ঢাকা রবিবার, ১৯ মে ২০২৪

রম্য

কোয়ারেন্টাইন হোক ভ্যালেন্টাইন

কোয়ারেন্টাইন হোক ভ্যালেন্টাইন

রাজীব সরকার

প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২০ | ১৪:৩৩ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০

করোনাভাইরাস মহামারি আকারে ছড়িয়ে সারা পৃথিবীকে থমকে দিয়েছে। এর আগেও যুদ্ধ, খরা, ব্যাধি পৃথিবীকে নাড়া দিয়ে গেছে। কিন্তু করোনার ভূমিকা একেবারেই অভিনব। মানুষের বেঁচে থাকার অমোঘ শর্ত যূথবদ্ধতাকে চ্যালেঞ্জ করেছে করোনা। এই প্রথম এমন একটি রোগের আবির্ভাব ঘটল, যে রোগের প্রধান পথ্য স্বার্থপরতা। স্বার্থপরের মতো নিঃসঙ্গ হওয়া, একাকিত্বের মধ্যেই সুস্থ থাকা। নিজে যদি সুস্থ থাকা যায় তবেই সম্ভব পরিবারের অন্য সদস্যদের ও সমাজকে সুস্থ রাখা। তাই বিশ্বব্যাপী 'কোয়ারেন্টাইন' ও 'আইসোলেশন' এই শব্দ দুটি খুব আলোচিত হচ্ছে। সেলিব্রিটি থেকে আমজনতা যখন-তখন কোয়ারেন্টাইনে যাচ্ছেন। তাদের জীবনাচরণে তিরিশের অন্যতম কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কণ্ঠের প্রতিধ্বনি- 'সহে না সহে না আর জনতার জঘন্য মিতালী।'

কোয়ারেন্টাইন নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। বহির্মুখী পুরুষ বাধ্য হয়ে চার দেয়ালে বন্দি। তাদের মধ্যে অনেকেই আতঙ্কিত। ২৪ ঘণ্টা অর্ধাঙ্গিনীর নজরদারিতে থাকার 'লাইফ টাইম এক্সপেরিমেন্ট'কে অনেকেই সহজভাবে নিতে পারেননি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতোমধ্যেই 'গৃহযুদ্ধের নানা' খবর ছড়িয়ে পড়েছে। গৃহবধূ তার স্বামীর আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে বিচারকের দরবারে নালিশ করে জানালেন, তার স্বামী সারাদিন খায়, ঘুমায় আর ফেসবুকে চ্যাট করে। রান্না করে না, কোনো কাজ করে না। সারাদিন শুধু খেতে চায়। বিচারক সব শুনে বললেন, জেনেভা চুক্তি অনুযায়ী বন্দিকে খাওয়ানো বাধ্যতামূলক।

কোয়ারেন্টাইন শব্দের অর্থ সঙ্গনিরোধ। সঙ্গনিরোধে থাকতে গিয়ে জন্মনিরোধ ঝুঁকির মুখে। পুরুষরা গণহারে গৃহবন্দি হওয়ার প্রাক্কালে বাজারে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর চাহিদা বেড়ে যায়। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশের উদ্বেগ স্বভাবতই বেশি। নিন্দুকেরা প্রশ্ন করেন, কোয়ারেন্টাইনের অবকাশে যদি জনসংখ্যার বিস্টেম্ফারণ ঘটে, তবে এ দায় কার? ভাগ্যিস লবণ ও পেঁয়াজের মতো জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীও বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না- এমন গুজবের জন্ম হয়নি। করোনায় যে দেশগুলোয় প্রাণহানি বেশি হয়েছে, সেগুলোর অন্যতম যুক্তরাষ্ট্র। এই দুর্যোগের মধ্যেও দেশটির একটি গবেষণা সংস্থা জানিয়েছে, স্ত্রীকে হাসিখুশি রাখলে স্বামীর আয়ু বৃদ্ধি পায়। সন্দেহ নেই, করোনাকালীন বিশ্বে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিস্কার। স্বামী বেচারারা মহাবিপদে পড়েছেন। স্ত্রীকে হাসিখুশি রাখা- এই অরণ্যে রোদন করতে গিয়ে যে গলদঘর্ম দশা হতে হবে, তা ভেবেই তো অধিকাংশ স্বামীর আয়ু কমে যায়। স্ত্রীদের ভাগ্যবতী বলতে হবে। কেননা স্বামী হাসিখুশি থাকলে স্ত্রীর আয়ু বাড়বে কিনা, এ নিয়ে গবেষণা সংস্থাটি কিছু জানায়নি।

