'সরল বিশ্বাস' সরকারের অবস্থান

দুর্নীতি

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

ড. মইনুল ইসলাম

গত ১৮ জুলাই টেলিভিশনের সংবাদ শোনার সময় নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, যখন দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদকে বলতে শুনলাম, সরল বিশ্বাসে কোনো অপরাধ করলে কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির দায়ে মামলা করা হবে না। সাংবাদিকরা এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা দাবি করলে তিনি 'পেনাল কোডে' ওই রকম বিধান আছে বলে জানালেন। তার বক্তব্য, দেশের ফৌজদারি আইনে সরল বিশ্বাসে কোনো অপরাধ করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় না। তিনি আরও বলেন, সরল বিশ্বাস বিষয়টি প্রমাণিত হতে হবে। কিন্তু দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান আগ বাড়িয়ে ডিসি সম্মেলনে এ ধরনের বক্তব্য রাখার মরতবা কী, বুঝতে পারলাম না! কোন কাজটা সরল বিশ্বাসের কাজ আর কোনটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দুর্নীতি, সেটা নির্ধারণ করা তো আদালতের এখতিয়ার।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দুর্নীতির প্রাথমিক আলামত পাওয়া মাত্র তদন্ত করে দুর্নীতির 'প্রাইমা ফেসি কেস' দাঁড় করিয়ে মামলা করে মামলার চার্জশিট দিয়ে দেবে এবং মামলা পরিচালনা করবে- সেটাই তো তাদের আইনি দায়িত্ব। তারা 'কোনো কাজ সরল বিশ্বাসে করা হয়েছে কি-না' এই বিচারের ভার নিয়ে ফেললে তো খোদ কমিশনের কর্মকর্তারাই আদালতে বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে যাবেন- এই অধিকার কমিশনকে কে দিয়েছে? এ ধরনের 'ডিসক্রিশন' দুর্নীতি দমন কমিশনের কারও থাকতেই পারে না (অবশ্য, ২০ জুলাই ২০১৯ তারিখে দুদক চেয়ারম্যান সাফাই দিলেন যে, তিনি নাকি দুর্নীতি শব্দটি উচ্চারণই করেননি)।

টেলিভিশনে ১৯ জুলাই ২০১৯ তারিখে দেখলাম, ইকবাল মাহমুদের এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তার সুস্পষ্ট মত, দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান 'সরল বিশ্বাসে' বলতে কী বুঝিয়েছেন, তা পরিস্কার নয়। এ বিষয়টি পরিস্কার হতে হবে। তিনি বলেন, সরকার দুর্নীতিকে দুর্নীতি হিসেবেই দেখবে। ডিসি সম্মেলনে প্রদত্ত দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানের বক্তব্য সম্পর্কে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে তিনি বলেছেন, দুদক চেয়ারম্যানের বক্তব্যকে ভিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। ডিসি সম্মেলনে দুদক চেয়ারম্যানের আরও একটি বক্তব্য নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে; যেখানে তিনি বলেছেন, জেলা পর্যায়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মকাণ্ডের দেখভালের দায়িত্ব ডেপুটি কমিশনারদের ওপর অর্পণ করা হয়েছে। যদি এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে এটাও একটা মারাত্মক গলদ হবে। ডেপুটি কমিশনার এবং তার অফিস যেহেতু দুদকের তদন্তের এখতিয়ারভুক্ত, তাই ডেপুটি কমিশনারকে দুদকের কার্যক্রম তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব দিলে সেটা কি স্বার্থের সংঘাত ডেকে আনবে না? এই বক্তব্যটিও ইতিমধ্যেই ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের দৃষ্টিতে অসঙ্গত বিবেচিত হয়েছে। এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত যাতে না নেওয়া হয়, সে অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি ২০ জুলাই ২০১৯ তারিখে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তার বিবৃতিতে। ২০০৪ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন গঠিত হওয়ার পর ক্ষমতাসীন বিএনপি-জামায়াত সরকারের ইচ্ছানুসারে প্রস্তুতি পর্বের অজুহাতে তিন বছর দুদক দুর্নীতি দমনে একেবারেই অকার্যকর ভূমিকা পালন করেছিল। এরপর ২০০৭-০৮ সালের সামরিক বাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হাসান মসউদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন দুদক প্রচণ্ড শক্তিধর, কার্যকর ও কর্মব্যস্ত হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে মেজর জেনারেল মতিনের নেতৃত্বাধীন 'গুরুতর অপরাধ দমন জাতীয় কমিটি' বড় বড় রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে যে প্রবলভাবে কার্যকর দুর্নীতি দমন কার্যক্রম শুরু করেছিল এবং মামলাগুলো পরিচালনার ভার দুদককে অর্পণ করছিল, তাতে সারাদেশের দুর্নীতিবাজ মহলে অভূতপূর্ব ত্রাসের সঞ্চার করেছিল ওই সময়ের দুদক।


