানো এবং ‘জিএসপি প্লাস’-সংক্রান্ত আলোচনার জন্য পার্লামেন্টের এ প্রস্তাবকে ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন তারা। বাণিজ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, তাদের উদ্বেগ গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিতে হবে। আলোচনার মাধ্যমেই আপত্তির সুরাহা করতে হবে।

বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান সমকালকে বলেন, ইউরোপীয় পার্লামেন্টের গৃহীত প্রস্তাব ‘জিএসপি প্লাস’ আলোচনায় বাংলাদেশকে পেছনে ফেলে দিল। বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে সরকারকে। অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন, মানবাধিকারসহ যেসব বিষয়ে তাদের আপত্তি, সেগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিতে হবে। আলোচনার মাধ্যমেই আপত্তির সুরাহা করতে হবে। যাতে ব্যবসা-বাণিজ্য বিশেষত রপ্তানি যেন নতুন করে কোনো সংকটে না পড়ে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের যা করণীয় তাও যথাযথভাবে করতে হবে।

ফারুক হাসান বলেন, বিজিএমইএর পক্ষ থেকে এ পর্যন্ত তিন দফা ব্রাসেলসে ইইউ পার্লামেন্টের প্রভাবশালী কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে বৈঠক করেছেন তিনি। ব্যবসা এবং বিনিয়োগকে যাতে সব ধরনের রাজনীতির বাইরে রাখা হয়, তার সুপারিশ করেছেন এসব বৈঠকে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নিতে চান তারা। এ বিষয়ে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সঙ্গেও কথা হয়েছে বলে জানান তিনি।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষক এবং গবেষণা সংস্থা র‌্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. আব্দুর রাজ্জাক মনে করেন, ইইউর বিবৃতি অত্যন্ত উদ্বেগের কারণ। বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। সরকারকে এ বিষয়ে  ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত হতে হবে। না হলে রপ্তানি খাতের জন্য হয়তো বিপদ অপেক্ষা করছে। কারণ, ইইউ চাইলে যে কোনো মুহূর্তে শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা প্রত্যাহার করতে পারে। এ রকম উদাহরণ আছে। মানবাধিকার ইস্যুতে আপত্তির কারণে কম্বোডিয়ার বিরুদ্ধে  শাস্তি হিসেবে সে দেশের ১০ শতাংশ পণ্যের ওপর শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা প্রত্যাহার করেছে ইইউ। এরপর  ওই ১০ শতাংশ পণ্যে ১২ শতাংশ শুল্কারোপ হয়েছে। এতে তাদের রপ্তানি হোঁচট খেয়েছে। ২০২০ সালে আরোপ করা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এখনও বহাল আছে।

বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতিতে গভীর উদ্বেগ জানিয়ে ইইউ পার্লামেন্টে গত বৃহস্পতিবার একটি প্রস্তাব কণ্ঠভোটে গৃহীত হয়। এতে বলা হয়, বাংলাদেশের জন্য ইইউর অবাধ বাজার সুবিধা ‘এভরিথিং বাট আর্মস’-এর (ইবিএ) পরিসর আরও বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলমান। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক সনদ লঙ্ঘনের মাধ্যমে মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের মামলাটি একটি পশ্চাদ্‌গামী পদক্ষেপ, যা উদ্বেগের। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ইবিএ সুবিধা অব্যাহত রাখা উচিত কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। প্রস্তাবে সরকারের প্রতি নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার চর্চার বিষয়ে আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুসরণের আহ্বান জানানো হয়েছে।

জানা গেছে, স্বল্পোন্নত দেশের জন্য ইইউ জিএসপি স্কিমের মেয়াদ ১০ বছরের জন্য হয়ে থাকে। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পর্যালোচনা করে নতুন করে আবার মেয়াদ বাড়ানো হয়। চলতি মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। এ-সংক্রান্ত একটি খসড়া ২০২১ সালে করা হয়েছে, যা ইইউ পার্লামেন্টে এখনও পাস হয়নি। অন্যদিকে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর ‘জিএসপি প্লাস’ স্কিমের জন্য যোগ্য বিবেচিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে ‘জিএসপি প্লাস’ স্কিমে ইইউ বাজারে একক কোনো দেশের পণ্যের দাপট ঠেকাতে যে সীমা থাকে, তার বেশি রয়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের ।

ড. আব্দুর রাজ্জাক আরও বলেন, এমন বাস্তবতায় ইইউর বিবৃতিতে ইবিএ সুবিধা অব্যাহত রাখা উচিত কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। ফলে বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্য রাখে। এ বিষয়ে সরকারকে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হবে।

দেশের মোট রপ্তানি আয়ে সমজাতীয় পণ্যসহ তৈরি পোশাকের হিস্যা ৮৬ শতাংশ। এসব পণ্য সারাবিশ্বে যে পরিমাণ রপ্তানি হয়, তার অর্ধেকেরও বেশি রপ্তানি হয় ইইউর ২৭ দেশে। বাংলাদেশের পোশাকের বাজার হিসেবে ইইউর অংশ ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশের মধ্যে থাকে। গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে ইইউতে ২ হাজার ৩৫৩ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর অতিরিক্ত ৩ বছর এ সুবিধা অব্যাহত থাকার কথা। ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে বেরিয়ে আসবে বাংলাদেশ।

বিজিএমইএ সভাপতি জানান, ২০৩২ সাল পর্যন্ত শুল্কমুক্ত সুবিধা অব্যাহত রাখার জন্য অনুরোধ জানিয়ে এ নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। ইইউতে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির ৯৩ শতাংশই তৈরি পোশাক।