করোনার অন্যতম ট্র্যাজেডি হচ্ছে, প্রত্যেক সংসার থেকে গৃহকর্মীদের ছুটি দেওয়া হয়েছে অনির্দিষ্টকালের জন্য। গৃহকর্মীর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন গৃহস্বামীরা। এ ক্ষেত্রে গৃহস্বামীদের 'পারফরম্যান্স' যে আশাব্যঞ্জক নয়, তা তো বলাই বাহুল্য। বিরক্ত হয়ে গৃহিণীরা বলতে শুরু করেছেন, স্বামী ছাড়া তবু চলে, গৃহকর্মী ছাড়া এক মুহূর্তও চলে না। ঘরে থেকে থেকে বিরক্ত হয়ে এক স্বামী তার স্ত্রীকে বললেন, 'এভাবে শুয়ে-বসে আর ভালো লাগছে না। অফিস খোলার পর আমি এক সপ্তাহের ছুটি নিয়ে বিশ্রাম নেব।'

গৃহিণীরাও স্বস্তিতে নেই। তাদের ওপর কাজের চাপ বেড়ে গেছে। এরপর সারাক্ষণ স্বামী বেচারার মলিন বদন দর্শন। অবশ্য এই বদন মলিন হলে তারা নয়ন জলে ভাসেন না। বরং উল্টো চিত্র দেখা যায়। গৃহস্বামীদের নাকের জল, চোখের জল একাকার হয়। তবে সেটি কতটা পেঁয়াজের ঝাঁজ আর কতটা স্ত্রীর ঝাঁজের কারণে তা বোধগম্য নয়। স্ত্রীর সঙ্গে কোয়ারেন্টাইনে যাওয়ার আগে এক স্বামী তাই ঘোষণা দিলেন, 'যদি আমার মৃত্যু হয়, তবে নিশ্চিতভাবে জেনে নিও এর জন্য করোনাভাইরাস দায়ী নয়।'

ঘর বাঁধার আগে হবু স্বামী-স্ত্রী কত স্বপ্নই না দেখেছেন। বিটিভিতে প্রচারিত পুরোনো দুটি বিজ্ঞাপন স্মরণ করা যেতে পারে। হবু স্বামীকে তার ভাবী স্ত্রী বলছেন, 'এক শর্তে করতে পারি বিয়া, আমাগো ঘর বানাও যদি অমুক টিন দিয়া।' এটি গ্রামের চিত্র। আরেকটি বিজ্ঞাপনে ফুটে উঠেছে শহুরে উচ্চবিত্ত সমাজের চিত্র। স্বামী-স্ত্রী মিলে ঠিক করছেন, কোন ঘরের রং কী হবে। তারা ঐকমত্যে পৌঁছান যে- বসার ঘর গোলাপি হবে, স্টাডিরুম সবুজ রঙের, ডাইনিং স্পেস বিস্কিট রঙের আর শোয়ার ঘরটা নীল রঙের হবে। বেনীআসহকলার স্বপ্ন নিয়ে সংসার শুরু করতে না করতেই স্বামী-স্ত্রী চোখে শুধু একটি রংই দেখতে পান- হলুদ সরষে ফুলের রং। বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইন তাই অনেক স্বামীর কাছেই চোখে সরষে ফুল দেখার শামিল।

যা হোক, করোনা থেকে দেশকে, দেশের মানুষকে রক্ষা করতে নিজের ঘর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল। সমাজকে বাঁচানোর জন্য, প্রিয়জনকে শঙ্কামুক্ত রাখার জন্য সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার কোনো বিকল্প নেই। অপ্রয়োজনে বাইরে যাওয়া ও সামাজিক জমায়েত থেকে যদি নিজেদের বিরত রাখতে পারি, তাহলে কভিড-১৯ রোগ নির্ণয় পরীক্ষার চাপ বহুলাংশে কমবে। এতে সংকটাপন্ন রোগীদের প্রতি চিকিৎসকরা অধিক মনোযোগ দিতে পারবেন। ঘরে থাকার ফলে নতুন করে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমে যাবে। এতে বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকরা সময় পাবেন এই ব্যাধির প্রতিষেধক আবিস্কারের জন্য।

কোয়ারেন্টাইন হতে পারে ভ্যালেন্টাইনের নামান্তর। কোয়ারেন্টাইন ডে-কে ভ্যালেন্টাইন ডে হিসেবে উদযাপনের সুযোগ এসেছে। একজন কর্মজীবী মানুষ তার জীবদ্দশায় এমন সুযোগ আর নাও পেতে পারেন। ১৪ দিন পুরো সময়টুকু বাসায় থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারির মতো ভালোবাসায় ভরিয়ে দেওয়া যায় গৃহকোণ। ভ্যালেন্টাইন ডে শুধু নর-নারীর ভালোবাসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মা-বাবা, ভাইবোন, সন্তান-সন্ততি, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব তথা বিশ্বমানবতার প্রতি ভালোবাসায় উদ্বুদ্ধ হওয়ার তাগিদ দেয় বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। 'ভালোবাসো, অন্তর হতে বিদ্বেষবিষ নাশো'- এই চেতনাকে ধারণ করে করোনাকে জয় করতে হবে।

প্রাবন্ধিক ও গবেষক

আরও পড়ুন

×