প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' ঘোষণা করেছেন ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর। কিন্তু দুদকের কর্মকাণ্ডে তার এই অবস্থান কোনো জোয়ার সৃষ্টি করেছে বলে তো মনে হয় না। বিশেষত, কোনো রহস্যময় কারণে দুদকের একজন সাহসী ও সৎ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মুনীর চৌধুরীকে হঠাৎ দুদক থেকে পানিশমেন্ট ট্রান্সফার করে বিজ্ঞান জাদুঘরের মহাপরিচালক করে দেওয়ায় দুদকের টিমওয়ার্কের শক্তি বৃদ্ধির ব্যাপারে বর্তমান চেয়ারম্যানের সত্যিকার একাগ্রতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। কার এজেন্ডা এই ক্ষতিকর পদক্ষেপের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হলো, সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। উপরন্তু ডিআইজি মিজান ও দুদক কর্মকর্তা খোন্দকার বাছিরের ৪০ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেনের কাহিনী সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দুদকের অভ্যন্তরীণ 'চেইন অব কমান্ড' ও ইন্টিগ্রিটিকে প্রশ্নের সম্মুখীন করেছে। আমরা এখনও ইকবাল মাহমুদের গতিশীল ও দক্ষ নেতৃত্বের ওপর আস্থা রাখতে চাই। তার পুরো চাকরিজীবনে যে সুনাম তিনি অর্জন করেছেন, তার প্রতি তিনি নিজেই যেন অবিচার না করেন। সুনাম অর্জন একদিনে হয় না, অত্যন্ত কঠিন ও সুদীর্ঘ সাধনা প্রয়োজন হয় সারা জীবনে তিলে তিলে প্রশংসনীয় ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে। কিন্তু অর্জিত সুনাম বরবাদ হতে একটি ভুলই যথেষ্ট। ড. গোলাম রহমান ও বদিউজ্জামান ব্যর্থতা নিয়ে তাদের মেয়াদ শেষ করেছেন, বাকি জীবন তারা এর জন্য আফসোস করবেন হয়তোবা। সরকারের বিরাগভাজন হয়ে আরব্ধ কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয়ে দুদক থেকে পদত্যাগ করতে হওয়ায় লেফটেন্যান্ট জেনারেল হাসান মসউদ চৌধুরীও এক বুক হতাশা নিয়ে লোকচক্ষুর অন্তরালে হারিয়ে গেছেন। তার জন্য এখনও আমাদের প্রাণ কাঁদে। কারণ, তিনিই প্রথম এ জাতিকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রামে জয়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। ইকবাল মাহমুদের প্রতি আকুল আহ্বান, আপনার বক্তব্য ও কাজের প্রতি জাতির আস্থা যেন টলে না যায়।

বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর দুর্নীতির বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' ঘোষণা করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আমি অভিনন্দন জানিয়ে অনুরোধ করেছিলাম, অতীতের মতো ফাঁকা বুলি না আউড়ে যদি এবার সত্যি সত্যিই দুর্নীতির বিরুদ্ধে সর্বশক্তি নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন, তাহলে ইতিহাসে তিনি চিরস্থায়ী আসন করে নিতে সমর্থ হবেন। কিন্তু সরকারের মেয়াদের সাত মাস অতিক্রান্ত হওয়ার কাছাকাছি সময়ে এসে আমার এই প্রত্যাশা ফিকে হতে শুরু করেছে। দেশের সংবিধানের ২০(২) ধারা বলছে, 'রাষ্ট্র এমন অবস্থা সৃষ্টির চেষ্টা করিবেন, যেখানে সাধারণ নীতি হিসাবে কোন ব্যক্তি অনুপার্জিত আয় ভোগ করিতে সমর্থ হইবেন না'। অতএব, এই সাংবিধানিক বিধান মোতাবেক মার্জিনখোর রাজনীতিবিদ, ঘুষখোর আমলা এবং মুনাফাবাজ-কালোবাজারি-চোরাকারবারি-ব্যাংক ঋণ লুটেরা ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের অপরাধী সাব্যস্ত করা গেলে তাদের আইনের আওতায় এনে অপরাধের শাস্তি বিধান না করা হলে সেটা গুরুতর অনৈতিক ও অসাংবিধানিক পদক্ষেপ হবে। সাম্প্রতিক ঘোষিত ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে যখন দেখলাম, প্রতি বছরের মতো ১০ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার ব্যবস্থা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি এবার কালো টাকার মালিকদের জন্য অভূতপূর্ব আরও কয়েকটি নতুন সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে তখন বুঝতে পারলাম, বর্তমান অর্থমন্ত্রী শুধু ঋণখেলাপিদের প্রতি দয়াদাক্ষিণ্য দেখিয়েই ক্ষান্ত হবেন না, তিনি দুর্নীতিবাজ কালো টাকার মালিকদের সক্রিয় মদদ প্রদানেও কোনো রাখঢাক করবেন না। গত দশ বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকা (৭৫ বিলিয়ন ডলার) বিদেশে পাচার হয়েছে বলে মার্কিন গবেষণা সংস্থা 'গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি'র গবেষণায় উদ্ঘাটিত হয়েছে, যার একটা বড় অংশ দুর্নীতিলব্ধ কালো টাকা। সুবিধা দিলেই যে কালো টাকার মালিকরা ছুটে এসে তাদের টাকা সাদা করে নেবে, এমন প্রত্যাশা অবশ্য সরকারও করে না; কিন্তু এই সুবিধা এতদসত্ত্বেও প্রতি বাজেটে ঘোষণার আসল মরতবা হলো, প্রধানত দুর্নীতিবাজ আমলা ও রাজনীতিবিদদের জন্য সম্ভাব্য দুর্নীতি দমনের জাল থেকে পলায়নের একটি পথ খুলে দেওয়া। বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৮.১৩ শতাংশে পৌঁছে গেছে বলে অর্থমন্ত্রী প্রাক্কলন ঘোষণা করেছেন। কিন্তু দুর্নীতি লালনের অবস্থান থেকে সরকার সরে না এলে জিডিপি প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ জনগণের কাছে পৌঁছানো যাবে না।

অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

বিষয় : দুর্নীতি দুর্নীতি দমন কমিশন ড. মইনুল ইসলাম