ঢাকা শনিবার, ২৫ মে ২০২৪

আন্তর্জাতিক

করোনায় পরিবর্তিত বিশ্ব রাজনীতি

করোনায় পরিবর্তিত বিশ্ব রাজনীতি

ফরিদুল আলম

প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২০ | ১৪:৩৪ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০

আচমকা করোনা নামক এক ভাইরাস আজ বিশ্বকে শাসন করছে। পাল্টে দিয়েছে বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্র। এই তো কয়েকদিন আগেও বিশ্ব রাজনীতিকে নেতৃত্ব দেওয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজ করোনার ভয়াবহ ছোবলে পর্যুদস্ত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র ইউরোপীয় দেশগুলোতে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর মিছিল ভারী হচ্ছে। এই মিছিলে সবার আগে রয়েছে ইতালি, এর পরে স্পেন। এদিকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন করোনায় আক্রান্ত হয়ে আইসিইউতে, আক্রান্ত ব্রিটিশ সিংহাসনের পরবর্তী উত্তরাধিকারী প্রিন্স চার্লস এবং জনসনের মন্ত্রিসভার স্বাস্থ্যমন্ত্রীও। কী অসম্ভব গতিতে বিশ্বের তাবৎ রাষ্ট্রনায়কদের চোখের ঘুম হারাম করে করোনা এগিয়ে চলছে তার আপন মহিমায়! কয়েক মাস আগে প্রায় দুই বছর ধরে চলমান চীন-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বাণিজ্য যুদ্ধ অবসানে দুই দেশই একটি চুক্তিতে উপনীত হলো। চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক শক্তির লাগাম টেনে ধরতে ট্রাম্পের অনমনীয় মনোভাবের কাছে শেষ পর্যন্ত পরাজিত হতে হয়েছিল শি জিনপিংকে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক বৈষম্য সহনীয় করতে সে দেশ থেকে আরও বেশি আমদানিতে সম্মত হন প্রেসিডেন্ট শি।

এর আগে আমরা দেখেছি, যে কোনো বৈশ্বিক সংকটে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার ডাকে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর বিশ্বকে নেতৃত্ব দিতে। বর্তমান সময়ে এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে পড়তে যাচ্ছে এই দেশগুলো। ইতোমধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত বর্তমান লকডাউন চলমান থাকবে। ইউরোপ আরও আগে থেকেই লকডাউনে রয়েছে। অর্থনীতির চাকা থেমে গেছে এশিয়ার দেশগুলোতেও। এর মধ্যে ব্যতিক্রম এশিয়ার একমাত্র দেশ চীন, যেখান থেকে করোনার উৎপত্তি। গত বছরের শেষ দিকে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহর থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস যখন আজ বিশ্বের ২০৫টি দেশে আতঙ্ক ছড়িয়ে যাচ্ছে, এমন অবস্থায় তিন মাসের যুদ্ধ শেষে চীনের অর্থনীতি স্বাভাবিক গতিতে ফিরতে শুরু করেছে। বাকি বিশ্বে তারা তাদের দক্ষতা কাজে লাগাতে উৎসাহ দেখাচ্ছে। ইতোমধ্যে ইউরোপীয় কিছু দেশে চীনের বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে কমবেশি আজকাল আলোচনা হচ্ছে, এটি কি আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে নিজের বগলদাবা করতে চীনের পক্ষ থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে বানানো কোনো কৌশল কিনা। বাস্তবে এ ধরনের আলোচনার কোনো ভিত্তি না থাকলেও চীনকে দোষারোপ করতে ছাড়ছেন না বিশ্ব নেতারা। কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মতো নেতারা চীনকে বিভিন্নভাবে সমালোচনা করেছেন বিষয়টি শুরুতে গোপন করে যাওয়ার জন্য। ট্রাম্প কিছুদিন আগে বলেই ফেলেছেন, 'শি আমার খুব ভালো বন্ধু; কিন্তু এ বিষয়টি নিয়ে তার আরও আগে জানানো উচিত ছিল।'

এদিকে বৈশ্বিক অর্থনীতির এক মহামন্দার কবলে পড়তে যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার ইউরোপীয় মিত্ররা। একদিকে সব উৎপাদন বন্ধ, বিশাল সংখ্যক শ্রমিক কর্মহীন হয়ে ঘরে ফিরে যাওয়া, তাদের জীবন-জীবিকার পাশাপাশি কোম্পানিগুলোকে টিকিয়ে রাখতে সরকারগুলোর পক্ষ থেকে বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা, সেই সঙ্গে কবে নাগাদ এই দুরবস্থা কাটিয়ে আবার অর্থনীতির স্বাভাবিক গতিকে সচল করা যাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা- এসব কিছুর মধ্যে তাদের কোষাগার থেকে কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ খরচ করা ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর দেখা যাচ্ছে না। ইতোমধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ২.২ ট্রিলিয়ন ডলারের বিশেষ প্রণোদনার বিলে সই করেছেন। ব্রিটেন ৪০০ বিলিয়ন পাউন্ড প্যাকেজ ঘোষণা করেছে নাগরিকের রক্ষার জন্য। ইউরোপের অপর দেশগুলোও একই পথে হাঁটছে। উদ্দেশ্য একটাই, নিজ দেশের মানুষের জীবন-জীবিকার নিশ্চয়তা দেওয়া। ধারণা করা হচ্ছে, যদি সহসাই করোনার বিপদ কেটে যায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের অর্থনীতিকে আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে তিন বছর অর্থাৎ ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময় লাগবে। এমন পরিস্থিতিতে দারুণভাবে অর্থনীতির স্বাভাবিক গতিতে ফিরে এসেছে চীন। কারখানাগুলো স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ যেখানে সব দেশের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে, সেখানে অনেক দেশই চীনের সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে। এই বিপদের সময় চীনই সবার জন্য একমাত্র এবং সবচেয়ে বড় ভরসা।

একসময় কেটে যাবে এই দুঃসময়। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে গোপনে বিশ্ব রাজনীতির যে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে, সেটা সময়ই আরও স্পষ্ট করে দেবে। একদা যুক্তরাষ্ট্রের সব কর্ম ও অপকর্মের অংশীদার ইউরোপ আজ চরম দুঃসময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা হয়ে গেছে অনেকটা প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালের মতো। বিচ্ছিন্নতাবাদী নীতির অনুসরণ আগামী দিনগুলোতে বিশ্ববাসী আজকের এই সময়ের কথা মনে রেখে করোনা-উত্তর বিশ্ব পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে কীভাবে নেবে, সেটা এক প্রশ্ন। সেই সঙ্গে স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তীকালে একমেরুকেন্দ্রিকতা ভবিষ্যতে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, সেটাও আমরা জানি না। এদিকে ইউরোপ ও আমেরিকার মতো এতটা নাকাল নয় রাশিয়ার অবস্থা। বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে যেমন প্রচুর অর্থের প্রয়োজন, তেমনি পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পর তারা যখন ধাক্কাটা সামাল দিয়ে নিজেদের আবার নতুন করে দাঁড় করাতে চেষ্টা করবে, সেই সময় হয়তো তাকিয়ে দেখবে, চীন এগিয়ে গেছে অনেকদূর। বিভিন্ন দেশে মার্কিন সৈন্যদের যে ঘাঁটিগুলো রয়েছে, সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বছরে যে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের প্রয়োজন হয়, তখন হয়তো তা তাদের জন্য এক বিলাসিতায় পরিণত হবে। আমাদের জন্য হয়তো অপেক্ষা করছে এক পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতি।

সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×